Advertisement
১৬ জুলাই ২০২৪

নাটকের মাঝে বিজেপির হুমকি, সভা হবে ওখানেই

আদালতের নির্দেশিকার পরেও পুরসভায় নাটক চলল সন্ধ্যা পর্যন্ত! এবং তার পরেই মঙ্গলবার বিজেপি জানিয়ে দিল, কলকাতা হাইকোর্টের বেঁধে দেওয়া শর্ত মেনে ৩০ নভেম্বর ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনেই অমিত শাহের সমাবেশ করবে তারা। বাধা দিলে ফল ভুগতে হবে সরকার ও পুলিশকে। যার ফলে, আরও চাপ বেড়ে গেল পুলিশ-প্রশাসনের উপরে!

নিজস্ব সংবাদদাতা
কলকাতা শেষ আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০১৪ ০৪:১২
Share: Save:

আদালতের নির্দেশিকার পরেও পুরসভায় নাটক চলল সন্ধ্যা পর্যন্ত! এবং তার পরেই মঙ্গলবার বিজেপি জানিয়ে দিল, কলকাতা হাইকোর্টের বেঁধে দেওয়া শর্ত মেনে ৩০ নভেম্বর ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনেই অমিত শাহের সমাবেশ করবে তারা। বাধা দিলে ফল ভুগতে হবে সরকার ও পুলিশকে। যার ফলে, আরও চাপ বেড়ে গেল পুলিশ-প্রশাসনের উপরে!

কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাক এ দিন জানিয়ে দেন, বিজেপির যে কোনও জায়গায় সভা করার অধিকার রয়েছে। তবে ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সভা করতে গেলে সঠিক পদ্ধতি মেনে দমকল ও কলকাতা পুরসভার কাছ থেকে বিজেপিকে অনুমতি নিতে হবে। তার পরে আবেদন করতে হবে কলকাতা পুলিশের কাছে। তাঁর বক্তব্য, যে কোনও সভা নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে আইনগত ক্ষমতা রয়েছে কলকাতা পুলিশেরই। পাশাপাশি পুরসভা ও দমকল কর্তৃপক্ষকেও বিচারপতি নির্দেশ দেন, আইনগত পদ্ধতি মেনে ওই আবেদনপত্র বিবেচনা করতে হবে। অনুমতি দেওয়া হল কি না, তা জানাতে হবে ২৭ নভেম্বর। পুরসভা ও দমকলের সিদ্ধান্ত জেনে পুলিশ বিবেচনা করবে বিষয়টি। কলকাতা পুলিশ সূত্রের খবর, ওই সভার ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী কী কী নিয়ন্ত্রণ থাকবে, পুরসভা ও দমকল অনুমতি দিলে সেটা ঠিক করবে তারা।

তবে নাটক শুরু হয় বিচারপতির নির্দেশের পরে বিজেপি নেতৃত্ব পুরসভার কাছে অনুমতি চেয়ে নথিপত্র জমা দিতে গেলে। বিজেপির তরফে জানানো হয়েছে, আদালতের নির্দেশ মেনেই এ দিন পুরসভা এবং দমকলের কাছে কিছু তথ্য ও নথি পেশ করা হয়। দমকলে নথিপত্র জমা দিতে সমস্যা হয়নি। কিন্তু পুরসভায় গিয়ে বিজেপি নেতারা দেখেন উল্টো ছবি। তাঁদের অভিযোগ, দেখা যায়, পুর-আধিকারিকেরা কেউ হাজির নেই। অথচ ঘড়িতে তখন সাড়ে ৪টেও বাজেনি। অর্থাৎ, সময় হয়নি ছুটির। কিন্তু দফতর ছেড়ে চলে গিয়েছেন সকলে। তখন ফিসফাস শুরু হয়ে যায়, তা হলে কি বিজেপিকে অনুমতিপত্র দেওয়ার বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখতেই এই সরে পড়া?

