Advertisement
E-Paper

চোখ আলোহীন, তবুও হারতে রাজি নন আইনজীবী

 তিনি আদালতের সরকারি আইনজীবী। দু’চোখে তাঁর দৃষ্টি নেই। কিন্তু তাতে কী! কর্মজীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত আসানসোল আদালতের ওই আইনজীবী চিত্তরঞ্জন দে দেখিয়েছেন, জীবনে চলার পথে কী ভাবে চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়, অন্ধজনে কী ভাবে ন্যায়ের আলো দেখাতে হয়। সহকর্মীরা তাঁকে নিয়ে শুধু উচ্ছ্বসিতই নন, গর্বিতও।

সুশান্ত বণিক

শেষ আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৭ ০২:৪১
চিত্তরঞ্জন দে।

চিত্তরঞ্জন দে।

তিনি আদালতের সরকারি আইনজীবী। দু’চোখে তাঁর দৃষ্টি নেই। কিন্তু তাতে কী! কর্মজীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত আসানসোল আদালতের ওই আইনজীবী চিত্তরঞ্জন দে দেখিয়েছেন, জীবনে চলার পথে কী ভাবে চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয়, অন্ধজনে কী ভাবে ন্যায়ের আলো দেখাতে হয়। সহকর্মীরা তাঁকে নিয়ে শুধু উচ্ছ্বসিতই নন, গর্বিতও।

ছোটবেলায় আর দশ জনের মতো তিনিও বেশ দুরন্তই ছিলেন। বয়স তখন মাত্র দশ বছর। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বন্ধুদের সঙ্গে আম পাড়ার জন্য গাছের ডালে উঠে বসেছিলেন। বিপর্যয়ের সেই শুরু। টাল সামলাতে না পেরে গাছ থেকে পড়ে যান চিত্তরঞ্জনবাবু। হাসপাতালের শয্যায় টানা প্রায় দু’সপ্তাহ জ্ঞান ছিল না। জ্ঞান যখন ফিরল, তখন বুঝলেন আলো নিভেছে! ছেলেকে নিয়ে অথৈ সাগরে পড়লেন পরিবারের সদস্যরাও। প্রায় চার বছর এই ভাবেই অনিশ্চয়তায় দিন কাটলো চিত্তরঞ্জনবাবুর। শেষে একদিন গা ঝাড়া দিয়ে উঠলেন তিনি। কারন, জীবন-যুদ্ধে জিততে হবে যে।

শুরু হল খোঁজ। কলকাতার বেহালা ব্লাইন্ড স্কুলের সন্ধান পেয়ে সেখানে ভর্তি হলেন। মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমের ব্লাইন্ড বয়েজ অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হন। সহপাঠীদের সাহাষ্য ও সন্ন্যাসীদের স্নেহে সেখান থেকে স্নাতক হন। এরপরে ধাপে ধাপে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথমে ইতিহাস নিয়ে স্নাতোকোত্তর ও বিএড পাশ করেন। পরে আইন বিষয়েও পড়াশোনা করে ডিগ্রি লাভ করেন।

কী ভাবে সম্ভব হল এতগুলো ডিগ্রি লাভ? উত্তরে চিত্তরঞ্জনবাবু বলেন, ‘‘তখন উচ্চ শিক্ষায় ব্রেইল পদ্ধতিতে পঠন-পাঠন শুরু হয়নি। তাই সেই সুযোগও পাইনি। বন্ধুদের মুখে পড়া শুনে শুনে মুখস্থ করেছি। নিয়ম মতো নীচু ক্লাসের ভাইয়েরা পরীক্ষার খাতায় লিখে দিয়েছে।’’ তিনি জানালেন, পরিবারের সদস্যদের জন্য তো বটেই ছাত্রাবস্থার সেই দিনগুলো মনে পড়লে আজও সহপাঠীদের প্রতি কৃতজ্ঞতায় তাঁর মন ভরে যায়।

তাঁর কর্মজীবনটিও শিক্ষণীয় হয়ে আছে সহকর্মী ও সমাজের কাছে। ১৯৭৫ সালে আসানসোল আদালতে ওকালতির শুরু। সরকারি আইনজীবী হিসেবে প্রথম নিযুক্তি ১৯৮৩ সালে। ৮৯ পর্যন্ত টানা ছ’বছর ওই পদেই থাকেন। মাঝের কয়েক বছর বিশ্রাম নিয়ে ফের ১৯৯৭ সালে সরকারি আইনজীবী হন। এখনও ওই পদেই বহাল রয়েছেন। দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে ৪২ বছর। বয়সের ভারে খানিকটা ন্যুব্জ হলেও কর্মস্থলে কামাই নেই। সকাল দশটায় ছেলের হাত ধরে ঠিক পৌঁছে যান। আদালতে গেলেই দেখা যায় বিচারকের উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে চোখা চোখা যুক্তি হেনে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করছেন।

চোখে দৃষ্টি নেই। অথচ এত সব সামলান কী করে? চিত্তরঞ্জনবাবু বললেন, ‘‘বিপর্যয় কাটিয়ে প্রথম যে দিন স্কুলে যাই, সে দিনই ঠিক করি এ ভাবেই চলতে হবে।’’ তাঁর এই অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে কুর্ণিশ জানিয়েছেন সহকর্মীরাও। বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক বাণী মণ্ডল বলেন, ‘‘তাঁর এই লড়াইকে আমরা শ্রদ্ধা করি।’’ চিত্তরঞ্জনবাবু জানান, সুদীর্ঘ কর্মজীবনে শতাধিক মামলা লড়ে দোষীদের শাস্তি দিয়েছেন। আজও তাঁকে তৃপ্তি দেয়, প্রায় বছর দশেক আগে এক অসহায় দম্পতির ছেলের খুনিকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়ার জিত।

Visually Impaired Case Lawyer
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy