স্কুলে পড়ার সময়েই দুর্গাপুরের হিন্দি মাধ্যম স্কুলের এক পড়ুয়া মুন্সি প্রেমচাঁদের ‘গোদান’ উপন্যাসটি পড়ে ফেলেছিলেন। সেই থেকেই ইচ্ছে হিন্দি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা করার। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করতেই মাথায় হাত। শহরে কোনও কলেজে হিন্দিতে সাম্মানিক স্তরে পড়াশোনার সুযোগই যে নেই। তবে এই শিক্ষাবর্ষ থেকে আর হাপিত্যেশ করতে হবে না পড়ুয়াদের। শহরের মাইকেল মধুসূদন মেমোরিয়াল কলেজে এ বার থেকে শুরু হবে হিন্দিতে সাম্মানিক স্তরে পড়াশোনা।
গত কয়েক দশক ধরেই দুর্গাপুরের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক কারখানা তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে ভিন্ রাজ্যের বহু হিন্দিভাষী মানুষই কর্মসূত্রে পরিবার নিয়ে বাস করেন এই শহরে। শহরের মেনগেট ও বেনাচিতি-সহ বিভিন্ন এলাকাতেই বহু হিন্দিভাষী মানুষ বাস করেন। মানুষের চাহিদার কথা মাথায় রেখে দুর্গাপুরে বিধাননগর, মেজডিহি, বেনাচিতি, ভিড়িঙ্গির নতুনপল্লি, গোপীনাথপুর, বীরভানপুর প্রভৃতি এলাকায় হাই ও জুনিয়র হাই মিলে মোট ১০টি হিন্দি মাধ্যম স্কুল রয়েছে। কিন্তু স্কুলের পাঠ শেষ করে হিন্দি নিয়ে সাম্মানিক স্তরে পড়াশোনা করতে চাইলেই, পড়ুয়ারা পড়তেন আতান্তরে।
দীর্ঘদিন পর্যন্ত দুর্গাপুরের কোনও কলেজে হিন্দিতে সাম্মানিক পড়ানো হতো না। হিন্দি পড়তে গেলে ছুটতে হতো মানকর, রানিগঞ্জ বা আসানসোলে। যেমন, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দিতে স্নাতকোত্তর করছেন চাঁদনি পাসোয়ান। তিনি জানান, বেনাচিতি ভারতী হিন্দি হাইস্কুল থেকে পাশ করে রানিগঞ্জের টিডিবি কলেজে ছুটতে হয়েছিল তাঁকে। পড়ুয়ারা জানান, অনেকের সাধ থাকলেও বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করার মতো সামর্থ্য নেই। শেষমেশ পড়ুয়াদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে দুর্গাপুরের ওই কলেজেই ২০০৮ সালে স্নাতক স্তরে (পাস কোর্স) হিন্দি নিয়ে পড়াশোনার বন্দোবস্ত করা হয়। কিন্তু হিন্দিতে সাম্মানিক কোর্স চালুর বিষয়টি নিয়ে এত দিন কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি।
শেষমেশ ২০১১ সাল থেকে কলেজে হিন্দিতে সাম্মানিক কোর্স চালুর জন্য চেষ্টা শুরু করা হয় বলে জানান মধুসূদন মেমোরিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ জিএম হেলালউদ্দিন। সম্প্রতি কোর্সটি চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র মিলেছে। কলেজের অধ্যক্ষ জানান, এই শিক্ষাবর্ষে হিন্দি সাম্মানিক কোর্সে ৩০টি আসনে পড়ুয়াদের ভর্তি নেওয়া হবে। আগামী দিনে আসন সংখ্যা আরও ২০টি বাড়ানোর জন্য কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করা হবে বলে জানান তিনি। আপাতত এই কলেজের হিন্দি বিভাগে তিন জন শিক্ষক রয়েছেন বলে জানা গেল।
নতুন কোর্স চালু হওয়ায় খুশির হাওয়া শহরের শিক্ষা মহলেও। শহরের ‘হিন্দি-উর্দু অ্যাকাডেমি’র সাধারণ সম্পাদক তথা নেপালিপাড়া হিন্দি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক কলিমূল হক বলেন, ‘‘দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন চলেছে। এ বছর থেকে শহরের কলেজে হিন্দি সাম্মানিক কোর্স চালু হওয়ায় উপকৃত হবেন দুর্গাপুর ও লাগোয়া এলাকার পড়ুয়ারা।’’ অ্যাকাডেমির তরফে জানানো হয়েছে, আসানসোলে একটি হিন্দি কলেজ রয়েছে। সেই আদলে দুর্গাপুরেও একটি কলেজ খোলার জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরে আবেদন পাঠানো হয়েছে। অ্যাকাডেমির সদস্য তথা পুরসভার ডেপুটি মেয়র অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আশা, ‘‘অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবার থেকে আসা পড়ুয়াদের বাইরে গিয়ে পড়াশোনার খরচ চালাতে সমস্যা হতো। এ বার সেই সমস্যা অনেকটাই মিটবে।’’