E-Paper

নেশার চকচকে ফাঁদে বিজ্ঞাপনের সতর্কবার্তার দৃঢ় অক্ষরও ফিকে হয়

আজ, ৩১ মে বিশ্ব তামাক বর্জন দিবস। অথচ, ভারতে এখনও প্রায় ২৬.৭ কোটি, অর্থাৎ, প্রতি চার জনের এক জন প্রাপ্তবয়স্ক কোনও না কোনও ভাবে তামাক ব্যবহার করেন।

দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ৩১ মে ২০২৬ ০৮:৫৮

— প্রতীকী চিত্র।

ভারতে তামাকের ব্যবহার শুধু নেশার জন্যই করা হয় না, এই অভ্যাস যুক্তি খোঁজে এ সমাজে এটাই স্বাভাবিক। এ দেশে এখনও প্রায় ২৬.৭ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনও না কোনও ভাবে তামাক ব্যবহার করেন। অর্থাৎ, প্রতি চার জনের মধ্যে এক জন। সিগারেট, বিড়ি, খৈনি,গুটখা, জর্দা রূপ বদলায়, কিন্তু নেশার সূত্রটা একই থাকে। এত সতর্কবার্তা, কর্কট রোগের ভয় ধরানো ছবি, আইন, প্রচার— সব কিছুর পরেও তামাককে আমরা ‘নেশা’ বলে দেখি না। বরং দেখি আড্ডার সঙ্গী, কাজের বিরতি, মানসিক চাপ কমানোর উপায়, কখনও আবার ব্যক্তিত্বের বাহক হিসেবে। সিনেমার পর্দা, চায়েরদোকানের বেঞ্চ, অফিসের ব্যস্ত করিডর, কিংবা কলেজের গেট— তামাক বহু দিন ধরে আমাদের সমাজের প্রান্তে নয়, ঠিক মধ্যস্থলেই বসে আছে।

তাই সমস্যা শুধু ফুসফুসে বা মুখের ভিতরে নয়, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও। আমরা তাকে বিপদ হিসেবে চিনি, কিন্তু অনেকসময়েই বিপজ্জনক মানতে চাই না। এটা মানসিক দুর্বলতার লক্ষণ। অর্থাৎ, তামাক-নির্ভরতা শুধু খারাপ অভ্যাস নয়। বরং দুর্বল ইচ্ছাশক্তির প্রমাণ। পাশাপাশি এটি সুচিন্তিতব্যবসায়িক ও সামাজিক ভাবে তৈরি করা আসক্তি। মস্তিষ্কের উপরে রাসায়নিক টান, দৈনন্দিন রুটিন, আড্ডা ও বন্ধুদের চাপ, একাকিত্ব, পুরুষত্ব বা আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে তামাককে সঙ্গী ভেবে নেওয়াটাদুর্বল মানসিকতা। এবং সেই মনকে উস্কে দেওয়াই ব্যবসার আসল কৌশল। যা ধীরে ধীরে মানুষকে এমন নেশার বৃত্তে আটকে ফেলে, যার দরজাটা বাইরে থেকে সহজ মনেহলেও ভিতর থেকে খোলা অনেক কঠিন।

তামাকের মধ্যে থাকে নিকোটিন। অনেকেই বলেন, “সিগারেট না খেলে মাথা কাজ করে না”, বা “খৈনি না নিলে চাপ সামলানো যায় না।” এইকথাগুলি শুধুই অজুহাত বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে, কারণ, নিকোটিন সত্যিই মস্তিষ্কে খুব দ্রুত পৌঁছে সাময়িক স্বস্তি, মনঃসংযোগ বাড়ানোর অনুভূতি তৈরি করে। বিপদটা এখানেই। বার বার ব্যবহারে নিকোটিনেরউপস্থিতি মস্তিষ্ক স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শেখে। তখন নিকোটিন না পেলে অস্থিরতা, খিটখিটে ভাব, মাথা ভার, মনোযোগের সমস্যা, মনের অকারণ অস্বস্তিও শুরু হয়ে যায়। মানুষ ভাবেন, তামাক তাঁর মানসিক চাপ কমাচ্ছে, বাস্তবে তামাকই সেই মানসিক চাপের একটা অংশ তৈরি করে।আবার নিজেকেই মানসিক চাপের সমাধান হিসেবে হাজির করে নিকোটিন।

ভারতে তামাক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা কম হয়নি। ন্যাশনাল টোবাকো কন্ট্রোল প্রোগ্রাম (এনসিটিপি), প্যাকেটেরছবি-সহ সতর্কবার্তা, প্রকাশ্যে ধূমপানের উপরে নিষেধাজ্ঞা, বিজ্ঞাপনের নিয়ন্ত্রণ, কর বৃদ্ধি— সবই হয়েছে। সে সবের প্রয়োজনও অস্বীকারকরা যায় না। কিন্তু তামাকের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু একটি পণ্যের বিরুদ্ধে লড়াই নয়। এটি অভ্যাস, বিজ্ঞাপন, সংস্কৃতি এবং চতুর ব্যবসায়িক কৌশলের বিরুদ্ধেলড়াই।

আমরা সাধারণত তামাকের শেষ এবং সব চেয়ে ভয়াবহপরিণতি হিসেবে কর্কট রোগকে দেখি, কিন্তু তার আগেই তামাক শরীরে অসংখ্য ছোট-বড় ক্ষয় শুরু করে। সে সব হল—হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, দাঁত-মাড়ির সমস্যা, যৌনক্ষমতার সমস্যা, ঘুমের ব্যাঘাত, উদ্বেগ, অবসাদ, মস্তিষ্কের অবক্ষয়, এমনকি আত্মবিশ্বাসের উপরেও তার প্রভাব পড়ে। তবু মানুষতামাক ব্যবহার করে যান। কারণ, আসক্তি যুক্তির চেয়ে দ্রুত কাজকরে।

এই জায়গাটাই তামাক সংস্থাগুলি খুব ভাল বোঝে। তাই আজ তামাক বা নিকোটিন শুধু বিড়ি-সিগারেটের সাবেকি চেহারায় নেই। বরং এসেছে ‘সেফার’, ‘ক্লিনার’, ‘মডার্ন’,‘স্টাইলিশ’ বিকল্পের ভাষায়। ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে— ভেপ, ফ্লেভার্ড, চকচকে ডিভাইস, পাতলা প্যাকেট, স্লিম সিগারেট, ইত্যাদি। এগুলি অল্পবয়সিদের কাছে নিজেদের জেনারেশনের ‘কুলইমেজ’-এর প্রতীক। নেশার বিপদকে যখন চকচকে ভাষায় সাজানো হয়, তখন সতর্কবার্তার দৃঢ় অক্ষরও বিজ্ঞাপনের রঙের কাছে ফিকে হয়ে যায়।

তাই ৩১ মে-র ‘ওয়ার্ল্ড নো টোবাকো ডে’ কেবল ‘তামাক ছাড়ুন’ বলার দিন নয়। বরং তামাককে নতুন ভাবে দেখার দিন। বিপদকেনিজের চোখে চিহ্নিত করার দিন। যে পণ্য মানুষকে অসুস্থ করে— তাকে যদি স্বাধীনতা, স্টাইল, স্ট্রেস-রিলিফ বা আধুনিকতার পোশাকে মুড়িয়ে বিক্রি করা হয়, তবে তার বিরুদ্ধে লড়াইও শুধু ব্যক্তিগত প্রতিজ্ঞায় শেষ হতে পারে না।

পরিবারকে বা তামাকের নেশায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের দোষারোপ করা নয়, তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে। স্কুল-কলেজে শুধু ভয়েরভাষা নয়, বিজ্ঞাপনের চটকের আড়ালে থাকা বাস্তবতা বোঝাতে হবে। চিকিৎসকের চেম্বারে ভর্ৎসনা নয়, তামাক ছাড়ার চিকিৎসা সহজলভ্য করতে হবে। শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, তামাকজাত পণ্যের নতুন ভাষা ও বিপণনকেও কঠোর ভাবেপ্রশ্ন করতে হবে। তামাকের নেশা ছাড়ানোর ওষুধ ও কাউন্সেলিং অনেক উন্নত হয়েছে। এর সাহায্যে বহু দিনের এই কঠিন নেশার থেকে অনেকেই মুক্তি পেয়েছেন।

তামাক ছাড়া মানে জীবনের আনন্দ ছাড়া নয়, আড্ডা ছাড়া নয়, ব্যক্তিত্ব হারানো নয়। বরং নিজের শ্বাস,স্বাদ, ঘুম, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎকে একটু একটু করে ফেরত পাওয়া। তামাকের ধোঁয়ার সব চেয়ে বড় কৌশল হল সে নিজের গ্ল্যামারকে দেখায়, কিন্তু তার ফাঁদকে অদৃশ্য রাখে। সেই ফাঁদ চিনে নিতে আজ সব চেয়ে জরুরি জনস্বাস্থ্য-সচেতনতা।

কারণ, তামাকের বিষাক্ত ফাঁদের বিরুদ্ধে প্রকৃত জয় শুরু হয় প্যাকেটের সতর্কবার্তা পড়ে নয়, তামাক-বিপণনের কৌশলী মায়াকে ভেদ করতে পারলে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

tobacco Tobacco products World No Tobacco Day Addiction smoking

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy