বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারের সদস্যকে দলে টানল রাজ্য বিজেপি। তা-ও আবার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপস্থিতিতে। দেশের পরিবেশ ও বনমন্ত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন সামলানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ভূপেন্দ্র যাদব দলের পতাকা তুলে দিলেন বঙ্কিমের পরিবারের সদস্য সুমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে। নরেন্দ্র মোদীর ‘বঙ্কিমদা’ সম্বোধন তৃণমূলের হাতে যে ‘অস্ত্র’ তুলে দিয়েছিল, সুমিত্রের বিজেপিতে যোগদান তাকে ‘ভোঁতা’ করল বলেই বিজেপির একাংশের দাবি। তবে প্রত্যাশিত ভাবেই তেমন কোনও লক্ষ্য নিয়ে সুমিত্রকে বিজেপিতে শামিল করার কথা আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকার করছে না বিজেপি।
গত কয়েক মাসে হাতেগোনা কয়েকজনকে দলের রাজ্য দফতরে এসে বিজেপিতে শামিল হওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মূলত রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতিতেই তাঁরা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের সে সব কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। কিন্তু বঙ্কিমের পরিবারের সদস্যকে শামিল করানোর ক্ষেত্রে ছবি বদলে গিয়েছে। যা তাৎপর্যপূর্ণ। রাজ্যসভা নির্বাচনের প্রার্থী বাছাই এবং ভোট সংক্রান্ত বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের মধ্যেই কিছুক্ষণের জন্য দলীয় দফতরে ফেরেন ভূপেন্দ্র এবং শমীক। উত্তরীয় পরিয়ে এবং পদ্মপতাকা ধরিয়ে দলে আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বাগত জানান সুমিত্রকে। তার পরে আবার ফিরে যান জাতীয় গ্রন্থাগারে ‘জরুরি এবং রুদ্ধদ্বার’ বৈঠকে।
বিজেপি সূত্রের ব্যাখ্যা, বঙ্কিমের পরিবারের সদস্যকে বিজেপিতে কতটা গুরুত্ব দিয়ে স্বাগত জানানো হয়েছে, তা ভূপেন্দ্রের উপস্থিতিতেই স্পষ্ট। দলের জরুরি বৈঠক চলাকালীন শুধুমাত্র সুমিত্রকে দলে স্বাগত জানানোর জন্য ভূপেন্দ্র এবং শমীক যে ভাবে দলীয় কার্যালয়ে ফিরলেন, তা থেকেও বোঝা যাচ্ছে, বিজেপি-র কাছে এই যোগদানের ‘তাৎপর্য’ কতটা।
আরও পড়ুন:
সুমিত্রকে দলে স্বাগত জানাতে গিয়ে ভূপেন্দ্র প্রথমেই ‘বন্দে মাতরম’ গান এবং বঙ্কিমচন্দ্রের মাহাত্ম্য সম্পর্কে বলেন। তার পরে বলেন, ‘‘ভারতীয়ত্বের আদর্শ ও সংস্কৃতি পাথেয় করে সেই ঋষিবর বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিবার থেকে তিনি এসেছেন প্রধানমন্ত্রীর নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে উন্নত পশ্চিমবঙ্গ বানানোর লক্ষ্যে পা বাড়াতে। আমি তাঁকে হৃদয় থেকে স্বাগত জানাচ্ছি।’’ কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কথায়, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের বিদ্বজ্জন বর্গের লোকজন, পশ্চিমবঙ্গের মাটি এবং সংস্কৃতির সঙ্গে জুড়ে থাকা লোকজন, যাঁরা উন্নত পশ্চিমবঙ্গের স্বপ্ন দেখছেন, এই যোগদান তাঁদের প্রেরণা জোগাবে, শক্তি জোগাবে।’’
বঙ্কিমচন্দ্র রচিত ‘বন্দে মাতরম’ গানের ১৫০ বছর সংক্রান্ত আলোচনায় লোকসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে ‘বঙ্কিমদা’ সম্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় সে সম্বোধনে আপত্তি জানানোয় মোদী ভুল শুধরে নেন। সৌগতের পরামর্শ মতো ‘বঙ্কিমবাবু’ সম্বোধন শুরু করেন। বিজেপি ব্যাখ্যা দেওয়া শুরু করে যে, ‘দাদা’ সম্বোধনে ‘অসম্মানসূচক’ কিছু নেই বা অবাঙালিরা বাঙালিদের ক্ষেত্রে ‘দাদা’ সম্বোধন ‘সম্মানসূচক’ ভাবেই করেন ইত্যাদি। কিন্তু তৃণমূলের তীব্র কটাক্ষের মুখে বিজেপি-র সে রক্ষণ খুব মজবুত ছিল না। ক্ষতে প্রলেপ দেওয়া বিজেপির পক্ষে কঠিন হচ্ছিল। এ বার বঙ্কিমের পরিবারের এক সদস্যকে দলে টেনে তৃণমূলের আক্রমণের ধারকে বিজেপি ভোঁতা করে দিতে চাইল বলে অনেকে মনে করছেন।
বঙ্কিমের বংশধর সুমিত্রের পরিচয় দিতে গিয়ে শমীক বলেন, ‘‘বঙ্কিমচন্দ্র নিজের যে ভাইয়ের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছেন, সেই পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পঞ্চম প্রজন্ম সুমিত্র চট্টোপাধ্যায়।’’ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শ্রম দফতরে সুমিত্র উচ্চপদস্থ আমলা ছিলেন বলেও শমীক জানান। সুমিত্র বিজেপিতে নিজের যোগদানের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শ্রম দফতরে নিজের কাজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘‘এই সরকার আসার পরে হঠাৎ নির্দেশ জারি করে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের প্রত্যেকটা কার্ডকে কাটাই করিয়ে কিলো দরে বিক্রি করা হয়েছিল। যে সব আলমারিতে কার্ডগুলি থাকত, সেগুলিকেও কিলো দরে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। সে টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়েছিল। তার পরে শুরু হয়েছিল এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্ক। সেখানে ৪০ লক্ষ ছেলেমেয়ে নাম লিখিয়েছিলেন।’’ তাঁর দাবি, ‘‘যুবশ্রী বলে একটা প্রকল্প চালু হয়েছিল। এখনও সেটা বন্ধ হয়নি। আবার এখন দেখছি যুবসাথী নামে একটা প্রকল্প চালু হয়েছে।’’ তাঁর আরও দাবি, ‘‘তখন যুবশ্রীর ক্ষেত্রে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ থেকে একটা নজরদারি রাখা হত। টাকাটা যাঁরা পাচ্ছেন, তাঁরা নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধির কাজে লাগাচ্ছেন কি না, সে বিষয়ে খোঁজখবর রাখা হত। কিন্তু যুবসাথীর ক্ষেত্রে তা-ও নেই।’’ তাঁর কাছে থাকা সমস্ত পরিসংখ্যান বিজেপি-কে দিয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গে কর্মসংস্থানের সমস্যার সুরাহার লক্ষ্যে কাজ করতে চান বলে সুমিত্র জানান।