নিত্য নানা প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে যুঝতে হয়েছে তাঁদের। তাই কষ্টের মর্মটা বোঝেন। পেটে খিদে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো খুদে মুখগুলো তাই স্থির থাকতে দেয়নি। নিজেদের ভাল-মন্দের জন্য গড়ে তোলা সংগঠনকে এগিয়ে এনেছেন বস্তিবাসী শিশুদের মুখে অন্ন তুলে দিতে। প্রতিদিন দুপুরে শিশুরা যখন পেট পুরে খায়, তৃপ্তির হাসি হাসেন প্রতিবন্ধী সংগঠনের সদস্যেরা।
আসানসোল রেলপাড় এলাকার বেলডাঙায় বছর ষোলো আগে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন কয়েক জন শারীরিক প্রতিবন্ধী। উদ্দেশ্য ছিল, নিজেদের অভাব-অভিযোগ আলোচনা করে সমবেত ভাবে সংশ্লিষ্ট জায়গায় পৌঁছনো, সমাধানের রাস্তা বের করা ইত্যাদি। এই ক’বছরে সেই সংগঠনে যুক্ত হয়েছেন বরাকর থেকে পাণ্ডবেশ্বরের কয়েকশো প্রতিবন্ধী। প্রথম কয়েক বছর নিজেদের সমস্যার হাল বের করাই ছিল লক্ষ্য। পরে এলাকাবাসীর সেবায় নিজেদের নিযুক্ত করার ভাবনাচিন্তাও আসে।
সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা, পেশায় সব্জি বিক্রেতা শেখ শাহাজাদা জানান, বেলডাঙার অদূরে একটি বস্তি আছে। তাঁরা এক সময়ে জানতে পারেন, সেখানে বেশ কিছু শিশু বড় কষ্টে রয়েছ। কারও মা পরিচারিকার কাজ করে, কারও বাবা দিনমজুর। কারও আবার মা-বাবা কেউ নেই, পথে-ঘাটে কাগজ কুড়িয়ে দিন চলে। রাত কাটে খোলা আকাশের নীচে। পেট পুরে তো দূর, একবেলা সামান্য খাবারেই দিন কাটে। শাহাজাদা বলেন, ‘‘এক দিন আমরা আলোচনায় বসে ঠিক করি, প্রতিদিন অন্তত একবেলা ওদের মুখে খাবার তুলে দেব।’’
তাঁদের নিজেদের দৈনিক গড় রোজগার দু’তিনশো টাকা। সংসারে টানাটানি আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তা থেকে কিছু সঞ্চয় করে সকলে মিলে খাবারের আয়োজন করেন। মাছ-ডাল-সব্জি তুলে দেন বস্তির শ’দেড়েক শিশুর মুখে। মাঝে-মাঝে কিছু সাহায্যও মিলে যায়। শিশুদের কপালে জোটে মাছ, ডিম, মাংসও। সংগঠনের সদস্য, ছোট দোকানদার সুনীল মিশ্র বলেন, ‘‘আমরা জানতাম, এক বার শুরু করলে ঠিক চালিয়ে যেতে পারব।’’ অনেক সময়ে কেউ-কেউ এই কাজের জন্য তাঁদের পকেটে টাকা গুঁজে দিয়ে যান, জানান সুনীলবাবু। শুধু তাই নয়, সংগঠনের দুই সদস্য শিশুদের পড়াশোনাও করান বলে জানান নবাব খান ও সুরেশ চৌধুরীরা।
রেলপাড়ের প্রায় সকলেই জানেন তাঁদের এই উদ্যোগের কথা। সংগঠনের অফিসের সামনে থার্মোকলের সাদা থালায় ধোঁয়া ওঠা ভাত-তরকারি পাত পেড়ে বসে খায় শিশুরা। বাবা-মা কেউ নেই সমনের। খেতে-খেতেই সে বলে, ‘‘এখানেই প্রথম দুপুরে খেতে পেয়েছি।’’ ছোট্ট সুনীতার বাবা দিনমজুর, মা নেই। সে জানায়, রোজ দুপুরে এখানেই খেতে ছুটে আসে।
আসানসোলের মহকুমাশাসক প্রলয় রায়চৌধুরী বলেন, ‘‘ওই সংগঠনের সদস্যেরা নিজেদের নানা সমস্যার কথা জানাতে আমার কাছে এসেছেন। কিন্তু এই কাজ করছেন, কখনও বলেননি। প্রশাসনিক কোনও সাহায্য ছাড়াই এমন কাজ সমাজে একটি দৃষ্টান্ত।’’