তর্কের সূচনা এসআইআর পর্বে। সেই বিতর্কের পরে অসাধু উপায়ে জন্মের শংসাপত্র দেওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছিল বিজেপি সরকার। তাতে চলতি মাস পর্যন্ত যত যাচাই হয়েছে, তার মধ্যে প্রায় ১৫% পাওয়া গিয়েছে, যেগুলি ঠিক নয় বা অসাধু উপায়ে দেওয়া হয়েছিল।
আধিকারিকদের বক্তব্য, এসআইআর পর্বে অন্যতম একটি নথি ছিল জন্মের শংসাপত্র। ভোটারের যোগ্যতা যাচাইয়ে তার গুরুত্ব অসীম। আবার বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই জানিয়েছিল, বৈধ ভোটার তথা নাগরিকেরাই একমাত্র সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া, অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করতে যে প্রক্রিয়া এ রাজ্যে শুরু হয়েছে, সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গেও এমন শংসাপত্রের বৈধতার মানদণ্ড জড়িত থাকতে পারে বলে আধিকারিকদের অনেকের ধারণা। ফলে সরকারি সূত্রে পাওয়া এই যাচাই-তথ্য তাৎপর্যপূর্ণ।
সরকার গঠনের পরেই প্রতিটি জেলা প্রশাসনকে জন্মের শংসাপত্রের যাচাইয়ের কাজ দিয়েছিল নবান্ন। তাতে দু’টি গোত্র রয়েছে। প্রথমত, জন্মের ছ’মাস, এক বছর বা তার বেশি সময় পরে দেওয়া জন্মের শংসাপত্রগুলি খতিয়ে দেখা। এসআইআরের সময়ে এমন শংসাপত্রের চাহিদা বেড়েছিল জেলায় জেলায়। বিলম্বিত সময়ে শংসাপত্রের আবেদন প্রশাসনের কাছে করলে মহকুমাশাসক স্তরে খতিয়ে দেখে তা বিবেচনা করা হয়। দ্বিতীয়ত, জন্মের যে শংসাপত্রগুলি ডিজিটাইজ় করা হয়েছিল, সেগুলির মধ্যে কতগুলি বৈধ, তা খতিয়ে দেখা।
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত গোটা রাজ্যের যাচাইয়ে যে অগ্রগতি তাতে, সে সময়ে জেলা প্রশাসনগুলির দেওয়া প্রথম গোত্রের প্রায় ৪৪ হাজার শংসাপত্রের যাচাই হয়। সেগুলির মধ্যে বৈধ প্রায় ৩৩ হাজার। অবৈধের (পোশাকি ভাষায় ‘নট জেনুইন’) সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার। এই গোত্রে অবৈধ শংসাপত্রের সংখ্যার নিরিখে সবচেয়ে এগিয়ে কলকাতা এবং তার ঠিক পরেই রয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলা। দ্বিতীয় গোত্র তথা ডিজিটাইজ় হওয়া প্রায় ১০.১৫ লক্ষ শংসাপত্রেরও যাচাই হয়েছে। তাতে বৈধ প্রায় ৮.৬৫ লক্ষ এবং অবৈধ শংসাপত্রের সংখ্যা প্রায় দেড় লক্ষ। অবৈধ শংসাপত্রের সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে উত্তর দিনাজপুর। তার পরেই রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা, মালদহ, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব বর্ধমান ইত্যাদি জেলা।
এসআইআরের পরে তথ্যগ্রাহ্য অসঙ্গতির আওতায় থাকা বিপুল সংখ্যক নাম এখন বিচারবিভাগীয় ট্রাইবুনালের বিবেচনাধীন। কারণ, সংশ্লিষ্টরা মূল ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন এবং তাঁরা নিজেদের যোগ্য দাবি করে ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে। যে কাজ এখনও চলছে। আধিকারিকদের বড় অংশের মতে, যে এলাকাগুলি থেকে অবৈধ জন্মের শংসাপত্রের তথ্য আসছে, ঘটনাচক্রে সেই এলাকাগুলি থেকে ট্রাইবুনালের কাছে আবেদনের সংখ্যা তুলনায় কিছুটা বেশি হতে পারে। ফলে এই তথ্যের প্রভাব কতটা থাকবে, ভবিষ্যতে তা স্পষ্ট হবে ট্রাইবুনালের সিদ্ধান্তের পরে।
এখন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরণের কাজও চলছে জেলায় জেলায় ‘হোল্ডিং সেন্টার’ তৈরি করে। সেই প্রক্রিয়ায় যাঁদের আনা হবে, তাঁদের মধ্যে কারও এমন নথি থাকলে তা সংশ্লিষ্টের বিরুদ্ধে যেতে পারে। আবার সরকারি প্রকল্পের উপভোক্তা বাছাইয়ের প্রশ্নে ভোটার তালিকায় নাম থাকা বা না-থাকা এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ। ফলে যাঁদের এমন নথি পাওয়া যাচ্ছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সরকার কী অবস্থান নেবে, তা এখনই স্পষ্ট নয়। তবে সংশ্লিষ্টদের ক্ষেত্রে হয়তো বাকি নথির আরও নিবিড় যাচাই হতে পারে বলে আধিকারিকদের ধারণা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)