×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৯ এপ্রিল ২০২১ ই-পেপার

পশ্চিমবঙ্গ

নানা ময়দানে এই মুহূর্তের সেরা দশ বঙ্গনারী

নিজস্ব প্রতিবেদন
কলকাতা ০৮ মার্চ ২০২১ ১৬:৪১
কাজের ক্ষেত্র আলাদা। ব্যক্তিত্বেও তাঁরা সকলে ভিন্ন মেরুর। কিন্তু তাঁদের কাজই নতুন করে লিখেছে নারীদিবসের সংজ্ঞা। নারী-পুরুষ দ্বন্দ্ব দূর হয়ে তাঁদের কাজে উঠে এসেছে মানুষ। নারী দিবসে জেনে নেওয়া যাক সে রকমই কয়েক জন বাঙালিনীর কথা।

গত কয়েক দশকে আদিগঙ্গা দিয়ে জল বিশেষ বয়ে যায়নি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে সাক্ষী থেকেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অগ্নিকন্যা’ থেকে বাংলার প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ওঠার যাত্রাপথের। তাঁর আটপৌরে শাড়ি, হাওয়াই চটি, ইংরেজি উচ্চারণ, শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে মন্তব্য এক দিকে তির্যক হয়েছে, অন্য দিকে তিনি এক এক করে এগিয়ে যাওয়ার ধাপ অতিক্রম করেছেন।
Advertisement
রাজনীতিতে হাতেখড়ি কলেজজীবনেই। লড়াকু নেত্রী হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন কংগ্রেসের অন্দরমহলে। কিন্তু মতবিরোধের পরে সেই দলে আর থাকতে চাননি। খড়কুটো সম্বল করেই ১৯৯৭ সালের প্রথম দিন তৈরি করেছিলেন আলাদা দল। সে সময় তৃণমূলকে ব্যঙ্গ করে ‘ছিন্নমূল’ বলার লোকের অভাব ছিল না। কিন্তু নেত্রীকে থামানো যায়নি কোনও কটূক্তিতেই।

কয়লা, রেল-সহ একাধিক মন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন বিভিন্ন সময়ে। কিন্তু মতানৈক্য বা মতবিরোধ তাঁর কাছে সবসময় গুরুত্বপূর্ণ থেকেছে আপসের তুলনায়। তাই রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে দ্বিধা করেননি। বাংলার প্রথম মহিলা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেও প্রতিবাদী পরিচয় তাঁর সঙ্গ ছাড়েনি। রাজনৈতিক মহলের মত, সমালোচনায় তাঁকে বিদ্ধ হতে হলেও তাঁর সাধারণ মানুষের কাছে থাকার ভাবমূর্তি এখনও ভারতীয় রাজনীতিতে বিরল।
Advertisement
ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বাবা যুক্ত ছিলেন দেশের নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরশনের সঙ্গে। মা স্নাতকোত্তর করেছেন সাহিত্যে। একমাত্র মেয়ে শ্রেয়াও উচ্চশিক্ষায় প্রথমে বিজ্ঞান শাখাতেই ছিলেন। পরে সঙ্গীতচর্চায় আরও সময় দেবেন বলে চলে আসেন কলা বিভাগে। পড়াশোনা করেন ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে।

তাঁর সঙ্গীতচর্চা শুরু হয়েছিল ৩ বছর বয়স থেকে। সেই সাধনা এখনও জারি। তার মাঝেই জয় করা হয়েছে আরবসাগরের তীরে বলিউডের সাম্রাজ্য। রিয়েলিটি শো-এর মঞ্চ থেকে নিজেকে বলিউডের এক নম্বর মহিলা প্লে ব্যাক শিল্পীর জায়গায় নিয়ে যেতে পেরেছেন তিনি। ১০ বছরের প্রেমপর্বের পরে বিয়ে করেছেন বাল্যবন্ধু শিলাদিত্য মুখোপাধ্যায়কে। এখন মা হওয়ার জন্য দিন গুনছেন শ্রেয়া। তবে কাজ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবন আড়ালেই রাখতে ভালবাসেন সরস্বতীর এই বরপুত্রী।

কলকাতায় শৈশব কাটানো মহুয়া মৈত্রের জন্ম অসমে। উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দিয়েছিলেন আমেরিকায়। সেখানে ম্যাসাচুসেটসের মাউন্ট হোলিওকে কলেজ থেকে গণিত এবং অর্থনীতিতে স্নাতক হন। পড়াশোনা শেষে চাকরিজীবনও শুরু বিদেশে। ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কার হিসেবে চাকরি করতেন নামী বহজাতিক সংস্থায়।

নিউ ইয়র্ক এবং লন্ডনে কয়েক বছর কর্মজীবন কাটানোর পরে মহুয়া চাকরি ছেড়ে দেন। নামী সংস্থার উচ্চপদে ইস্তফা দিয়ে দেশে ফেরেন ২০০৯-এ। যোগ দেন যুব কংগ্রেসে। রাহুল গাঁধীর ‘আম আদমি কা সিপাহি’ প্রকল্পে মহুয়া ছিলেন উল্লেখযোগ্য নাম।

২০১০ সালে কংগ্রেস ছেড়ে তিনি যোগ দেন তৃণমূলে। ৬ বছর পর বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হন নদিয়ার করিমপুর কেন্দ্র থেকে। সাংবাদিকদের প্রতি তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্য নিয়ে যথেষ্ট জলঘোলা হলেও বাগ্মী হিসেবে পরিচিতি আছে মহুয়ার। জাতীয় রাজনীতিতে সুবক্তা হিসেবে যে কয়েক জন বাঙালি সমাদৃত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে মহুয়া এক জন।

কয়েক প্রজন্ম ধরে তাঁর পরিবার দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের পূজারী। উত্তর কলকাতায় গঙ্গার ধারে কাটানো ছোটবেলা ঝুঁকে পড়েছিল নাচের দিকে। মেয়ের আগ্রহ দেখে মা ভর্তি করে দিয়েছিলেন নাচের স্কুলে। তখনও লকেট চট্টোপাধ্যায় জানতেন না অভিনেত্রীজীবন অপেক্ষা করে আছে তাঁর জন্য।

টেলিভিশনের পরে সুযোগ বড় পর্দায়। ‘মায়ের আঁচল’, ‘পরিবার’, ‘অগ্নি’, ‘শুভদৃষ্টি’, ‘চাঁদের বাড়ি’, ‘গোঁসাইবাগানের ভূত’ ছবির অভিনেত্রী লকেট জানতেন না এর পরের অধ্যায় রাজনীতির। প্রতিবাদী সত্তা থেকেই জড়িয়ে পড়েছিলেন তৃণমূলের সঙ্গে। কয়েক বছর পর সেই সম্পর্ক নিজেই ভাঙলেন।

হুগলির বিজেপি সাংসদ  লকেট অভিনেত্রী থেকে নেত্রী হয়েও স্বচ্ছন্দ ও সাবলীল। থাকতে ভালবাসেন মাটির কাছাকাছি।

অভিনীত চরিত্রের আড়ালে নিজের পরিচয় চাপা পড়ে যাওয়াই কুশীলবের সবথেকে বড় সাফল্য। কৈশোরেই সেই অভিজ্ঞতার শরিক দিতিপ্রিয়া রায়। তিনি এখন দিতিপ্রিয়া কম, ‘রানিমা’ বেশি। রানি রাসমণির চরিত্রে তাঁর অভিনয় প্রথমে নির্ধারিত ছিল কয়েক মাসের জন্য। কিন্তু দর্শকদের মধ্যে দিতিপ্রিয়ার জনপ্রিয়তা দেখে সিদ্ধান্ত পাল্টাতে বাধ্য হন চ্যানেল কর্তৃপক্ষ।

গ্ল্যামার থেকে বহু দূরে থাকা বয়সে কয়েক গুণ বড়, বিগত শতাব্দীর মহীয়সীর চরিত্রেই বাজিমাত করেছেন কিশোরী দিতিপ্রিয়া। তাঁর ‘রোক্কে করো রগুবীর’ নিয়ে মিম যত ছড়িয়েছেন, ততই সাফল্যের স্বাদ গাঢ় হয়েছে তাঁর কাছে।

