বর্ধমান শহরের বুকে প্রায় ৩০০ বিঘা জলাভূমি বুজিয়ে শুরু হয়েছে প্রোমোটারি ব্যবসা! এই অভিযোগ তুলে ক্ষোভে ফুঁসছেন শহরবাসী। শহরের জিটি রোড, শ্রীপল্লি, আনন্দপল্লি, ২ নম্বর ইছলাবাদ জুড়ে রয়েছে এই বিশাল জলাভূমি। ব্রিটিশ সময়কাল থেকেই এই জলাভূমি শশাঙ্কের বিল নামেই পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে এই জলাশয় সংস্কার হয়নি। তাই পানা ও জলজ উদ্ভিদে মজে আছে। এই বিলের সঙ্গে সরাসরি সেচনালার মাধ্যমে বাঁকা নদীর সংযোগ আছে। বাঁকা নদীতে বর্ষায় জল উপচে পড়লে এই জলাশয় সেই জলে ভরে ওঠে। বর্ধমান শহরকে দীর্ঘদিন ধরে অনেকটাই বন্যার হাত থেকে রক্ষা করে আসছে এই শশাঙ্কের বিল। অভিযোগ, এই বিশাল পরিমাণ জলাশয় বুজিয়ে তৈরি হবে ফ্ল্যাট। তার জন্য রাতারাতি বদলে ফেলা হয়েছে জমির চরিত্রও!
বর্ধমান পুরসভার চেয়ারম্যানের সই জাল করে শহরের ৩০০ বিঘে জলাভূমি ‘শশাঙ্ক বিল’–এর জমির চরিত্র বদল করা হয়েছে বলে ২০১৪ সালে পুরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান স্বরূপ দত্ত বর্ধমান থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর সই জাল করেই বিভিন্ন সরকারি দফতরে পুরসভার চেয়ারম্যানের সই করা জাল ‘নো–অবজেকশন’ চিঠি দাখিল করা হয়। বর্ধমান থানায় অভিযোগও হয়েছিল। তার কেস নম্বর ৬৩২/৮–৩–২০১৪। শুধু বর্ধমান থানা নয়, একাধিক সরকারি দফতরে চেয়ারম্যান লিখিত চিঠি দিয়ে সই ও চিঠির মেমো নম্বর জাল করার জন্য জমির মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেন। কিন্তু চেয়ারম্যান চিঠি দিয়ে থানা, বিএলআরও দফতরে জানালেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি কোনও অদৃশ্য কারণে তদন্তও হয়নি। তা হলে কি সর্ষের মধ্যেই ভূত? কে চেয়ারম্যানের সই জাল করল? কেন তার তদন্ত চেপে দেওয়া হল? এখন সে সব প্রশ্নের জবাব খুঁজছেন বর্ধমান শহরের নাগরিকেরা।
জমির হাত বদল ও চরিত্র বদলে বিল থেকে শালি করা হয়েছে। কিন্তু, বিল বা জলা কবে শালি হল, তার উল্লেখ নেই ভূমি দফতরে! বিএলআরও দফতর শালি থেকে হাউসিং কমপ্লেক্স করার অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু জলাভূমিতে কী ভাবে বহুতল করার অনুমতি মেলে? অভিযোগ, স্বরূপ দত্তর মৃত্যুর পরই জমি মাফিয়ারা জমির চরিত্র বদলের জন্য উঠেপড়ে লাগে। শাসকদলের নেতা, মন্ত্রীদের সঙ্গে বোঝাপড়া না থাকলে কি এত বড় জলাভূমি বুজিয়ে বহুতল তৈরি সম্ভব?
১৯৯৪ সালে বামফ্রন্টের বোর্ড থাকাকালীন পুরসভা সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিয়ে ঘোষণা করে, বর্ধমান পুরসভার অন্তর্গত শাঁখারিপুকুর মৌজার একাধিক জলাশয়, পুকুর রয়েছে, তা ভরাট করার জন্য ওই জমির মালিকরা চেষ্টা চালাচ্ছে। এই মর্মে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয় যে, ওই পুকুর, জলাশয়, ডোবা ভরাট করা হলে, তা সম্পূর্ণ বেআইনি হবে ও মালিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তৎকালীন চেয়ারম্যান সুরেন মণ্ডলের এই বিজ্ঞপ্তিতে জমির মালিকেরা জলাশয় ভরাট করা থেকে বিরত হয়। ১৯৯৪ সালেও এই জলাভূমির চরিত্র বদলের চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তা পারেনি। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকেই তৃণমূল সরকার বর্ধমান পুরসভার ক্ষমতা পাওয়ার পর জমির মালিকেরা এই জলাভূমি ভরাটের চেষ্টা ফের শুরু করে। সেই সময় পুরসভার চেয়ারম্যানের সই জাল করা করে সরকারি বিভিন্ন দফতরে পুরসভার নো–অবজেকশন চিঠি পেশ করা হয়। অভিযোগ, কোনও অজ্ঞাত কারণে এত বড় দুর্নীতির কোনও তদন্তই হয়নি। তার থেকে বড় প্রশ্ন হল, পুরসভার চেয়ারম্যানের সই জাল করে ৩০০ বিঘে জলাভূমির চরিত্র বদল যেখানে হয়েছে, সেই জমিতে বহুতল নির্মাণের জন্য নাকি পুরসভাতে টাকাও জমা পড়েছে! অন্য দিকে শাসক-প্রোমোটারের যোগসাজশে ৩০০ বিঘে জলাভূমি বুজিয়ে বহুতল বানানোর খবরে তোলপাড় পড়ে বর্ধমান শহরে। কলকাতার প্রোমোটার বর্ধমান শহরে এসে এত বড় জলাভূমি ভরাট করে বহুতল তৈরির সাহস পেলেন কী ভাবে, এ নিয়ে শাসকদল, পুলিশ, প্রশাসনকে কাঠগড়ায় চড়িয়েছেন শহরের মানুষ।
শহরের কংক্রিট জঙ্গলের মধ্যে এই বিশাল জলাভূমিকে রক্ষার জন্য এবার পরিবেশবিদেরাও কোমর বেঁধে রাস্তায় নামতে চলেছেন। শুধু সাবমার্সিবল দিয়ে জল ছেঁচে ফেলা হচ্ছে তাই নয়, জেসিবি নামিয়ে রাস্তা তৈরির কাজ দ্রুত গতিতে শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেই সঙ্গে চলছিল মাটি ভরাটের কাজও। মন্ত্রীর সুপারিশকে কাজে লাগিয়ে জলাভূমিতে বিদ্যুতের তারও নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রোমোটার, পুলিশ, প্রশাসন ও শাসকের একটাই লক্ষ্য— দিনরাত পাম্প চালিয়ে জলাভূমির জল বার করে দিয়ে দেখানো হবে, এটা কোনও আদি জলাভূমি নয়, বৃষ্টির জল জমেছে। অভিযোগ, এখানে নাকি ২০তলা বহুতল তৈরি হবে! এই জলাভূমির ধারেই প্রায় ৩২টি পরিবার ৪০ বছর ধরে বাস করছে। তাদের তুলে দেওয়ারও ষড়যন্ত্র শুরু করেছে শাসক ও প্রোমোটার। যার ফলে এই পরিবারগুলির মধ্যেও উদ্বেগ বেড়েছে। জলাভূমিতে ঢোকার চওড়া রাস্তা করতে একাধিক বাড়ি ও জমি কিনে ফেলেছে প্রোমোটার।
জানা গিয়েছে, রাজ্যের এক মন্ত্রীর সঙ্গে প্রমোটারের বোঝাপড়ায় শশাঙ্কের বিল থেকে শালিজমিতে রূপান্তরিত হয়েছে! অভিযোগ, এ সবই সম্ভব হয়েছে শাসকদলের উপরতলার নেতাদের মদতেই। স্থানীয় মানুষের আরও অভিযোগ, খোদ নবান্ন থেকে এই জলাভূমির চরিত্র বদল করা হয়েছে! এখনও এই বিশাল জলাশয় ঘিরে জীববৈচিত্র চোখে পড়বে। প্রতি বছর শীতের সময় পরিযায়ী পাখিরা আসে। এখানে আছে প্রচুর ভোদড়, শিয়ালও। ব্রিটিশ সময়কাল থেকে যে জলাশয় এলাকার পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখেছে, সেই শশাঙ্কের বিল বিক্রি হয়েছে তৃণমূলের রাজত্বে এবং সেই জলাভূমির চরিত্র বদলে ফেলে শালি রেকর্ড করে নেওয়া হয়েছে। এখানেই নাকি প্রোমোটাররা হাউসিং কমপ্লেক্স গড়ে তুলবে! হাজার কোটির এই প্রকল্পের সঙ্গে নাম জড়িয়েছে শাসকদলের নেতা, মন্ত্রী ও প্রশাসনিক কর্তাদের!
বাম পুরসভার উদ্যোগে জলাশয়টি সংস্কার করে চারিদিকে বাগান তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তার পর তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রকল্প চলে যায় বিশবাঁও জলে। এখন সেই জলাশয় বিক্রি হয়ে যায় প্রোমোটারের হাতে। বর্ধমান পুরসভার চেয়ারম্যান পরেশ সরকারের বাড়ি এই জলাশয়ের পাশে। অর্থাৎ ১০ নম্বর ওয়ার্ডে। তিনি বলেন, ‘‘আমি কিছু জানি না। গত ১০ বছর ধরে কলকাতা থেকে জেলাশাসক ও ভূমি দফতরের মাধ্যমে শালি নয়, বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। সুতরাং এখন ওখানে বহুতল নির্মাণে কোনও বাধা নেই।’’