মে মাসের ৯ তারিখ, রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিনে, ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ‘শপথ সমারোহ’ থেকে যাত্রা শুরু করেছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। কোনও সরকারের ভাল-মন্দ যাচাই করার পক্ষে এক মাস কোনও সময়ই নয়। তবে এই অল্প সময়েই রাজ্যের আকাশে আশার আলো কিছু দেখা দিল কি, খোঁজ নিল আনন্দবাজার অনলাইন।
দুর্নীতি-বিরোধী অভিযান
একশো দিনের কাজ থেকে শুরু করে আবাস যোজনা, পাথর-বালি খাদানের কাটমানি থেকে শুরু করে টলিউডে বিশ্বাসরাজ— তৃণমূল আমলের দুর্নীতি ঘিরে অভিযোগের অন্ত নেই। বিজেপি সরকারের প্রথম সাত দিনেই গ্রেফতার হওয়া তৃণমূল নেতার সংখ্যা ছিল ৭০। এক মাসে তা ৩০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। গ্রেফতারের তালিকায় সুজিত বসু, স্বরূপ বিশ্বাস, দিলীপ মণ্ডল, জাহাঙ্গির খান, অসিত মজুমদার, রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো বড় নাম। ইতিমধ্যেই শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ইডি এবং তৃণমূল বিধায়কদের সই-কাণ্ডে সিআইডি-র সমন পেয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মেসি-কাণ্ডে অরূপ বিশ্বাসকে তলব করেছে পুলিশ। ‘‘যেখানেই হাত দিচ্ছি, পচা দুর্গন্ধ। এ বার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে জেল বানাতে হবে,’’ রবিবার বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে প্রাক্তন বিচারপতির নেতৃত্বে তৈরি হয়েছে তদন্ত কমিটি। জিটিএ-তে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির তদন্তভার সিবিআই-কে দেওয়া হয়েছে। এত দিন লক্ষ্মীর ভান্ডার পাচ্ছিলেন যে সব পুরুষ, তাঁদের খোঁজে গড়া হয়েছে সিট।
বিজেপির অন্দরেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বার্তা দিয়েছেন দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। বিজেপির ‘তৃণমূলীকরণ’ রুখতে একাধিক দলীয় কর্মীকে নিলম্বিত করা হয়েছে এই এক মাসে। শমীক বলেছেন, ‘‘দুর্নীতিতে যুক্ত হলে এমনকি বিধায়কদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তাতে দলের কোনও সমস্যা হবে না।’’
সীমান্ত এবং অনুপ্রবেশ
মমতার সরকার জমি না-দেওয়ায় দীর্ঘদিন আটকে ছিল ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বেড়া দেওয়ার কাজ। ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে তৃণমূল অনুপ্রবেশকে মদত দিচ্ছে, বারবার অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। রাজ্যে ক্ষমতায় এলে সমস্ত অনুপ্রবেশকারীকে তাড়ানো হবে, ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। ৪ মে-র পর থেকেই বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার জন্য ঢল নেমেছে সীমান্তে। তৈরি হয়েছে হোল্ডিং সেন্টার। মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া হিসেবমতো এক মাসে ফিরে গিয়েছেন প্রায় পাঁচ হাজার অনুপ্রবেশকারী, আটক শিবিরে অপেক্ষায় আরও হাজারখানেক।
মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই বিএসএফ-কে জমি হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেন শুভেন্দু। মোট ১৪২.৭৯ একর জমি হস্তান্তর হয়েছে মে মাসে। অনুপ্রবেশের বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় বাংলা।
‘ডবল ইঞ্জিনে’ সামাজিক প্রকল্প
তৃণমূল জমানায় কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সম্পর্ক ছিল আদায়-কাঁচকলায়। কেন্দ্রের প্রায় কোনও প্রকল্পই রাজ্যে চালু হতে দেননি দিদি। যেমন, ‘আয়ুষ্মান ভারত’। তার বদলে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল ‘স্বাস্থ্যসাথী’। সরকারের মাসপূর্তির দিনেই দিল্লিতে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পে শামিল হতে চেয়ে মউ স্বাক্ষর করেছেন শুভেন্দু।
লাগামছাড়া দুর্নীতি এবং হিসাব না-দেওয়ার অভিযোগে একশো দিনের দিনের কাজের প্রকল্প (মনরেগা) এবং আবাস যোজনার টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল কেন্দ্র। ১ জুলাই থেকে আবার চালু হচ্ছে মনরেগার পরিবর্তে ‘ভিবি-রামজি’ প্রকল্প। ‘প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমা যোজনা’, ‘উজ্জ্বলা যোজনা’, ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’, ‘দীনদয়াল অন্ত্যোদয় যোজনা’-র মতো সামাজিক প্রকল্পও চালু হতে চলেছে রাজ্যে।
‘রাজ্যের ইঞ্জিনে’ সামাজিক প্রকল্প
নাম পাল্টেছে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর। মাস গেলে প্রাপ্তির পরিমাণও বেড়েছে। ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’য় মিলবে তিন হাজার টাকা করে। তবে ১৩ পাতার ফর্ম ফিলাপ নিয়ে চিন্তায় আছেন কোচবিহারের গৃহবধূ অর্পিতা বর্মণের মতো আরও অনেকেই। অবশ্য তাঁদের আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, বৈধ ভাবে যাঁদের ভাতা প্রাপ্য, তাঁদের চিন্তা করার কোনও কারণ নেই। তবে পুরুলিয়ার ছাত্রী সুমিত্রা গঙ্গোপাধ্যায় বা কোচবিহার মহাবিদ্যালয় পড়ুয়া মৌসুমী সাহাদের আশা, নতুন সরকার শুধু ভাতার কথা বলবে না। কর্মসংস্থানের কথাও বলবে।
বার্ধক্য ভাতা এক হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে দু’হাজার টাকা। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে দেওয়া যাবতীয় ভাতা—যেমন মোয়াজ্জিম বা পুরোহিত ভাতা।
নাম বদলেছে ‘মা ক্যান্টিন’-এরও। পাঁচ টাকায় দুপুরের খাবার দেওয়ার প্রকল্পের নাম এখন ‘মা আহার’। বদল এসেছে মেনুতেও। বিজেপি আমিষ-বিরোধী এই প্রচার রুখতে সপ্তাহে দু’দিন মাছ-ভাত খাওয়ানো হবে ‘মা আহার’-এ।
স্বাস্থ্যে হাল ফেরানোর উদ্যোগ
মমতা জমানার শেষ পর্বে স্বাস্থ্য নিয়ে নালিশের শেষ ছিল না। স্বাস্থ্যভবন থেকে সরকারি হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালানোর কথা ঘোষণা করেছে সরকার। দালালচক্র রুখতে পেশাদারদের নিয়োগ করার ভাবনাও রয়েছে। আমজনতাকে সস্তায় ওষুধ দিতে রাজ্যে চালু হবে ৪০০টিরও বেশি ‘প্রধানমন্ত্রী জনঔষধি কেন্দ্র’। শুরু হয়েছে জরায়ুমুখ ক্যানসার প্রতিরোধের টিকাকরণ কর্মসূচি।
শিল্প-পরিকাঠামোর উন্নয়ন
গৌতম আদানির পুত্র করণ আদানি এবং ‘লারসেন অ্যান্ড টুব্রো’ গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান এস এন সুব্রহ্মণ্যমের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন শুভেন্দু। বিজেপির রাজ্য সভাপতি চাইছেন, টাটা আবার সিঙ্গুরে ফিরুক। তাজপুরের পরিবর্তে দাদনপাত্রবাড়ে সমুদ্রবন্দর গড়ার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। হাওড়ার শিল্পপতি অসিত চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, “আগের সরকারের আমলে বড় শিল্প আসেনি রাজ্য। নতুন সরকার আসতেই শিল্পে উন্নতির পরিবেশ তৈরি হচ্ছে, এটা ভাল লক্ষণ।”
রেলে বিপুল লগ্নি
শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করতে এসে রাজ্যের রেল প্রকল্পে ১ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা বলে গিয়েছেন রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব। মমতার জমানায় অসহযোগিতার কথাও বলেছেন। চিংড়িঘাটায় মেট্রো রেলকে কাজ করার অনুমতি না-দেওয়া যার হাতে গরম উদাহরণ। সরকার বদলাতেই বসে গিয়েছে বহু প্রতীক্ষিত গার্ডার।
সরকারি চাকরি
নিয়োগ দুর্নীতি মমতার সরকারের অন্যতম গলার কাঁটা ছিল। দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল সরকারি চাকরিতে নিয়োগও। নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করার কথা ঘোষণা করেছে শুভেন্দুর সরকার। আবেদনের বয়ঃসীমা ৫ বছর বাড়ানো হয়েছে।
বকেয়া মহার্ঘভাতা রাজ্য সরকারি কর্মীদের অনেক দিনের দাবি, যা আটকাতে তৃণমূল সরকার সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গিয়েছিল। বিজেপি এসে ডিএ-র বকেয়া কিস্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু করেছে। ঘোষণা হয়েছে সপ্তম বেতন কমিশন গঠনের কথাও। যাকে ‘‘সরকারি চাকরিজীবীদের বিরাট পাওনা’’ বলছেন কোচবিহার সদর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিজন সাহা।
উচ্ছেদ বিতর্ক
অবৈধ নির্মাণে বুলডোজারের ব্যবহার নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। কিছু ক্ষেত্রে আদালত স্থগিতাদেশ দিয়েছে। পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রীও। তার পরেও হকার উচ্ছেদে গা-জোয়ারির অভিযোগ থাকছেই। পুরুলিয়ার বাসিন্দা অধ্যাপক গৌতম মুখোপাধ্যায়ের মতে, “নতুন সরকারকে ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। বুলডোজার নীতিতে আস্থাশীল হলে হবে না।” হুগলির চুঁচুড়ায় ঘড়ি মোড়ে কয়েক দশক ধরে কাপড়ের দোকান চালানো খোকন দাসের আর্জি, সরকার তাঁদের কথাও ভাবুক।
কী বলছেন বিরোধীরা?
তাঁদের প্রতিক্রিয়া প্রত্যাশিতই। সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের অভিযোগ, “২০১১ সালে মমতা সরকারে আসার পরে প্রথম এক মাস যা হয়েছিল, এই সরকারের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে।’’ কংগ্রেস নেতা অধীররঞ্জন চৌধুরীর বক্তব্য, “এই সরকার এসেই ভাঙচুর শুরু করেছে। কোথাও বাড়ি ভাঙছে তো কোথাও হকার উচ্ছেদ হচ্ছে। দেখাতে চাইছে কিছু একটা করছে।” বিধানসভায় ‘বিদ্রোহী’ তৃণমূলের পরিষদীয় দলের মুখ্য সচেতক আখরুজ্জামান বলেন, “যে ভাবে সন্ত্রাস চলছে, পুলিশ যে ভাবে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করছে, তাতে হতাশা ছাড়া এক মাসে নতুন সরকার কিছুই দিতে পারেনি।”
বিজেপির পাল্টা জবাব
শমীক ভট্টাচার্য বলছেন, ‘‘নতুন সরকারের কাজ দেখে রাজ্যের মানুষ খুশি। মানুষ বলছেন, তাঁরা প্রকৃত স্বাধীনতা পেয়েছেন। কারণ, অনেক দশক পরে রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’’ সরকারের বয়স তো সবে এক মাস, পথ চলা এখনও অনেক বাকি। আগামী পাঁচ বছরে নির্বাচনী সঙ্কল্পপত্রে দেওয়া প্রতিশ্রুতি সরকার পূরণ করবে, প্রত্যাশা শমীকের।