Advertisement
E-Paper

প্রধান শিক্ষক চলে যাবেন শুনলেই মুখ ভার গ্রামের

শুধু স্কুল নয়। তিনি যেন গোটা গ্রামেরই অভিভাবক। ন’বছর আগে এক বার তাঁর বদলির নির্দেশ এসেছিল। গ্রামবাসীরা এমন ক্ষোভ-বিক্ষোভ শুরু করেন যে সিদ্ধান্ত পাল্টায় শিক্ষা দফতর।

সৌমেন দত্ত

শেষ আপডেট: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০০:২৫
পড়ুয়াদের মাঝে কল্যাণবাবু। —নিজস্ব চিত্র।

পড়ুয়াদের মাঝে কল্যাণবাবু। —নিজস্ব চিত্র।

শুধু স্কুল নয়। তিনি যেন গোটা গ্রামেরই অভিভাবক।

ন’বছর আগে এক বার তাঁর বদলির নির্দেশ এসেছিল। গ্রামবাসীরা এমন ক্ষোভ-বিক্ষোভ শুরু করেন যে সিদ্ধান্ত পাল্টায় শিক্ষা দফতর। এ বার তিনি অন্য স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার জন্য পরীক্ষায় বসতে চেয়েছেন জেনে ফের তাঁকে ঘিরে ধরেন গ্রামের মানুষ। স্কুল ছাড়ছেন না, এমন আশ্বাস দিয়ে রেহাই পেয়েছেন তিনি।

এখন প্রায় দিনই যেখানে রাজ্যের কোথাও না কোথাও শিক্ষাঙ্গণে হুজ্জুতি-তাণ্ডবের খবর মেলে, সেখানে জামালপুরের মশাগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কল্যাণকুমার চৌধুরী যাতে তাঁদের ছেড়ে না যান, সে দিকে নজর রাখতে এককাট্টা গোটা গ্রাম। বাসিন্দাদের দাবি, বর্ধমানের বাবুরবাগের ইন্দ্রপ্রস্থ এলাকার বাসিন্দা কল্যাণবাবু যেন এক সুতোয় বেঁধে রেখেছেন গ্রামকে।

জামালপুরের মশাগ্রাম গেট পেরিয়ে পাঁচরা বা ভেলিপুলের মোড় হয়ে মশাগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় যাওয়ার মোরাম রাস্তা। ১৮৩৬ সালে তৈরি স্কুলটি ২০০২ পর্যন্ত ছিল টিনের চাল দেওয়া চারটি মাটির ঘর। আর একটি ভাঙাচোরা পাকা ঘর। ভুতুড়ে স্কুলভবন দেখে মশাগ্রামের পড়ুয়ারাও অন্য স্কুলে চলে যেত। মাধ্যমিক স্তরের এই স্কুলে পড়ুয়া ছিল মেরেকেটে ২৫০ জন। ২০০২ সালে এই স্কুল থেকে মাধ্যমিক দিয়েছিল মাত্র ২৯ জন। উত্তীর্ণ হয়েছিল মাত্র ৯ জন।

কিন্তু গত ১৩ বছরে পাল্টে গিয়েছে স্কুল। নতুন ভবন তৈরি হয়েছে, খেলার মাঠ হয়েছে, প্রধান শিক্ষকের নতুন ঘরে বসে পড়ুয়ারা মিড-ডে মিল খায়। মাধ্যমিকেও উত্তীর্ণের সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ। স্কুলে মাধ্যমিকের টেস্টে পাশ-ফেলও চালু রয়েছে। গ্রামের ফতেপুর পাড়ার সফিউদ্দিন মল্লিক বলেন, “আমার ভাইঝি টেস্টে পাশ করতে পারেনি। অনুরোধ করেছিলাম। উনি বললেন এক বছর রেখে দিন, আর প্রতি দিন স্কুল পাঠান। পাশ করানোর দায়িত্ব আমার। পরের বছর ভাল নম্বর নিয়ে ভাইঝি পাশ করেছিল।” প্রধান শিক্ষক কল্যাণবাবু ফি-সপ্তাহে অন্তত তিন দিন দশম শ্রেণির পড়ুয়াদের স্কুল শুরুর আগে সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত এবং বিকেলে ৪টে থেকে ৬টা পর্যন্ত বিশেষ ক্লাস নেন। মাধ্যমিক স্তরে পিছিয়ে পড়া পড়ুয়াদের জন্য টেস্টের পরে স্কুলেই দু’ঘণ্টা করে কোচিংয়ের ব্যবস্থাও করেছেন।

প্রধান শিক্ষক বলেন, “২০০৯ সালে পুরনো স্কুল জামালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের জন্য নিয়োগপত্র পাই। পদত্যাগপত্র জমা দেব বলে মশাগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ে আসি। এসে দেখি স্কুল ফাঁকা। ছাত্র-শিক্ষক কেউ নেই। গ্রামের লোকেরও মুখ ভার। পরে জানতে পারলাম, আমি যাতে স্কুলে থাকি সে জন্য সকাল থেকে স্কুলের পড়ুয়ারা তো বটেই, আশেপাশের গ্রামের মানুষজনও মেমারি-তারকেশ্বর রোড অবরোধ করে বসে রয়েছেন। সেখানে গিয়ে দেখি দু’কিলোমিটার রাস্তা জুড়ে শুধু মানুষের ভিড়। পরিস্থিতি দেখে স্কুল না ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিই। অবরোধও উঠে যায়।”

গত অগস্টেও প্রধান শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষায় বসতে চেয়ে স্কুলের পরিচালন সমিতির সম্পাদকের অনুমতি চেয়েছিলেন কল্যাণবাবু। কিন্তু খবর ছড়াতেই ঘেরাও করেন গ্রামের মানুষ। স্কুল না ছাড়ার আশ্বাস দিয়ে রেহাই পান তিনি। পরিচালন সমিতির সম্পাদক সুজিতকুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, “আমি প্রথমে ওই ফর্মে সই করিনি। স্যার নিজের উৎকর্ষতা বাড়াতে পরীক্ষা দিচ্ছেন বোঝার পর ফর্মে সই করেছি।”

স্কুলের পুরনো শিক্ষক সুনীল সাহা, অলোক ঘোষেরা বলেন, “স্কুল আর গ্রামবাসীদের মধ্যে আত্মীয়তার যোগ তৈরি করেছেন উনি। সে জন্যই তিনি আজ গ্রামের অভিভাবক। তাঁর এক ডাকে গ্রামবাসীরা সব কাজ ফেলে ছুটে আসেন।” মশাগ্রামের বাসিন্দা তপন মালিক, শান্তদাস অধিকারীরা বলেন, “প্রধান শিক্ষকের ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। এমন শিক্ষক পেয়ে আমরা গর্বিত। অবসর না হওয়া পর্যন্ত যেতে দেব না প্রধান শিক্ষককে।” অনন্ত ঘোষ, দীপালি পালেরাও মনে করেন, “অমায়িক ব্যবহারে প্রধান শিক্ষক গ্রামের সবার মন জয় করে নিয়েছেন। পাশাপাশি স্কুলের উন্নতি ও পড়াশোনার মানোন্নয়নও করেছেন।”

প্রধান শিক্ষক অবশ্য বলেন, ‘‘গ্রামবাসীদের দানেই স্কুলটি মহীরূহে পরিণত হয়েছে। গ্রামের মানুষ আমাকে খুবই বিশ্বাস করেন। স্কুলের শিক্ষকেরাও যে কোনও ব্যাপারে সাহায্য করেন। আমি ভাগ্যবান, এখানে শিক্ষকতা করছি।”

গ্রামবাসীরা জানান, প্রধান শিক্ষক যখনই স্কুলে আসেন, তখনই পড়ুয়ারা স্কুলে ঢুকে যায়। আর তিনি চলে যাওয়ার পরেই বাড়িমুখো হয়। সবই যেন ওঁকে ঘিরে।

mashagram good headmaster jamalpur mashagram headmaster transfer
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy