Advertisement
E-Paper

দিনভর ঘেরাও, রাতে পাল্টা মার

যত কাণ্ড বর্ধমানে! পরীক্ষা পিছনোর দাবিতে এ বার ক্যাম্পাসের মূল গেট আটকে রেখে, পানীয় জলের সংযোগ বন্ধ করে কার্যত ‘জঙ্গি আন্দোলনের’ অভিযোগ উঠল বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে। আবার তার ‘পাল্টা’—পেরেক বসানো কাঠের তক্তা দিয়ে আন্দোলনকারীদের বেধড়ক মার!

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০১:০৩
দিনভর কর্তাদের আটকে বিক্ষোভ-অবস্থান পড়ুয়াদের।

দিনভর কর্তাদের আটকে বিক্ষোভ-অবস্থান পড়ুয়াদের।

যত কাণ্ড বর্ধমানে!

পরীক্ষা পিছনোর দাবিতে এ বার ক্যাম্পাসের মূল গেট আটকে রেখে, পানীয় জলের সংযোগ বন্ধ করে কার্যত ‘জঙ্গি আন্দোলনের’ অভিযোগ উঠল বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে। আবার তার ‘পাল্টা’—পেরেক বসানো কাঠের তক্তা দিয়ে আন্দোলনকারীদের বেধড়ক মার!

চলতি সপ্তাহে ফল-বিভ্রাট, পরীক্ষা পিছনো, মার্কশিট বিলির মতো পড়ুয়াদের একাধিক দাবি নিয়ে নানা ঘটনায় এমনিতেই তেতে রয়েছে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। স্নাতক তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা এক মাস পিছিয়ে দেওয়ার দাবিতে বৃহস্পতিবার রাত থেকে অনশন শুরু করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন পড়ুয়া। পুলিশ সূত্রের খবর, শুক্রবার তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন জেলার একাধিক কলেজের পড়ুয়া এবং কিছু বহিরাগত। দিনভর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন রাজবাটি ক্যাম্পাসের সদর দরজা আটকে রাখেন আন্দোলনকারীরা।

Advertisement

দুপুরের পরে বিক্ষোভ-অবস্থান করা হয় নানা দফতরেও। রাত পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দেবকুমার পাঁজা, ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ামক সুজিত চৌধরী-সহ একাধিক আধিকারিক, কর্মীরা আটকে থাকেন। ‘‘ওঁদের বাইরে থেকে খাবারটুকুও আনতে দেওয়া হয়নি’’— অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্মৃতিকুমার সরকারের।

রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের একাংশের মদতে বহিরাগত তৃণমূল কর্মীরা অনশনকারী ছাত্রদের মারধর করে বলে অভিযোগ। গণ্ডগোল একটু কমতেই বেরিয়ে যান আধিকারিকেরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের দাবি, আলো বন্ধ করে ওই ঘটনা ঘটিয়েছে বহিরাগতেরা। রাত পর্যন্ত কোনও অভিযোগও হয়নি। তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত পদক্ষেপের কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তারা।

পরীক্ষার পিছনোর দাবির ব্যাপারে অবশ্য আপাতত নিজেদের অবস্থানে অনড় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। রেজিস্ট্রারের কথায়, ‘‘পরীক্ষা দশ দিন পিছনো হয়েছে, এটাই যথেষ্ট। আর পরীক্ষা পিছনো সম্ভব নয়।’’ এর পরেও আন্দোলনকারীদের উত্তেজনা কমেনি।

তবে রাতে পরিস্থিতি বদলে যায়। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, রেজিস্ট্রার তাঁদের একটি প্রতিনিধি দলকে দাবির বিষয়ে আলোচনা করতে ডেকেছিলেন। সেই সময় আলো নিভে যায়। সেই সুযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারীদের একাংশের মদতে তৃণমূলের বহিরাগত লোকজন রাজবাটি চত্বরে ঢুকে তাঁদের মারধর শুরু করে। বেধড়ক পিটিয়ে অনশন তুলে দেওয়া হয়। বেশ কয়েকজন পড়ুয়া লাঠির ঘায়ে আহত হয়েছেন বলেও তাঁদের দাবি। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃণমূল প্রভাবিত কর্মচারী সংগঠন ‘সারা বাংলা শিক্ষাবন্ধু সমিতি’র নেতা সীতারাম মুখোপাধ্যায় অভিযোগ মানতে চাননি।


রাতে ছাত্রছাত্রীদের উপর হামলার পরে ক্ষোভ পড়ুয়াদের।

গত কয়েকদিন ধরেই পরীক্ষা পিছনো ও মার্কশিট দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ চলছিল। আন্দোলনকারীদের দাবি, পার্ট-২ পরীক্ষার জন্য ১৪ মাস সময় পেয়েছিলেন তাঁরা। অথচ পার্ট-৩ পরীক্ষার জন্য সময় মিলছে কার্যত চার মাস। অনেক কলেজে নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম পড়ানোও শেষ হয়নি বলে তাঁদের দাবি। বিবেকানন্দ কলেজের অরিন্দম রায়, মহিলা কলেজের লহরী দে, রাজ কলেজের দিতিপ্রিয়া আচার্যদের কথায়, ‘‘ইউজিসি-র (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) নিয়ম অনুযায়ী, পড়ুয়াদের হাতে অন্তত আট মাস সময় থাকা দরকার। সেখানে আমরা পাচ্ছি চার মাস! এত কম সময়ে কী পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব?” এই প্রেক্ষিতেই গত কয়েক দিন ধরে জোরদার আন্দোলনে নেমেছেন তাঁরা।

আন্দোলনকারীরা নিজেদের বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী বললেও কত জন চলতি বছর তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষা দেবেন তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আন্দোলনকারীদের অনেকে ‘বহিরাগত’ বলেও কর্তৃপক্ষের দাবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কয়েক জন অভিভাবককে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘‘আন্দোলন না করে বাড়তি দশ দিন কাজে লাগালে ভাল করত পড়ুয়ারা।’’ আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্তা বলেন, “এখন ওঁরা পরীক্ষা এক মাস পিছোতে চাইছেন। কাল যে তিন মাস পরীক্ষা পিছনোর দাবি তুলবেন না, তার নিশ্চয়তা কোথায়!’’

রেজিস্ট্রার দেবকুমারবাবু বলেন, ‘‘পার্ট-৩-এ প্রায় ৪৫ হাজার পরীক্ষার্থী রয়েছেন। কয়েকজন পরীক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অত পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে পারব না।’’ তাঁর আরও দাবি, ‘‘আমাদের সিদ্ধান্ত ভুল হলে তো কলেজের অধ্যক্ষরা আমাদেরকে জানাত। বরং অধ্যক্ষদের একটা বড় অংশ পরীক্ষা পিছোতে বারণ করে ই-মেল করেছেন।” কলকাতা থেকে উপাচার্য স্মৃতিকুমার সরকারও ফোনে বলেন, “কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে, বারাসত স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় ২১ মার্চ থেকে পরীক্ষা শুরু করছে। মে মাসের মধ্যে ফল বার করতে না পারলে জুন মাসে দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে স্নাতোকোত্তর পড়ার সুযোগ মিলবে না। এটা পড়ুয়া থেকে অভিভাবক সবাইকে বুঝতে হবে।”

তবে আন্দোলন চললেও আর পুলিশ ডাকা হবে না বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। রেজিস্ট্রার বলেন, “আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনও রকম গোলমালে জড়াবে না। আমরা কোনও পুলিশও ডাকব না।” এ দিকে, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা ও মঙ্গলবারের গোলমালে এক মহিলা পুলিশকর্মীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে যে দুই ডিওয়াইএফ নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, এ দিন জামিন পেয়েছেন তাঁরা।

রাজবাটি ক্যাম্পাসের কাছেই বাড়ি কাটোয়া কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ দেবপ্রসাদ সামন্তের। তাঁর আক্ষেপ, ‘‘দিনে ঘেরাও, রাতে মারপিট—এ সব ঘটনায় আখেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিই নষ্ট হচ্ছে।’’

—নিজস্ব চিত্র।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy