ছবি মুক্তির সময়, বাংলা ছবির পাশে দাঁড়াতে গিয়ে হলে হিন্দি ছবি না পাওয়া— এ সব নিয়ে টানাপড়েন চলছিলই। তারই মধ্যে নতুন তরঙ্গ। টলিপাড়ায় এ বার আলোচনার কেন্দ্রে স্বাস্থ্য বিমা।
টেকনিশিয়ানদের স্বাস্থ্য বিমা নেই। গত দু’বছর ধরে এই নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে একাধিক বার। তবে তার বেশি কিছুই এগোয়নি। এ বার বিধানসভা ভোটের আগেই দেখা গেল টেকনিশিয়ানদের স্বাস্থ্য বিমা করিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ। আর তা ঘিরেই ফের আলোচনায় সাংসদ-অভিনেতা দেব ও ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের মতপার্থক্য।
বৃহস্পতিবার দেবের তরফে হওয়া একটি ঘোষণা এমনই ইঙ্গিত দিয়েছে। সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্মতিতে তিনি টলিপাড়ার সাত হাজার টেকনিশিয়ানকে রাজ্য সরকারের ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পের আওতাভুক্ত করার বিষয়ে পদক্ষেপ করতে চলেছেন। প্রকল্প অনুযায়ী, প্রত্যেক পরিবার ৫ লক্ষ টাকার বিমা পাবে। ১৪ মার্চ টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োতে এই প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করা হবে। যদিও টেকনিশিয়ানদের জন্য এই পদক্ষেপ আরও আগে করার কথা ছিল ফেডারেশনের।
টলিপাড়ার কয়েক জন টেকনিশিয়ানের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, ২০১৯ সালে একটি স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্প চালু হয়েছিল তাঁদের জন্য। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্য়োপাধ্য়ায় এটি চালু করেছিলেন। গত দু’বছর ধরে সেটি বন্ধ। ফলে, আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়লে অনেকেই চিকিৎসা করাতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। কারণ, অনেকের কাজেই পর্যাপ্ত অর্থ থাকে না।
কিন্তু টেকনিশিয়ানদের যে স্বাস্থ্য বিমার প্রয়োজন, সে বিষয়টি ফেডারেশনে না গিয়ে দেবের কাছে পৌঁছল কী করে? এ বিষয়ে দেব বলেন, ‘‘সম্প্রতি আমার সঙ্গে কয়েক জন টেকনিশিয়ান যোগাযোগ করেছিলেন। তাঁরাই জানান, তাঁদের কোনও স্বাস্থ্য বিমা নেই।’’ এর পরেই দেব বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীকে জানালে তিনি টেকনিশিয়ানদের ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পের আওতাধীন করার অনুমতি দেন।
তবে বিধানসভা নির্বাচনের আগে দেবের এই উদ্যোগ দেখে একাংশের তরফে সমালোচনাও এসেছে। কেউ কেউ বলছেন, রাজ্য সরকারের ভাবমূর্তির উন্নতি করতেই এ পদক্ষেপ। দেব যদিও উত্তর দেন, ‘‘নির্বাচনের পরে হলেও আমার একই ভূমিকা থাকত। কারণ, বিনোদনদুনিয়া টিকে থাকে অভিনেতা এবং টেকনিশিয়ানদের আদানপ্রদানে। বরাবর টেকনিশিয়ানদের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। সেটাই আরও এক বার করলাম। ওঁরা উপকৃত হলে আমার চেষ্টা সার্থক।’’
পরিচালক সুদেষ্ণা রায়, ভেন্ডার গিল্ড-এর সম্পাদক সৈকত দাস দেবের এই পদক্ষেপকে ইতিমধ্যেই সাধুবাদ জানিয়েছেন। সুদেষ্ণা বলেছেন, ‘‘আগে টেকনিশিয়ানদের জন্য একটি বিমা ছিল। সেটিতেও আমরা ৫ লক্ষ টাকা কভারেজ পেতাম। ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্প চালু হওয়ার পর একই সঙ্গে দু’টি বিমায় নাম নথিভুক্ত করা যাবে না, এই মর্মে একটি সরকারি নির্দেশিকা আসে। আমরা তাই ‘স্বাস্থ্যসাথী’ করিনি, এই মর্মে লিখিত দিই। পরে আগের বিমাটি বন্ধ হয়ে যায়। ‘স্বাস্থ্যসাথী’ও নেই। গত দু’বছর তাই আমরা কোনও বিমার আওতাধীন ছিলাম না। দেব সেই ব্যবস্থা করছেন। এর থেকে ভাল আর কী হতে পারে?’’ নির্দিষ্ট দিনে সুদেষ্ণা তাই প্রকল্পে নাম তোলাতে যাবেন। একই কথা বলেছেন সৈকত। তাঁর কানেও ঘোষণা পৌঁছেছে। তিনিও খুব খুশি। তাঁর বক্তব্য, ‘‘দেবের এই পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। সকলে এই প্রকল্পের সুযোগসুবিধা পেলে আমরা সত্যিই উপকৃত হব।’’ তবে ভিন্ন সুর রূপসজ্জাশিল্পী পাপিয়া চন্দের। তিনি বলছেন, ‘‘বিমার থেকেও আমি কাজ বেশি পাওয়ার পক্ষপাতী। কারণ, কাজ থাকলে অর্থ থাকবে। তখন চিকিৎসা খাতে খরচ করতে সমস্যা হবে না। প্রয়োজনে বেসরকারি বিমাও করিয়ে রাখতে পারব।’’ সেটাই তিনি করেছেন। পাপিয়ার আরও দাবি, বিমা যখন-তখন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কাজ থাকলে তখন সমস্যা হবে না। পাশাপাশি, পাপিয়া এ-ও জানিয়েছেন, সব টেকনিশিয়ানের অর্থবল নেই। তাঁদের জন্য ‘স্বাস্থ্যসাথী’ খুবই প্রয়োজনীয়।
স্বাস্থ্য বিমার নতুন এই উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপবাবু। তাঁর বক্তব্য, রাজ্য সরকারের তরফ থেকে টেকনিশিয়ানদের নাম ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পের আওতাধীন করার ডাক আগেই এসেছিল। ফেডারেশন সেই ডাকে সাড়া দেয়নি কেন? স্বরূপের কথায়, ‘‘মেডিক্লেম বেনিফিট গত অক্টোবর মাসে শেষ হওয়ার পর সংস্কৃতি দফতর থেকে আমাদের একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়। বলা হয়, আমরা যাঁদের এই মেডিকেল বেনিফিট দিতাম, তাঁদের যেন ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করি। ফেডারেশন জানতে চায়, ফেডারেশন জানতে চায়, মেডিক্লেম বেনিফিটে যে বিশেষ সুযোগসুবিধা কলাকুশলীরা পান, 'স্বাস্থ্যসাথী' প্রকল্পের আওতায় নাম নথিভুক্ত করলে তাঁরা কি তা পাবেন? কারণ, টেকনিশিয়ানদের পরিবারের বেশির ভাগই আগে থেকে ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পের আওতাধীন। তাই নতুন করে ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলে তা কতটা সাফল্য পাবে তা নিয়ে সংগঠন চিন্তিত। এ ছাড়া, বেশির ভাগ টেকনিশিয়ান তাঁদের গিল্ড এবং ফেডারেশনকে জানিয়েছেন, তাঁরা যে ‘ক্যাশলেস মেডিক্লেম বেনিফিট’ পেতেন, সেই সুযোগসুবিধা পেতে চান। এতে তাঁদের এবং তাঁদের পরিবারের সুবিধা হয়। তাই ফেডারেশন আগের বিমা সংস্থার কাছে চিঠি দিয়ে জানতে চায়, পুরনো প্রকল্পটি পুনরায় চালু করতে কী করতে হবে? এই বিষয়ে ইতিমধ্যেই একটি বিমা সংস্থার সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুন:
গত বছরের অক্টোবরের আগে টেকনিশিয়ানদের বিমা প্রকল্পটি শেষ হয়ে যায়। তখনই রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্য দফতরের থেকে ‘স্বাস্থ্যসাথী’ প্রকল্পে টেকনিশিয়ানদের নাম নথিভুক্তকরণের প্রস্তাব আসে। কিন্তু টেকনিশিয়ানরা জানিয়েছেন, আগের বিমায় ‘ক্যাশলেস’ সুবিধা বেশি ছিল। ফলে ফেডারেশন আগের বিমা চালু করার পক্ষে। স্বরূপ জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই সংগঠনের তরফ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এই বিষয়ে লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে। চলছে কথাবার্তাও।
টেকনিশিয়ানদের জন্য স্বাস্থ্য বিমা প্রকল্প চালু করার আবেদন দেবের কাছে পৌঁছোল কী ভাবে? ফেডারেশন সভাপতি বললেন, ‘‘এটা দেব বলতে পারবেন। হয়তো কেউ বা কারা ওঁকে ভুল বুঝিয়েছেন।’’ আগের স্বাস্থ্য় বিমাটিই বা কেন বন্ধ হয়ে গেল? এই প্রসঙ্গে তিনি জানান, আগের স্বাস্থ্য বিমাটির যাবতীয় দায়ভার রাজ্য সরকার বহন করছে। ফলে এই উত্তর তাঁর জানা নেই।