বাংলা ছবির নায়ক হিসাবে যাত্রা শুরুর ঠিক পাঁচ বছরের মাথায় তিনি কিছুটা চমকেই দিয়েছিলেন। ‘মাচো মস্তানা’ ছবিতে দেখা দিয়েছিলেন ‘সিক্স প্যাক্স লুক’ নিয়ে। পরিষদীয় রাজনীতিতেও নিজের যাত্রা শুরুর ঠিক পাঁচ বছরের মাথাতেই চমকে দিলেন। দ্বিতীয় বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে। কিন্তু দলের সর্বোচ্চ নেতার খাসতালুকে গিয়ে ‘গান্ধর্ব মতে’ (বিজেপির একাংশের কথায়) তাঁর বিয়ে সারার খবর প্রকাশ্যে আসার পর আরও যে সব ‘তথ্য’ ঝুলি থেকে বেরোচ্ছে, তা আরও বেশি চমকপ্রদ! সে সব নিয়ে তাঁর অর্থাৎ খড়্গপুরের বিধায়কের দলের অন্দরে আলোচনার ঝড় বইছে। কিন্তু প্রকাশ্যে ‘হিরন্ময়’ নীরবতা। ‘হিরো হিরণ’-এর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ জানতে চাইলে প্রত্যেকেই শতহস্ত দূরে!
খড়্গপুর সদরের বিজেপি বিধায়ক হিরণ্ময় চট্টোপাধ্যায় (হিরণ) মঙ্গলবার নিজেই বিয়ের ছবি দিয়েছিলেন সমাজমাধ্যমে। তার আগে ঘুণাক্ষরেও জানা যায়নি যে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্বাচনী কেন্দ্র বারাণসীতে গিয়ে বিয়ে করতে চলেছেন হিরণ। বিধায়কের দ্বিতীয় বিবাহের খবরে বিজেপির অন্দরে যে খুব হইচই শুরু হয়েছিল, তা নয়। কিন্তু অচিরেই মুখ খোলেন হিরণের প্রথম স্ত্রী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায়। তিনি দাবি করেন, তাঁর সঙ্গে হিরণের কোনও আইনি বিবাহবিচ্ছেদই হয়নি! অনিন্দিতার দাবি ঘিরেই বিজেপির অন্দরে হইচই এবং অস্বস্তি শুরু হয়েছে। এমনকি, আসন্ন বিধানসভা ভোটে খড়্গপুর সদর আসনে তাঁকে আবার টিকিট দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন:
রাজ্য বিজেপির কোনও নেতা এ নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না। বিধায়কের দ্বিতীয় বিবাহের খবর এবং প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ না-হওয়া সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে বিতর্ক গত ২৪ ঘণ্টা ধরেই চলছে। কিন্তু শমীক ভট্টাচার্য, শুভেন্দু অধিকারী বা সুকান্ত মজুমদার, প্রত্যেকের মুখে কুলুপ। না নিন্দা, না সমর্থন। কোনও মন্তব্য নেই। হিরণ নামে তাঁদের যে এক বিধায়ক রয়েছেন, রাজ্য বিজেপির শীর্ষনেতারা যেন জানেনই না।
মন্তব্যে নারাজ বিজেপি পরিষদীয় দলের সদস্যরাও। দলনেতা শুভেন্দুই এখনও কিছু বলেননি। সুতরাং বাকিরা একেবারেই ঝুঁকি নিচ্ছেন না। হিরণের নাম শুনলেই মৃদু হেসে বুঝিয়ে দিচ্ছেন, এ বিতর্কে নাম জড়াতে চান না। উত্তরবঙ্গের এক বিধায়কের কথায়, ‘‘হিরণ বিজেপি পরিষদীয় দলের সঙ্গে সে ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না। আমরা যে ভাবে নিরন্তর পরিষদীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলি, হিরণ তা করতেন না। ফলে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন কোন খাতে বইছে, তা জানার কোনও অবকাশ ছিল না। আর এই মুহূর্তে তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাই না।’’
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বা খড়্গপুর সদরের বিজেপি নেতারাও হিরণ-প্রসঙ্গ শুনলেই প্রায় পালিয়ে বাঁচছেন। গত কয়েক বছরে খড়্গপুরে হিরণের ব্যক্তিগত জীবন কেমন ছিল? যাঁকে বিয়ে করেছেন, তাঁর সঙ্গে কত দিনের মেলামেশা? এই ঘটনা ঘিরে খড়্গপুরে কেমন প্রতিক্রিয়া? কোনও প্রশ্নেরই জবাব মিলছে না। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা থেকে রাজ্য স্তরের পদাধিকারী হওয়া এক নেতার কথায়, ‘‘আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না। সবই শোনা কথা। তার ভিত্তিতে কোনও মন্তব্য করতে পারব না।’’
আরও পড়ুন:
দলের নেতৃত্ব প্রকাশ্যে না-হয় মন্তব্য করছেন না। কিন্তু দলের বিধায়ককে ঘিরে নির্বাচনের মুখে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে দল বিধায়ককে প্রশ্নও কি করছে না? বিবাহ ‘ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত’ হলেও প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হওয়ার আগে দ্বিতীয় বিবাহ তো ফৌজদারি অপরাধ! বিজেপি যে হিন্দু পরম্পরায় বিশ্বাস রাখে, তাতেও এই অভিযোগ গুরুতর। কারণ, এতে নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িত। বিজেপি সূত্রের খবর, এ বিষয়ে দলের অন্দরে বেশ কয়েক দফা ‘মন্থন’ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু প্রথমত, হিরণের প্রথম স্ত্রী মুখে যা-ই বলুন, হিরণের বিরুদ্ধে কোনও লিখিত অভিযোগ এখনও দায়ের করেননি। আর দ্বিতীয়ত, হিরণ যে দ্বিতীয় বিবাহ করেছেন, তার কোনও কাগুজে প্রমাণ কারও হাতে নেই। বিজেপির শীর্ষনেতাদের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের ভাষায়, ‘‘প্রায় গান্ধর্ব মতে বিয়ে করেছেন তো! লগ্ন দেখে, পুরোহিত ডেকে, আচার-অনুষ্ঠান করে বিয়ে হয়েছে, এমন কোনও ছবি নেই। কোনও বিবাহ নিবন্ধন রয়েছে কি না, তা-ও কেউ জানে না। কিসের ভিত্তিতে প্রশ্ন করা হবে?’’
প্রশ্ন করা হোক বা না-হোক, হিরণের বিবাহ সংক্রান্ত বিতর্কের সঙ্গে দলের নাম জড়াতে দিতে বিজেপি নেতৃত্ব যে একেবারেই নারাজ, তা ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। গোটা বিষয়টির সঙ্গে সেই কারণেই দল এবং নেতৃত্বের দূরত্ব তৈরি করা হয়েছে। নির্বাচন ঘোষিত হওয়ার মাসখানেক আগে এই দূরত্ব কি হিরণের জন্য আদৌ ভাল সঙ্কেত? এই দূরত্ব হিরণের সঙ্গে টিকিটের দূরত্বও কি বাড়িয়ে দিচ্ছে? দলের অন্দরে এই প্রশ্নও ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে।