Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২২ মে ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

ছাই চাপা কপাল নিয়ে কাটছে দিন

বাড়ির দাওয়ায় আলো-বাতাস আসার জো নেই। বারান্দার পাশে বাঁশের কাঠামো করে, ঝোলানো রয়েছে সারের মোটা পলিথিনের বস্তা দিয়ে বানানো চাদর। ব্যাপারখানা

সৌমেন দত্ত
গলসি ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ০১:০৪
Save
Something isn't right! Please refresh.
ছাই-পথ: এ ভাবেই চলে যাতায়াত। —নিজস্ব চিত্র।

ছাই-পথ: এ ভাবেই চলে যাতায়াত। —নিজস্ব চিত্র।

Popup Close

দিনের বেলায় ঘরের সব দরজা-জানলা বন্ধ। কুপির আলোয় চলছে ঘরকন্না। কেন?

বাড়ির দাওয়ায় আলো-বাতাস আসার জো নেই। বারান্দার পাশে বাঁশের কাঠামো করে, ঝোলানো রয়েছে সারের মোটা পলিথিনের বস্তা দিয়ে বানানো চাদর। ব্যাপারখানা কী?

পূর্ব বর্ধমানের গলসি ১ ব্লকের পুরসার বিস্তীর্ণ এলাকায় এই পরিস্থিতির জন্য অভিযোগের আঙুল উঠেছে স্থানীয় চালকলগুলির দিকে।

Advertisement

স্থানীয় সূত্রের খবর, এলাকায় গোটা উনিশ চালকল রয়েছে। গত বছর দু’য়েক চালকলের ছাই নানা ভাবে এলাকায় ছড়াচ্ছে। অভিযোগ নানা বিধ— ট্রাক্টরে চাপিয়ে ছাই এনে ফেলা হচ্ছে গ্রামের পথে। সেখান থেকে হাওয়ায় উড়ে কালো ছাইয়ের চাদর ঢেকে দিচ্ছে ঘর-বাড়ি। আবার দিনে-রাতে চালকলের চিমনি দিয়ে বেরনো ছাইও ছড়াচ্ছে এলাকায়।

জাতীয় সড়ক (এন এইচ-২) ধরে দুর্গাপুর থেকে বর্ধমানমুখী বাস বা গাড়ি পুরসা পৌঁছতেই বাঁ দিকে তাকালে চোখে পড়ে, মাঠের মধ্যে দিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়ানো কালো রেখা। বাস্তবে সেটা জাতীয় সড়ক থেকে শান্তিপাড়া বা ডাঙাপাড়া গ্রামে যাওয়ার রাস্তা। নামেই রাস্তা, আসলে কালো ছাইয়ের (ফ্লাই অ্যাশ) গাদা।

গ্রামে ঢোকার মুখে খেতের এখানেওখানে ছাইয়ের কালো স্তূপ। কলাগাছের পাতা ছাই চাপা পড়ে কালচে-ধূসর। ছাই-পথ পেরিয়ে গ্রামে পৌঁছতেই বছর খানেকের ছেলে শেখ আরিয়ান আলিকে কোলে নিয়ে এগিয়ে এলেন সাধনা বেগম। জানালেন, গত এক মাসে উড়ে আসা ছাই চোখে ঢুকে যন্ত্রণা শুরু হওয়ায় বার দু’য়েক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হয়েছে ছেলেকে। কুলসুমা বেগম বললেন, ‘‘সকালে-বিকেল-রাতে ঝাঁট দিয়েও ছাই সরাতে না পেরে সারের বস্তা দিয়ে চাদর বানিয়ে বাড়ির বারান্দা ঢেকেছি।’’

পুরসা হাইস্কুলের ছাত্র শেখ সাবের আলি, ছাত্রী রূপসা খাতুনরা বলল, ‘‘স্কুলে যাতায়াতের পথে ছাই ঢুকে চোখ করকর করে। মাঠে ছাই ওড়ে বলে খেলতে যাওয়াও বন্ধ।’’ গৃহস্থ শেখ আব্বাস আলি, নাজিরা বেগমদের ক্ষোভ, ‘‘ছাইয়ের উৎপাতে সারা বছর দরজা-জানলা বন্ধ করে বাস করছি আমরা। কী জ্বালা!’’

দূষণের জ্বালা শুধু ছাইয়ের উৎপাতেই সীমাবদ্ধ নয়, ধরিয়ে দিচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। তাঁদের অভিযোগ, চালকলের ময়লা জল এসে মিশছে এলাকায় সেচের অন্যতম ভরসা দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশনের (ডিভিসি) খালে (এলবি-২)। বোরো মরসুমের জল আসার আগে খেতে বীজতলা করার জন্য সেই খালের জলই ব্যবহার করেছেন অনেক চাষি। তাতে কিছু দিনের মধ্যেই বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে বীজতলার একাংশ। পচা গন্ধে ভরে গিয়েছে চার দিক। খেতের জলে একটু বেশি ক্ষণ কাজ করলে গায়ে-হাতে-পায়ে চুলকানি হচ্ছে। সে জন্য তেমন খেতের জলে নেমে কাজ করতে বেশি পয়সা চাইছেন কৃষি মজুরেরা।

চালকলের ছাই সরানো এবং ফেলার জন্য সরকার নির্দিষ্ট বিধি রয়েছে। সরানোর সময়ে ছাই যাতে না ওড়ে, সে জন্য তা জলে ভেজানো এবং যেখানে সেই ছাই ফেলা হবে সেখানে তা মাটি চাপা দেওয়ার কথা। সে জমিও নির্দিষ্ট সময় অন্তর জলে ভেজানোর কথা। তার উপরে গাছ লাগানোর কথা। শান্তিপাড়া, ডাঙাপাড়া ঘুরে অন্তত তেমনটি হতে দেখা যায়নি।

বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, চালকলের চিমনি দিয়ে বেরনো ধোঁয়ায় কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইডের মতো ক্ষতিকর গ্যাস এবং শ্বাসযোগ্য ভাসমান কণা থাকে। ছাইয়ে মিশে থাকে সিলিকা। চালকল থেকে বেরনো জলে ক্লোরাইড, সালফেট, ফসফেট, ফেনল, সিলিকা এবং মাত্রাতিরিক্ত সোডিয়াম এবং পটাশিয়াম থাকার সম্ভাবনা। ফলে, দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা না হলে পরিবেশে তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়তেই পারে। এলাকাবাসীর একটা বড় অংশের অভিযোগ, তেমনই হচ্ছে পুরসায়। একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে রায়না এবং খণ্ডঘোষ থেকেও।

পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের কৃষি কর্মাধ্যক্ষ পরেশ পালেরও অভিযোগ, ‘‘সেচ খালে চাল কলের বর্জ্য মিশ্রিত জল মিশছে। ছাই উড়ে ভাতের থালায় পড়ছে। এ নিয়ে চালকল মালিকদের সঙ্গে প্রায়ই স্থানীয়দের গোলমাল বাধছে। পরিবেশ দফতরকে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করার জন্য বলেছি।’’

যদিও চালকল মালিকদের পক্ষে বর্ধমান চালকল সমিতির সম্পাদক সুব্রত মণ্ডলের দাবি, তাঁরা দূষণ নিয়ন্ত্রণের বিধি মেনে চলেন। চালকলের বর্জ্য মিশ্রিত জল প্রক্রিয়াকরণ করা হয়। কল থেকে বেরনো ছাই মালিকেরা সরানোর জন্য ঠিকাদারদের দেন। এক ট্রাক্টর (৫০-৬০ ঘনফুট) ছাই সরাতে খরচ পড়ে ১৭০ টাকা। ঠিকাদারেরা সে ছাই কোথায় ফেলেন, তা তাঁরা জানেন না। তাঁর দাবি, চালকলের ছাই ব্যবহার করে বিভিন্ন দ্রব্যের কাঁচামাল তৈরি করা যায়। বেঙ্গালুরুতে তেমন কাঁচামাল তৈরির সংস্থার সঙ্গে তাঁরা কথা বলেছেন। ভবিষ্যতে সেই সংস্থার কারখানায় সরাসরি ছাই পাঠানোর ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে।

তবে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের আঞ্চলিক অধিকর্তা (দুর্গাপুর) অঞ্জন ফৌজদার বলছেন, “চালকলের ছাই ও জল নিয়ে সমস্যা রয়েছে বলে আমরা জানি। পরিবেশ দূষিত হচ্ছে বলে চালকল মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে দু’তিন মাসের মধ্যে সমস্যার সমাধান করার জন্য বলেছি।’’

কিন্তু যত দিন সমস্যার সমাধান না হচ্ছে? হাওয়ায় পাক খেতে খেতে খেত পেরিয়ে ঘরের দিকে ছোটে কালো ছাইয়ের ঘূর্ণি। দরজা-জানলা বন্ধ করতে করতে নাজিরা, কুলসুমারা বলেন, ‘‘ছাই চাপা কপাল আমাদের!’’



Something isn't right! Please refresh.

আরও পড়ুন

Advertisement