আচমকা হানা স্বাস্থ্য ভবনের। তাতেই উঠে এল রক্ত সংক্রান্ত দুর্নীতি। মূল্যবান উপহারের টোপ দিয়ে দাতা জোগাড়, রক্তদান শিবিরে চিকিৎসক, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট না থাকার মতো অনিয়ম ধরা পড়ল। আবার, একটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কে হানা দিয়ে আধিকারিকেরা দেখলেন, শিবিরের জন্য একটি ক্লাবকে দেওয়া হয়েছে সাড়ে চার লক্ষ টাকা! রেজিস্টারে নথিভুক্ত নেই দাতা বা সংগৃহীত রক্তের কোনও তথ্যই!
রক্তদান শিবিরের নামে এক শ্রেণির বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের অনৈতিক ব্যবসার বিষয়টি দীর্ঘ দিন ধরেই স্বাস্থ্য ভবনের নজরে ছিল। দু’টি অভিযোগের ভিত্তিতে রবিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুরের একটি রক্তদান শিবিরে এবং সোনারপুরের একটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কে আচমকা হানা দিলেন স্বাস্থ্য দফতরের রক্ত সুরক্ষা বিভাগের যুগ্ম অধিকর্তা-সহ তিন আধিকারিক। তাঁদের সঙ্গে থেকে দেখা গেল, কী ভাবে রক্তদান নিয়ে অসাধু চক্র মাথা চাড়া দিচ্ছে।
মথুরাপুর থানার কাছেই উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরে রক্তদান শিবিরের আয়োজন করেছিল স্থানীয় ক্লাব। শিবিরে ঢোকার মুখেই হাতে, কাঁধে বয়ে পাখা নিয়ে বেরোতে দেখে তাঁদের জিজ্ঞাসা করেন আধিকারিকেরা। জানা যায়, পরিবারের এক জন রক্তদান করলে টেবিল পাখা, দু’জন রক্ত দিলে স্ট্যান্ড পাখা এবং তিন জনের ক্ষেত্রে এয়ার কুলার উপহার মিলছে। রক্তদানের পরে তাই চড়া রোদে কুপন হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে রক্তদাতারাও।
শিবিরে রক্ত সংগ্রহ করতে আসা ল্যান্সডাউন পদ্মপুকুরের এক বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের মেডিক্যাল অফিসারেরা স্বাস্থ্য আধিকারিকদের দেখেই কার্যত পালান। জানা যায়, তিন চিকিৎসকই আদতে হোমিয়োপ্যাথির ইন্টার্ন। উপস্থিত মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের অধিকাংশের রক্ত সংগ্রহের প্রশিক্ষণই নেই। এক জন শুধু কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে কর্মরত। আধিকারিকেরা জানাচ্ছেন, কতটা ইউনিট রক্ত সংগ্রহ হচ্ছে, মাপার যন্ত্রও ছিল না। রক্তদানের পরে কেউ অসুস্থ হলে, সামাল দিতে নার্সও ছিল না। রক্তদাতার সঙ্গে কথা বলে যে স্ক্রিনিং ফর্ম পূরণ করতে হয়, তাও যথাযথ হচ্ছে না জানান আধিকারিকেরা।
ওই শিবিরে ২৫০ দাতার লক্ষ্য ছিল। স্কুলে ডাঁই করে রাখা ছিল পাখা। সব ক্যামেরাবন্দি করেন স্বাস্থ্য আধিকারিকেরা। তাঁরা থানায় অভিযোগ করলে বন্ধ করা হয় শিবির। তত ক্ষণে অবশ্য ১৩০ জন রক্তদান করেছেন। বেসরকারি সংস্থার কর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেও সদুত্তর মেলেনি বলে জানান আধিকারিকেরা। আয়োজক ক্লাবের সম্পাদক প্রীতম পুরকাইতের যুক্তি, ‘‘উপহার না দেওয়ার নিয়ম জানতাম না। রক্ত সংগ্রহকারী বেসরকারি সংস্থা যে নিয়ম মানছে না, বুঝতে পারিনি।’’
পরে সোনারপুরের এক কো-অপারেটিভ সোসাইটি পরিচালিত ব্লাড ব্যাঙ্কে হানা দেন ওই আধিকারিকেরা। ২৫ মে জয়নগর-মজিলপুরে একটি ক্লাব আয়োজিত শিবির থেকে ৩৭৫ ইউনিট রক্ত সংগ্রহ করেছিল ওই ব্লাড ব্যাঙ্ক। সেখানেও দেওয়া হয়েছিল পাখা। ব্লাড ব্যাঙ্কে গিয়ে ২৫ মে-র নথি চান আধিকারিকেরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, গত ফেব্রুয়ারি থেকে যত শিবির থেকে রক্ত সংগ্রহ হয়েছে, তার কোনও কিছুই নথিভুক্ত নেই। রেজিস্টারে শুধু দাতার সই বা টিপ ছাপ রয়েছে। বাকি দাতা ও ব্লাড ব্যাগ সংক্রান্ত তথ্য নেই।
আধিকারিকেরা জানাচ্ছেন, ৩৭৫ ইউনিট রক্তের মধ্যে ৯ ইউনিট রোগীদের দেওয়া হয়েছে, আরও ৯ ইউনিট পজ়িটিভ-রিঅ্যাক্টিভ আসায় বাতিল হয়েছে। অর্থাৎ, সেগুলিতে কোনও ভাইরাস মিলেছিল। আরও ৭৯ ইউনিট একটি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে ব্লাড ব্যাঙ্কের কর্মীরা দাবি করলেও সেই সংক্রান্ত নথি দেখাতে পারেননি বলে অভিযোগ। শুধু পাখা কিনতে ক্লাবকে প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষ টাকা দিয়েছিল ব্লাড ব্যাঙ্ক। সমস্ত নথি বাজেয়াপ্ত করেছে স্বাস্থ্য ভবন।
যুগ্ম-অধিকর্তা বিজয়প্রসাদ মুখোপাধ্যায় জানান, সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে বিনামূল্যে ৭৭.২% রোগী রক্ত পান। বেসরকারিতে রক্ত কেনেন ২২.২%। তিনি বলেন, ‘‘তা-ও দেখা যাচ্ছে, যত শিবির হচ্ছে, তার অন্তত ৪৮ শতাংশ রক্ত পাচ্ছে বেসরকারি সংস্থা। এর নেপথ্যে প্রলোভন। কোথাও নিয়ম মানা হচ্ছে না। দুর্নীতির চক্র ভাঙতেই এই অভিযান।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)