গত তিন বছরে স্কুলের মিড ডে মিলে প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিকে বরাদ্দ বেড়েছে ছিটেফোঁটা। ৬০:৪০ অনুপাতে কেন্দ্র রাজ্যের যৌথ প্রকল্পে বরাবরই যৎসামান্য বরাদ্দের জন্য কেন্দ্রের দিকেই আঙুল তুলেছে রাজ্য সরকার। মাসখানেক আগে পালাবদলের পরে রাজ্যে নানা প্রকল্প ঘোষণার আবহে কিন্তু মিড ডে মিলের দিকটি নিয়ে মাথাব্যথা চোখে পড়ছে না এখনও পর্যন্ত।
শিক্ষকদের একাংশের দাবি, বাজার দর যখন হু-হু করে বাড়ছে, জ্বালানির দাম লাফিয়ে লাফিয়ে ঊর্ধ্বমুখী, লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে অন্নপূর্ণা যোজনা এক ধাপে ১৫০০ টাকা থেকে ৩০০০ টাকা হয়ে গেলেও মিড ডে মিলের বরাদ্দ নিয়ে কোনও ঘোষণা নেই কেন? এ দেশেরকোনও কোনও রাজ্যে কেন্দ্রীয় সরকার মিড ডে মিলের জন্য নির্দিষ্ট মাত্রার বরাদ্দ ধার্য করলেও সেই রাজ্যগুলি পরিস্থিতি অনুযায়ী পড়ুয়াদের পাতে পুষ্টিকর খাবারের জোগান দিতে তাদের ভাগের বরাদ্দ বাড়িয়েছে। কার্পণ্য করেনি বা ছোটদের পুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। শিক্ষকদের একাংশের প্রশ্ন, রাজ্যে নতুন ডাবল ইঞ্জিন সরকার এত কিছু প্রকল্প ঘোষণা করলেও এবং নতুন রাজ্য সরকারের বিচারে নানা দিক অগ্রাধিকার পেলেও স্কুল পড়ুয়াদের পুষ্টির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না কেন?
সরকারি সূত্রের খবর, পয়লা অক্টোবর ২০২২ সালে মিড ডে মিলে প্রাথমিকের বরাদ্দ ছিল ৫.৪৫ টাকা এবং উচ্চ প্রাথমিকে বরাদ্দ ছিল ৮.১৭ টাকা। এর পরে পয়লা ডিসেম্বর ২০২৪ সালে তা হয় প্রাথমিকে ৬.১৯ টাকা এবং উচ্চ প্রাথমিকে ৯.২৯ টাকা। এর পরে শেষ বার ২০২৫-এর পয়লা মে বরাদ্দ বেড়েছিল। প্রাথমিকে তা হয়েছিল ৬.৭৮ টাকা এবং উচ্চ প্রাথমিকে ১০.১৭ টাকা। তার পরে থেকে আনাজপাতির দাম থেকে শুরু করে জ্বালানির দাম অনেকটা বাড়লেও আর মিড ডে মিলে বরাদ্দ বাড়েনি।
শিক্ষকেরা জানাচ্ছেন, গত কয়েক বছরে মিড ডে মিলের মেনুর কার্যত পরিবর্তন হয়নি। এখন মিড ডে মিলে সপ্তাহে দু’দিন ডিম-ভাত, দু’দিন তরকারি-ভাত, এক দিন সয়াবিনের তরকারি-ভাত এবং এক দিন ডাল, আলুভাতে দেওয়ার কথা। তবে এই সামান্য বরাদ্দে বেশির ভাগ স্কুলই দু’দিন ডিম দিতে পারে না। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির এক নেতার মতে, “গ্যাসের দাম গত কয়েক মাসে যতটা বেড়েছে তাতে গ্যাসে মিড ডে মিলের রান্না করতে গিয়েই হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রাথমিকে ৬.৭৮ টাকা এবং উচ্চ প্রাথমিকের ১০.১৭ টাকার বরাদ্দের মধ্যেই কিন্তু গ্যাসের দাম যোগ করা আছে। এই পরিস্থিতিতে মিড ডে মিলের চুল্লি কী ভাবে জ্বলবে?”
শিক্ষকরা জানাচ্ছেন, প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিকের যে বরাদ্দ সেখানে শুধু চালের দাম এবং রাঁধুনির খরচ ঢোকানো নেই।বঙ্গীয় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনন্দ হান্ডা বলেন, “এর আগে মিড ডে মিলের বরাদ্দ বাড়ানোর কথা রাজ্য সরকারকে বললেই তারা বলত, এটা কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ প্রকল্প। কেন্দ্র বাড়াচ্ছে না। তাই রাজ্য বাড়াতে পারছে না। এখন তো নতুন সরকার এসে রাজ্যে অনেক কিছুর বরাদ্দ বাড়িয়েছে। আমাদের দাবি, এ বার মিড ডে মিলেও প্রাথমিকে অন্তত পড়ুয়া পিছু ১৫ টাকা এবং উচ্চ প্রাথমিকে পড়ুয়া পিছু ২০ টাকাকরা হোক।”
আনন্দের মতে, সরকারি স্কুলে অনেক পড়ুয়াই অত্যন্ত গরিব ঘরের। সঙ্গতির অভাবে অপুষ্টির শিকার। তাদের দিনের প্রথম এবং প্রধান খাবারটাই হল মিড ডে মিলের খাবার। অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা যদি এক লাফে দ্বিগুণ বেড়ে ৩০০০ টাকা হতে পারে, তা হলে মিড ডে মিলের দ্বিগুণ বরাদ্দ কেন বাড়বে না? বেড়ে দ্বিগুণ হবে না?নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও এখনও শিক্ষামন্ত্রী কে হবেন, ঘোষণা হয়নি। শিক্ষা দফতরের কর্তারা এই নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। সেই সঙ্গে শিক্ষকেরা জানাচ্ছেন, হঠাৎ করে গরমের ছুটি দীর্ঘায়িত হলে ছুটির সময়ে পড়ুয়াদের মিড ডে মিল দেওয়া না-হলেও অন্তত কিছুশুকনো খাবার দেওয়া হোক।করোনার সময়েও স্কুল বন্ধ থাকলেও মিড ডে মিল হিসেবে শুকনো খাবার দেওয়া হত। অভিভাবকেরা স্কুলে এসে নিয়ে যেতেন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)