পরে অবশ্য পুরসচিব বিজেপির নথিপত্র জমা নেন। কিন্তু তত ক্ষণে তৃণমূল পরিচালিত কলকাতা পুরসভার বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমতে শুরু করেছে রাহুল সিংহদের। এই সব কিছুর প্রেক্ষিতেই পরে বিজেপির রাজ্য সভাপতি রাহুলবাবুর হুঁশিয়ারি, তাঁদের ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে ওই সভা করায় শেষ মুহূর্তে কোনও বাধা এলে সরকার ও পুলিশকে ফল ভুগতে হবে! তাঁর আরও দাবি, হাইকোর্ট শুধু তাঁদের শর্তসাপেক্ষে ৩০ তারিখ ওই জায়গায় সভা করার অনুমতিই দেয়নি, সেই শর্তগুলি মানলে পুলিশ যাতে সভার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে, সেই নির্দেশও দিয়েছে। রাহুলবাবুর কথায়, “পুলিশ এবং সরকার স্বচ্ছ ভাবে সভা করতে দিলে দেবে। আর শেষ মুহূর্তে কোনও চালাকি করে সভা আটকানোর চেষ্টা করলে বিজেপির লক্ষ লক্ষ কার্যকর্তা ওখানেই পৌঁছবেন। তাতে যা সমস্যা হবে, তার জন্য দায়ী থাকবে পুলিশ এবং রাজ্য সরকার। এত বড় গণতন্ত্র হত্যার শেষ দেখে ছাড়ব!” এর পাশাপাশি বিজেপি নেতৃত্ব জানিয়েছেন, সভার অনুমতি না দিলে কলকাতা পুরসভা ও দমকলকে আদালতের নির্দেশ মেনে তার নির্দিষ্ট কারণ জানাতে হবে।

গোটা ঘটনাপ্রবাহ দেখে তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশও মেনে নিচ্ছেন, বিজেপিকে সাধারণ ভাবে সভা করার অনুমতি দিয়ে দিলে কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হতো না! পুলিশ-প্রশাসনকে দিয়ে নানা ভাবে সভা আটকাতে গিয়ে বরং হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হল বিজেপির-ই। এখন সভা হলেও বিজেপির জয়। আবার আদালত শেষ পর্যন্ত ওই জায়গায় সভার উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও নৈতিক জয় বিজেপির-ই!

প্রায় ২০ বছর ধরে ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে ওই জায়গায় ২১ জুলাই ‘শহিদ দিবসে’র সমাবেশ করে আসছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ বছর জুলাইয়ে মমতার সভার পরে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সিপিএম একই জায়গায় জনসভার অনুমতি চেয়েছিল কলকাতা পুলিশের কাছে। কিন্তু তখনও অনুমতি দেয়নি পুলিশ। তা নিয়ে এখনও আদালতে গিয়ে উঠতে পারেনি সিপিএম। শেষ পর্যন্ত মামলা গৃহীত হলে তার নিষ্পত্তি হতে হতে সভার দিন পেরিয়ে যাবে আশঙ্কা করেই সমাবেশ শহিদ মিনার ময়দানে সরিয়ে নিয়েছে তারা। বিজেপি অবশ্য গোড়া থেকেই প্রশাসনের উপরে চাপ সৃষ্টির পথে গিয়েছে। দলের সর্বভারতীয় সভাপতি অমিতের জনসভার জন্য পুলিশের কাছে আবেদন করেও সাড়া না পেয়ে তারা ১৮ নভেম্বর আদালতে যায়। বিজেপির দাবি, তার আগে তারা কলকাতা পুলিশের কাছে সভা করার অনুমতি চেয়ে ২২ জুলাই, ১৬ অক্টোবর ও ১০ নভেম্বর মোট তিনটি আবেদন করেছিল। আদালতের হস্তক্ষেপেই গত ২১ নভেম্বর সভাস্থল নিয়ে পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব। কিন্তু পুলিশের অনুমতির বিষয়টি ঝুলেই থাকছে দেখে আদালতের নির্দেশিকা মোতাবেক ফের বিচারপতি দেবাংশুবাবুর এজলাসে নতুন করে আবেদন করে বিজেপি। সেই মামলারই শুনানিতে এ দিন বিচারপতি জানিয়েছেন, বিজেপির আবেদন ঠিক পদ্ধতি মেনে হয়েছে কি না, সব খতিয়ে দেখে পুরসভা ও দমকলকে অনুমতির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতে হবে ২৭ তারিখ।

আদালতের নির্দেশ পেয়েই বিকেল সাড়ে ৪টে নাগাদ আবেদনপত্র জমা দিতে পুরসভায় পৌঁছে যান বিজেপির একাধিক কর্মকর্তা। কিন্তু তাঁদের জানিয়ে দেওয়া হয়, আবেদনপত্র জমা নেওয়ার সময় পেরিয়ে গিয়েছে। এর পর শুরু হয় টালবাহানা! মেয়র থেকে পুর কমিশনার, সব ঘরই তখন ফাঁকা। বিজেপির দফতর সচিব অলোককুমার গুহ রায় জানান, পুর কমিশনারের অফিস থেকে বলা হয়, ওই আবেদনপত্র পুরসচিবের কাছে জমা দিতে। বিজেপি নেতাদের কথায়, পুরসচিবের কাছে গেলে তিনি আদালতের নির্দেশ সংক্রান্ত চিঠি দেখতে চান। তা না দেখাতে পারলে ওই আবেদনপত্র নেওয়া যে তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, তা-ও জানিয়ে দেন তিনি। নিদেনপক্ষে আইনজীবীর মাধ্যমে ওই আবেদনপত্র জমা দেওয়ার কথা জানানো হয় তাঁদের।

কী ছিল ওই আবেদনপত্রে? বিজেপি নেতারা জানাচ্ছেন, মঞ্চের আকার কেমন হবে এবং কত লোক ওই জমায়েতে হাজির হতে পারেন, তার হিসেব দেওয়া ছিল তাতে। পুরসচিবের কথা শুনে বিজেপি নেতারা এক আইনজীবীকে ডেকে পাঠান। উকিল আসতে বেশ কিছুটা সময় নেন। ততক্ষণে পাছে ওই নেতারা আবেদনপত্র নিয়ে মেয়রের ঘরে ঢুকে পড়েন, সেই আতঙ্কে হঠাৎই মেয়রের ঘরের দরজায় তালা পড়ে যায়! সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ বিজেপির পক্ষে আইনজীবী পাথর্র্ ঘোষ এলে তাঁকে নিয়ে ফের পুরসচিবের ঘরে ঢোকেন তাঁরা। মিনিট দশেক পরে বেরিয়ে অলোকবাবু জানান, পুরসচিব তাঁদের আবেদনপত্র গ্রহণ করেছেন। যদিও তাঁর দাবি, “আবেদনপত্র নেওয়ার জন্য পুর কর্তৃপক্ষ যে নাটক করলেন, তা দেখেই বোঝা যায় ওঁরা চাপে আছেন! বিজেপি’র একটা সভাস্থলের জন্য আবেদনপত্র নিতেও তৃণমূল বোর্ডের এত ভয় কেন, বুঝতে পারছি না!” তিনি জানান, আদালতের নির্দেশে দমকল দফতর আবেদনপত্র নিতে কিন্তু এত নাটক করেনি!

বিজেপি নেতারা চলে যেতেই পুরসভায় গিয়ে বিষয়টি নিয়ে পুরসচিবের সঙ্গে এক প্রস্ত আলোচনা করেন পুর কমিশনার খলিল আহমেদ। যদিও পুরসভা সূত্রের খবর, বর্তমান পুরবোর্ড চায় না ওই জায়গায় বিজেপি সভা করুক। তাই পুরসভা অনুমতি দেবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গিয়েছে। তৃণমূল সূত্রের খবর, তাদের ২১ জুলাইয়ের সময় অবশ্য এত কাঠখড় পোড়াতে হয় না!

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE