E-Paper

পুজো-কর্তাদের বিসর্জন, ধীরে চলতে চায় শাসক

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বিষয়ে এখনই মন্তব্য করছেন না। সূত্রের খবর, দুর্গা পুজোর মতো সামাজিক উৎসবে সরকার নাক গলাচ্ছে, এই বার্তা যাওয়ার পক্ষপাতী নন মুখ্যমন্ত্রী।

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬ ০৯:১৭
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

আশ্বিনের আকাশে কি আষাঢ়ের মেঘ!

যদিও অকাল বোধনের মরসুমের এখনও দেরি আছে, রাজ্যে জমানা বদলের পরে এ বারের দুর্গা পুজোর আয়োজন ঘিরে দেখা দিচ্ছে সংশয়ের ছায়া। কলকাতা শহর ও সংলগ্ন এলাকায় বিগত বেশ কিছু বছর ধরে বড়, মাঝারি নানা বারোয়ারি পুজো আয়োজনের হোতা ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা। দল ক্ষমতায় আসার পরে তৃণমূল নেতাদের পুজো-দাপট ধারাবাহিক ভাবে বেড়ে চলেছিল। নেতা-মন্ত্রী থেকে পুর-প্রতিনিধি, বিভিন্ন পুজোয় তাঁরাই ছিলেন উদ্যোক্তা। এখন দুর্নীতির দায়ে বা অন্যান্য অভিযোগে এঁদের অনেকেই গারদের পিছনে। অনেকে পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন, অন্য একাংশ আবার এলাকা থেকে বেপাত্তা। পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে তাঁরা এলাকায় ফিরে এলেও পুরনো প্রতাপ আর ফিরে পাবেন না, বলাই যায়। এমতাবস্থায় কলকাতার পুজোর কি চেহারা হবে, প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে এখনই।

এই প্রশ্ন পৌঁছেছে শাসক শিবিরেও। তবে বিজেপির সরকার এই ক্ষেত্রে ‘ধীরে চলো’ নীতি নিচ্ছে। আর শাসক দলের তরফে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, কোনও পুজো কমিটি দখলের পথে যেন বিজেপি নেতা-কর্মীরা না হাঁটেন। কাল যা ছিল তৃণমূল নেতাদের পুজো, রং বদলে সেটাই বিজেপির হয়ে গেল এবং পুজোর অছিলায় ফের ‘ব্যবসা’ শুরু হল— এই সম্ভাবনা আটকাতে চান বিজেপি নেতৃত্ব। তাঁরা অবস্থা বুঝে ব্যবস্থার পক্ষপাতী।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বিষয়ে এখনই মন্তব্য করছেন না। সূত্রের খবর, দুর্গা পুজোর মতো সামাজিক উৎসবে সরকার নাক গলাচ্ছে, এই বার্তা যাওয়ার পক্ষপাতী নন মুখ্যমন্ত্রী। বিভিন্ন পুজোর এত দিনের মাথারা অস্তাচলে যাওয়ার পরে পুজো কমিটি বা স্থানীয় বাসিন্দারা যদি পুজোর ব্যাপারে সহায়তা চান, তখন ভেবে দেখা যাবে। আর বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সেই বার্তাই আরও স্পষ্ট করে দিচ্ছেন, ‘‘পুজো দখল করতে যাওয়ার কোনও প্রয়োজন বিজেপির নেই। দলের নেতা-কর্মীদের সেটা মাথায় রাখতে হবে। ক্লাব বা পুজো কমিটি কোনও সহযোগিতা চাইলে তখন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের কথা ভাবা হবে। তবে কোনও ভাবেই পুজোর নামে ব্যবসা চলবে না!’’

তৃণমূল আমলের নানা দুর্নীতি ও অপরাধের ঘটনার ফাইল খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেপি সরকার। বিধানসভা ভোটের ফলপ্রকাশের পর থেকে বিভিন্ন পুরসভার বহু পুর-প্রতিনিধি গ্রেফতার হয়েছেন। তৃণমূলের অন্তত শ’দেড়েক পুর-প্রতিনিধি ইস্তফা দিয়েছেন, সেই তালিকা বেড়েই চলেছে। কলকাতা পুরসভার এখনও পর্যন্ত ৮ জন পুর-প্রতিনিধিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এঁদের অনেকেই বড় বড় পুজোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সে সব আয়োজনের বাজেট ছিল চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মতো! দক্ষিণ কলকাতায় তৃণমূলের এক সর্বভারতীয় নেতার ব্যক্তিগত সহায়কের পুজোর গৌরী সেনের কাজও করেছেন এঁদের মধ্যে কেউ কেউ। সূত্রের খবর, পরিস্থিতির পরিবর্তনে প্রাক্তন শাসক দলের নেতা ও পুর-প্রতিনিধিদের একাংশ বর্তমান শাসক শিবিরের কাছে বার্তা পাঠাচ্ছেন পরিত্রাণের জন্য। কিন্তু প্রশাসন ও দলে মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা আছে, অতীত রেকর্ড ভাল করে ঝালিয়ে না-দেখে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। রাজ্যের এক মন্ত্রীর কথায়, ‘‘আমাদের রাজ্যে এবং কলকাতায় পুজোকে একটা পুরোদস্তুর শিল্প (ইন্ডাস্ট্রি) ধরা হয়ে এসেছে। অনেক মানুষ তার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, পুজো আয়োজনের সঙ্গে সঙ্গে রীতিমতো সিন্ডিকেট ছিল। কোথাকার টাকা কোথা দিয়ে কোথায় গিয়েছে, কোনও মাপজোখ নেই!’’

পুজো-কর্তা ও দাপুটে নেতা-মন্ত্রীদের মধ্যে সুজিত বসু ইডি-র হাতে গ্রেফতার হয়ে এখন জেলে। অরূপ বিশ্বাসকে মেসি-কাণ্ডে সমন পাঠিয়েছে পুলিশ। প্রাক্তন শাসকের এই রকম বেশ কিছু নেতাই পায়ের নীচের মাটি হারিয়েছেন, তাঁদের ক্লাবের হালও আপাতত সঙ্গিন। দুর্গোৎসবের ফোরামের কর্তারাও বিপদের আঁচ পেয়েছেন। এই অবস্থায় পুজো লাটে উঠলে পাল্টা প্রচার হবে, পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্য‌োপাধ্যায়ের সরকার পুজো-আচ্চা করতে দেয় না বলে প্রচার চালিয়ে আসা বিজেপির আমলে দুর্গা পুজোর আলো নিভে গেল! আর কিছু বিজেপি নেতার পুজো ফুলে-ফেঁপে উঠল। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে শাসক দলের এক নেতার বক্তব্য, ‘‘বিভিন্ন ক্লাবের আয়োজনে, সামাজিক উদ্যোগে অবশ্যই পুজো হবে। অনাবশ্যক আড়ম্বর না হয় একটু কম হোক!’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Suvendu Adhikari Durga Puja

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy