হিন্দু পাড়ায় কেন মুসলিম পরিবার থাকবে? তাতে সংস্কৃতি নষ্ট হবে, এ সব আর সহ্য করা হবে না বলে এক বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িতে গিয়ে কয়েক জন যুবকের শাসানি-হুমকির ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়েছে।
খাস কলকাতার উপকণ্ঠে রাজারহাটের ওই দম্পতির কন্যা এক মুসলিম যুবককে বিয়ে করে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে। এর পরে তাঁরা সবাই একই বাড়িতে থাকেন। বৃদ্ধ দম্পতি বাড়ির মন্দিরে পুজো-আচ্চাও করেন। এলাকার জীবনযাপনের স্বাভাবিক ছন্দও বরাবর যা ছিল, অটুট রয়েছে। এত দিন বাদে আচমকা বাড়িতে উদয় হয়ে কয়েক জন যুবকের হুঁশিয়ারিতে হিন্দু পরিবারের কন্যা স্বেচ্ছায় ভিন্-ধর্মীকে বিয়ে করার আক্রোশ ঝরে পড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। স্বঘোষিত নৈতিক অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ তথাকথিত সনাতনী যুবা বাহিনী তাঁদের বাড়ি বয়ে এসে মুখ্যমন্ত্রী এবং দলের নাম করে হুমকি দিয়েছেন বলে একটি ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ইদের দুপুরে ঘটনাটি ঘটে বলে জানা গিয়েছে। বৃদ্ধ দম্পতি বার বার তাঁদের আর দেখার কেউ নেই বা সন্তানকে কি মা-বাবা ত্যাগ করতে পারে বলে বোঝানোর চেষ্টা করলেও চিঁড়ে ভেজেনি। উল্টে শুনতে হয়েছে, ‘সনাতন ধর্ম আমাদের সব থেকে শ্রেষ্ঠ ধর্ম, সেটা কেন ত্যাগ করল? এটা আর টলারেট করা যাবে না… এগুলো আমাদের পার্টি অফিসে জানিয়েছে। আমাদের মুখ্যমন্ত্রীও এই জিনিসগুলো বলছেন! এটাকে লাভ জেহাদ বলে। এ সব আর চলবে না।’
জানা গিয়েছে, প্রৌঢ় দম্পতির মেয়ে-জামাইকে ধর্ম পাল্টে নিতে বা কিছু জানানোর থাকলে পার্টি অফিসে লিখিত ভাবে জানাতে এবং তাঁদের জামাইকে স্থানীয় দলীয় কার্যালয়ে দেখা করতে বলা হয়েছে। ভিডিয়োয় বাহারি ছাঁট দাড়ির, রোদ চশমাধারী এক যুবককে দলের পান্ডার ভূমিকায় শান্ত স্বরে বৃদ্ধ দম্পতিকে শাসাতে দেখা গিয়েছে। তাঁর নাম সাগর ঘোষ। ভিডিয়োটি তাঁরাই (সম্ভবত ‘জনস্বার্থে’) প্রচারের জন্য তুলে ছড়িয়েছেন বলেও সাগর স্পষ্টত দাবি করেছেন। শাসানির মুখে আতঙ্কিত হলেও ভুক্তভোগী দম্পতি এখনই পুলিশে যাওয়ার কথা ভাবছেন না বলে জানিয়েছেন। ওই বাড়িতে গেলে রাজনৈতিক স্তরে কথা বলে বুঝিয়ে ‘হুমকিদাতাদের’ নিরস্ত করার কথাই তাঁরা ভাবছেন বলে জানান।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘নিশ্চয় কোনও জায়গায় বিচ্যুতি রয়েছে। সবটা যে ঠিক হচ্ছে, এমন নয়। ‘চার ঘণ্টার বিজেপি’-দের দাপাদাপি রয়েছে। দল নজর রাখছে।’’ পাশাপাশি অবশ্য তিনি এও বলেন, ‘‘এটাও সত্যি লাভ জেহাদ, ল্যান্ড জেহাদ চলছে। হিন্দু মেয়ে বিয়ে করে হিন্দু এলাকায় বাড়ি কিনে, ভাড়া নিয়ে মহল্লাকে বদলে দেওয়া হচ্ছে। হাওড়া থেকে অভিযোগ এসেছে, দেশ-বিরোধী কাজের সঙ্গে যারা যুক্ত তারা ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে। দুর্গাপুজো যেখানে হয়, সেখানে কুরবানি চলছে। এগুলো চলতে দেওয়া হবে না।’’
এ দেশের সংবিধান অনুযায়ী, যে কেউ তাঁর ইচ্ছা মতো ধর্মপালন করতে, খাবার খেতে পারেন। ভিন্-ধর্মীদের মধ্যে বিবাহও সংবিধান-স্বীকৃত। তবু গত কয়েক বছর ধরে ভিন্-ধর্মীদের মধ্যে বিয়েকে ‘লাভ জেহাদ’ তকমা দিয়ে রাজনৈতিক প্রচার বা যুগলদের সমস্যায় ফেলার প্রবণতাও বাড়ছে। কিন্তু অনেক বছরের পুরনো এক যুগল বা বিষয়টি পুরোপুরি মেনে নেওয়া তাঁদের পরিবারকে হঠাৎ বিপাকে ফেলার ঘটনা বিরল।
রাজারহাটের ঘটনাটির ক্ষেত্রেও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে তাঁদের জামাই নমাজ পড়েন কি না বা বাড়িতে গরু কেটে আনা হয় কি না, বলে রীতিমতো জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশে এমন কিছু অভিযোগ উঠলেও পশ্চিমবঙ্গে অন্তত এমন ঘটনা কার্যত অভাবনীয় মনে করা হত। রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গেই কি এই তথাকথিত সনাতনী ধর্মের স্বঘোষিত অভিভাবকদের প্রতিপত্তি বাড়ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ঘটনাটিতে দল এবং মুখ্যমন্ত্রীর নাম করে হুমকি-হুঁশিয়ারির গা-জোয়ারি প্রবণতাও অনেকের চোখে পড়েছে।
ভিডিয়োয় যাঁদের ওই বাড়িতে গিয়ে কথা বলতে দেখা গিয়েছে, তাঁরাও বিজেপি-র সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করেছেন। ওই দলটির প্রধান মুখপাত্র সাগর ঘোষ বলেন, ‘‘সনাতন ধর্মের লোক হয়ে এ সব আর মেনে নেওয়া হবে না। আমরাই ভিডিয়ো করে বাড়ি গিয়ে বলে এসেছি। এ সব নিয়ে এত দিন কিছু বলা হয়নি বলে এখনও বলা হবে না, তা নয়। আমাদের হিন্দু পাড়ায় মুসলিম পরিবার থাকবে না।”
রাজারহাটে এই নব্য ‘হুমকি-সংস্কৃতির’ ভুক্তভোগী বৃদ্ধের বয়স বছর সত্তর, তাঁর স্ত্রীর বয়স ৬৫ বছর। তিনি নানা অসুখে ভুগছেন। বিমানবন্দরের শুল্ক সংক্রান্ত বিষয়ে কাজের একটি সংস্থা রয়েছে তাঁর। বড় মেয়ে শ্বশুর বাড়িতে থাকেন। ছোট মেয়ের স্বামী মুসলিম। যে বৃদ্ধের বাড়িতে গিয়ে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তিনি শুক্রবার বলেন, ‘‘এলাকায় থাকতে হবে, তাই এখনই পুলিশে যাচ্ছি না। যে ভাবে বাড়ি এসে শাসিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাতে আমরা আতঙ্কিত। আমি বিজেপির উচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তাঁদের কাছেই জানতে চাইব, আমি হিন্দু, আমার ছোট মেয়ে মুসলিমকে বিয়ে করেছে। সেই কারণে কি কাউকে এই ভাবে এলাকাছাড়া করা যায়?’’ কোনও পার্টি অফিসে না গিয়ে পারিবারিক ভাবে আলোচনা করেই বিষয়টি নিয়ে তাঁরা এগোতে চাইছেন।
স্থানীয় বিজেপির তরফে বারাসত জেলা কিসান মোর্চার সম্পাদক তথা রাজারহাট নিউটাউনের কিসান মোর্চার আহ্বায়ক সুরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবার দাবি, ‘‘বৃদ্ধের জামাই অতীতে হাজতবাস করেছেন। গত ভোটেই কামারহাটিতে গণ্ডগোল পাকিয়ে ভোট করানোর চেষ্টা করেছিলেন। এমন একজন দুষ্কৃতীকে আমাদের এলাকায় থাকতে দেওয়া চলবে না।’’
ওই এলাকার কয়েক জন বাসিন্দাকেও এ দিন সুরজিতের সুরেই কথা বলতে শোনা গিয়েছে। জানা গিয়েছে, বৃদ্ধের জামাই, অতীতে জমি-বাড়ির ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। বৃদ্ধের বক্তব্য, ‘‘আমার জামাইয়ের নামে কোনও রকম বক্তব্য থাকলেপুলিশে জানাক। কে কোথায় থাকবে সেটা ধর্মের ভিত্তিতে ঠিক হতেপারে নাকি?’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)