বিধানসভার পর এ বার লোকসভার সংসদীয় দলও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। সিংহভাগ সাংসদ হারিয়ে লোকসভায় এখন মমতার ‘হাতে রইল পেন্সিল’। রইলেন মাত্র গুটিকয়েক সাংসদ। দলে সাংসদ-বিদ্রোহের পর লোকসভায় মমতার ‘অনুগত’ রইলেন সংসদীয় দলনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ মাত্র আট জন। বাকি সকলেই এখন বিদ্রোহী শিবিরে।
নির্বাচনে ভরাডুবির পরে লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলে যে ভাঙন ধরতে চলেছে, সেই আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল গত কয়েক দিন ধরেই। রবিবার রাতে দিল্লির কোনও এক গোপন ঠিকানায় বৈঠকে বসেছিলেন তৃণমূলের বিদ্রোহীরা। সোমবার দুপুরে বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে আরও একপ্রস্ত বৈঠক হয় বিদ্রোহী সাংসদদের। দুপুরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী গিয়েছিলেন ভূপেন্দ্রর বাড়িতে। এর পরেই খবর ছড়ায় বিদ্রোহীরা চিঠি জমা দিয়েছেন স্পিকার ওম বিড়লার কাছে। তাঁদের দাবি, বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ-র সঙ্গে যুক্ত হতে চান তাঁরা।
লোকসভায় তৃণমূল সাংসদদের বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার এবং বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায়। উল্লেখ্য, লোকসভায় তৃণমূলের মোট ২৮ জন সাংসদ রয়েছেন। কাকলির দাবি, তাঁকে নিয়ে প্রায় ২০ জন সাংসদ এনডিএ-কে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্য দিকে, এই বিদ্রোহে শামিল হননি বাকি আট জন।
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় ১৭ জন ‘বিদ্রোহী’র নাম প্রকাশ্যে এসেছে। তালিকায় কাকলি, শতাব্দীর পাশাপাশি রয়েছেন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, খলিলুর রহমান, অসিত মাল, অরূপ চক্রবর্তী, শর্মিলা সরকার, জগদীশচন্দ্র বর্মা বসুনিয়া, আবু তাহের, কালীপদ সোরেন, জুন মালিয়া, সাজদা আহমেদ, ইউসুফ পাঠান, দেব, রচনা বন্দ্যোপাধ্যায়, বাপি হালদার এবং পার্থ ভৌমিক। শত্রুঘ্ন সিংহ, প্রতিমা মণ্ডল এবং মিতালি বাগ বিদ্রোহী শিবিরের দিকে ঝুঁক আছেন বলে শোনা যাচ্ছে।
অন্য দিকে, যাঁরা মমতার ‘অনুগত’ হয়ে রয়ে গিয়েছেন, এমন ছ’জনের নামও ভেসে আসছে। প্রত্যাশিত ভাবে সেই তালিকায় একজন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এ ছাড়া কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌগত রায়, সায়নী ঘোষ, মহুয়া মৈত্র এবং কীর্তি আজ়াদের নামও রয়েছে নেত্রীর ‘অনুগত’ তালিকায়। বিভিন্ন সূত্রে যা খবর মিলছে, তাতে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মালা রায় ঝুঁকে রয়েছেন দলনেত্রীর দিকেই।
আরও পড়ুন:
উল্লেখ্য, দুপুরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর বাড়িতে বৈঠকের পরে সন্ধ্যায় দিল্লিতে শতাব্দীর বাসভবনে ফের বৈঠকে বসেছেন তৃণমূলের বিদ্রোহীরা। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও গিয়েছেন শতাব্দীর বাড়িতে।
লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলে ভাঙনের পরে বিদ্রোহীদের তোপ দেগেছেন ‘মমতা-অনুগত শিবিরের’ সাংসদ মহুয়া মৈত্র। কৃষ্ণনগরের সাংসদের দাবি, বিদ্রোহীরা চাইলে বিজেপিতে যেতেই পারেন। কিন্তু তার আগে তাঁদের সাংসদ পদ ছেড়ে দেওয়া উচিত। তিনি লেখেন, “২০২৪ সালে তৃণমূলের টিকিটে জিতেছিলেন সাংসদেরা। সেই জনাদেশ এনডিএ-র পক্ষে ছিল না।” বিদ্রোহী সাংসদদের ‘লোভী, স্বার্থান্বেষী এবং বিশ্বাসঘাতক’ বলে বিঁধেছেন তিনি।
দলনেত্রীর ‘অনুগত’ কীর্তি আজ়াদও গোটা ঘটনাকে বিজেপির ‘নোংরা চাল’ বলে নিশানা করেছেন। তাঁর দাবি, ২০ সাংসদের যে কথা বলা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ সাজানো। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্রের বাড়িতে যে বৈঠক হয়েছে, তাতে লোকসভার ১২ জন এবং রাজ্যসভার এক জন সাংসদ ছিলেন বলে দাবি কীর্তির। এর বাইরে আর কেউ কোনও কিছুতে স্বাক্ষর করেননি বলে দাবি মমতার অনুগত ওই সাংসদের।