ডিএন-১৩ বাসগুমটির পাশে চিপ্স, চানাচুর, ঝুরিভাজার দোকানে ছোট ছেলে আরিফুলকে নিয়ে দাঁড়িয়ে মফিজুল মোল্লা। উল্টো দিকে গাছতলায় স্ত্রী, বড় ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতি। ২০০৯-এর আয়লা ঘূর্ণিঝড়ে খুলনার শাকবাড়িয়া নদী গিলেছিল ভিটে-মাটি। মফিজুলের দাবি, তার পরেই উত্তর ২৪ পরগনায় চলে আসা। নিউ টাউনের ঘুনি বস্তিতে থেকে বহুতলে আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ করতেন বাবা-ছেলে। কিন্তু পুলিশি তল্লাশির জেরে বাড়িওয়ালা আর রাখতে রাজি নন। তাই ১৫-১৬ বছর পরে ফের বাংলাদেশমুখী মফিজুলরা।
আট বছর আগে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা থেকে দালালকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে এ দেশে ঢোকেন হাসিবুল মোল্লা ও তাঁর স্ত্রী আকলিমা বিবি। দমদম জংশনের কাছে একটি বস্তিতে থাকতেন। আকলিমা নাগেরবাজারে পরিচারিকার কাজ করতেন। হাসিবুল চালাতেন ভাড়ার রিকশা। মেয়েকে নিয়ে চলছিল তিন জনের সংসার। কিন্তু রাজ্যে নতুন সরকারের কড়াকড়ির খবর পেয়ে এ বার বাংলাদেশে ফিরতে চান। আকলিমা বলেন, “মাইনেটুকুও আনতে পারিনি। দেশে ফিরে মেয়েকে কী ভাবে মানুষ করব জানি না!”
উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগরের হাকিমপুর সীমান্তে চেকপোস্টের পাশেই মফিজুল-আকলিমাদের মতো অনেকের ভিড়। পুলিশ সূত্রে খবর, শুক্রবার নথি যাচাইয়ের পরে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) সঙ্গে আলোচনা করে হাকিমপুর চেক পোস্ট হয়ে ১২০ জনকে সীমান্ত পেরিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে। স্বরূপনগরের মেদিয়া, তেতুলিয়া এবং চারঘাটের আটক-শিবিরে (হোল্ডিং সেন্টার) রয়েছেন যথাক্রমে ৫৫, ৬৫ এবং ২১৩ জন। সব মিলিয়ে শুক্রবার রাত পর্যন্ত গোটা রাজ্যের আটক-শিবিরে অন্তত ৩৭৮ জন রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
উত্তর ২৪ পরগনায় ভারত-বাংলাদেশ পেট্রাপোল সীমান্তের কাছের আটক-শিবিরে এক জন, দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুর ও সুন্দরবন পুলিশ-জেলার দু’টি শিবিরে মোট ছ’জনকে রাখা হয়েছে। নদিয়ায় অস্থায়ী আটক-শিবিরে এক বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে রাখা হয়েছে বলে জানান কৃষ্ণনগর পুলিশ-জেলার সুপার ওয়াই রঘুবংশী। দক্ষিণ দিনাজপুরের রামপুরের শিবিরে ন’জন এবং কোচবিহারের শিবিরে চার জনকে রাখা হয়েছে। শুক্রবার রাত পর্যন্ত মুর্শিদাবাদের লালগোলার আটক-শিবিরে রয়েছেন ২৪ জন। পক্ষান্তরে, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মালদহের আটক-শিবিরে বাংলাদেশি সন্দেহে থাকা তিন মহিলা এবং ছয় নাবালককে সে দেশে পাঠানো হয়েছে বলে খবর।
কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর চৌধুরীর মতে, “অনুপ্রবেশকারী থাকুক, চাই না। কিন্তু কত জন অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত হয়েছে, সেটা সরকারকে জানাতে হবে। শ্বেতপত্র প্রকাশ করে প্রকৃত সংখ্যা জানাক কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার।” সিপিএমের নেতা সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, “কোনও প্রক্রিয়া ছাড়া, কাউকে ধরে নিয়ে আটক-শিবিরে রাখা কী ভাবে আইনত চলতে পারে!” বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, “দল সরকারের কাজে নাক গলাবে না। কিন্তু দলের অবস্থান স্পষ্ট। পশ্চিমবঙ্গের মাটিকে ব্যবহার করে জঙ্গি কার্যকলাপ ছড়িয়ে দেওয়ার অপচেষ্টাকে নির্মূল করতে হবে। কী ভাবে পরিকল্পনার রূপায়ণ করবে, শ্বেতপত্র প্রকাশ করবে কি না, সে সিদ্ধান্ত সরকারই নেবে।”
অনুপ্রবেশকারীদের প্রতি মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের বার্তা, “ভালয় ভালয় নিজের দেশে ফিরে যাও। না হলে কপালে কী আছে, কেউ জানে না। প্রথমে ভাত, মাছ, ডিম খাওয়াচ্ছে। এর পরে ডিম বাদ গিয়ে শাক-ভাত। তার পর শুধু ভাত। তার পরে ডান্ডা! সরকার কেন এদের খাওয়ার ব্যবস্থা করবে? না খেয়ে মরুক! না হলে দেশে ফিরে যাক।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)