ইংরেজি মাধ্যমে কাটানো শৈশব ও কৈশোর নিয়ে রবীন্দ্রসংস্কৃতি থেকে বেশ দূরেই ছিল তাঁর অবস্থান। তবু তাঁকে দেখেই ঋতুপর্ণ ঘোষ বলেছিলেন, ‘‘আমি আমার পুপেকে পেয়ে গিয়েছি।’’

খোলা চুল, সুতির শাড়ির মার্জিত সাজে তাঁর মধ্যে দিয়ে অন্যধারার নায়িকাকে পেয়েছিলেন বাংলা ধারাবাহিকের দর্শক। তার পরে ‘গানের ওপারে’-এর রাবীন্দ্রিক ঘরানা ভেঙে বিনোদনের বিভিন্ন মাধ্যমে অন্য ভূমিকাতেও সফল হয়েছেন মিমি চক্রবর্তী।

রাজ চক্রবর্তীর প্রথম ছবি ‘বাপি বাড়ি যা’-র নায়িকা মিমি পরে অভিনয় করেছেন ‘বোঝে না সে বোঝে না’, ‘প্রলয়’, ‘খাদ’, ‘কাটমুণ্ডু’, ‘ক্রিসক্রস’, ‘মন জানে না’, ‘ড্রাকুলা স্যর’-সহ বহু ছবিতে। অভিনেত্রীজীবন সম্পর্কের টানাপড়েনে জড়িয়ে পড়তেও দেরি করেননি।

রাজ চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর প্রেম ছিল কি না, শুভশ্রীকে রাজ বিয়ে করায় মিমি কতটা একা হয়ে পড়লেন, সে নিয়ে যখন টলিউড চর্চায় ব্যস্ত, তখনই মিমি লোকসভা নির্বাচনে যাদবপুরের তৃণমূল প্রার্থী। সুজন চক্রবর্তীর মতো দুঁদে বামনেতাকে হারিয়ে সাংসদ হওয়া মিমির প্রতিবাদী সত্তা আগের মতোই সক্রিয়। তার পরেও ব্যস্ত দিনের শেষ অংশ নিভৃত কোণ খোঁজে দুই পোষ্য চিকু এবং ম্যাক্সের সখ্যে। নারীর সাফল্যের সংজ্ঞা নতুন করে লেখার পরে মিমির মনে পড়ে মায়ের কথা। ফেলে আসা জলপাইগুড়িও তাঁকে ডাকে।

পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণকাণ্ডে তাঁর নামও কালিমালিপ্ত হয়েছিল। সে সময় তাঁর পরিচয় ছিল ‘মূল অভিযুক্তের প্রেমিকা’ হিসেবে। সেই পরিচয় কাটিয়ে উঠেছেন। কিন্তু বিতর্ক পিছু ছাড়েনি নুসরত জাহানের।

ভিন্‌ ধর্মে বিয়ে, বিয়ের পরে শাঁখা সিঁদুর পরা নিয়ে তিনি ধর্মান্ধদের রোষের মুখে পড়েছেন। কিন্তু হাজারো কটূক্তি সহ্য করেও তিনি নিজের লক্ষ্যে অনড়। সমালোচনা সত্ত্বেও আটকানো যায়নি ২০১৯-এ বসিরহাট থেকে তাঁর সাংসদ নির্বাচিত হওয়া।

সম্প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন আরও বেশি করে চলে ব্যবচ্ছেদের টেবিলে। স্বামী নিখিলের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার অভিযোগ, ছবির নায়ক যশের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক— সবকিছুই আতসকাচের নীচে। তবে ‘শত্রু’, ‘খিলাড়ি’, ‘খোকা ৪২০’, ‘হর হর ব্যোমকেশ’, ‘জুলফিকর’, ‘হরিপদ ব্যান্ডওয়ালা’-সহ আরও অনেক ছবির নায়িকা নুসরত আজ জানেন জীবন জুড়ে গোলাপফুলের থেকে কাঁটাই বেশি ছড়িয়ে থাকে।

কারমেল স্কুলের পরে লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ পেরিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস নিয়ে শুরু করেছিলন স্নাতকোত্তর। নিশ্চিত চাকরির কেরিয়ার দিয়ে সাজাতেই পারতেন জীবনকে। কিন্তু ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত বেছে নিলেন ছোটবেলার নাচের প্রতি ভালবাসাকেই। নাচের হাত ধরেই একদিন শুরু অভিনয়।

রূপকথার গল্প ‘শ্বেত কপোত’-এ প্রথম অভিনয় কুশল চক্রবর্তীর বিপরীতে। তার পর ‘আন্দোলন’, ‘সিনেমাওয়ালা’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’, ‘হরতনের গল্প’-এর মতো টেলিসিরিজে অভিনয়। প্রথম ছবিতে অভিনয় ১৯৯২ সালে, ‘শ্বেত পাথরের থালা’ ছবিতে। ক্রমে সময়ের সঙ্গে তিনি দেখিয়ে দিলেন টেলিভিশন থেকে এসেও সিনেমায় সফল হওয়া যায়।

কিন্তু শুধু বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করে থেমে যেতে চাননি ঋতুপর্ণা। ‘লাল পান বিবি’, ‘নাগপঞ্চমী’, ‘রাখাল রাজা’, ‘সুজন সখি’, ‘সংসার সংগ্রাম’, ‘লাঠি’, ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’ ছবির নায়িকা ঋতুপর্ণা নিজেক মেলে ধরলেন ‘পারমিতার একদিন’, ‘উৎসব’, ‘দহন’ ছবির অভিনেত্রী হিসেবে।

প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে প্রেমের গুঞ্জন থেকে তাঁর ‘প্রাক্তন’ হয়ে ওঠার কানাঘুষো। সবই একে একে জুড়েছে তাঁর এগিয়ে চলার পথে। নানা বিতর্ক, অভিযোগ পেরিয়ে তিনি আজ নিজেই টলিউডে একটি প্রতিষ্ঠান। জীবন সংগ্রামে মুখোমুখি হওয়ার শক্তির যোগান খুঁজে পান স্বামী আর দুই সন্তানের ভরপুর সংসার থেকে।

নদিয়ার চাকদেহর মেয়েটি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ফুটবলপাগল। ১৯৯২ ক্রিকেট বিশ্বকাপের পর থেকে পছন্দের গতি তার অভিমুখ পাল্টে ফেলল। চাকদহে মেয়েদের ক্রিকেটের অনুশীলনের সুযোগ ছিল না। রোজ চাকদহ থেকে কলকাতা যাতায়াত করতেন তিনি। পরিশ্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রথমে অলরাউন্ডার, তার পর জাতীয় দলের অধিনায়ক।

মেয়েদের ক্রিকেটে ঝুলনই সর্বোচ্চ উইকেশিকারি। ১০টি টেস্টে তাঁর সংগ্রহ ৪০টি উইকেট। সেরা পারফরম্যান্স ২৫ রানে ৫ উইকেট। ১৮২টি ওয়ানডেতে তুলে নিয়েছেন ২২৫টি উইকেট। সেরা পারফরম্যান্স ৩১ রানে ৬ উইকেট। ৬৮টি টি-২০ ম্যাচে তাঁর নামের পাশে ৫৬টি উইকেট। সেরা বোলিং ১১ রানে ৫ উইকেট।

ঝুলনের পারফরম্যান্স এখনও ক্রিকেট নয়, ‘মেয়েদের ক্রিকেট’। স্পনসর, খ্যাতি, প্রচার, সম্মান, এ সবের কথা না ভেবে শুধু ক্রিকেটকে ভালবেসে তাঁরা পা রেখেছিলেন বাইশ গজে। সে দিনের তুলনায় মেয়েদের ক্রিকেট হাঁটিহাঁটি পা করে যতটা এগিয়েছে, তার জন্য ঝুলন অন্যতম অনুঘটক।

টেলিভিশন থেকে এসেও দাপটের সঙ্গে শাসন করা যায় ছবির জগতকে। আরও কিছু জনের সঙ্গে দেখিয়ে দিয়েছেন সোহিনী সরকারও। ‘রূপকথা নয়’, ‘ফড়িং’, ‘রাজকাহিনী’, ‘হর হর ব্যোমকেশ’, ‘সিনেমাওয়ালা’, ‘দুর্গা সহায়’ ছবির পাশাপাশি ওয়েব সিরিজেও সোহিনী আজ উল্লেখোগ্য নাম। ‘মানভঞ্জন’, ‘পাঁচফোড়ন’ ওয়েবসিরিজে তাঁর অভিনয় মন জয় করেছে নেটাগরিকদের।