Advertisement
E-Paper

আপনারা তো দেখছি খবরই রাখেন না: কেন্দ্রীয় আধিকারিক

প্রশ্ন: ক’টা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আছে জেলায়? উত্তরে এ-ওর মুখের দিকে তাকালেন সরকারি আধিকারিকেরা।

অরুণাক্ষ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০১ ডিসেম্বর ২০১৬ ০৪:১৭
রূপা কপূর। — নিজস্ব চিত্র।

রূপা কপূর। — নিজস্ব চিত্র।

প্রশ্ন: ক’টা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আছে জেলায়?

উত্তরে এ-ওর মুখের দিকে তাকালেন সরকারি আধিকারিকেরা।

প্রশ্ন: কতগুলো ট্রাস্ট, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সম্প্রতি অনুমোদন চেয়ে আবেদন জানিয়েছে?

টেবিলের উল্টো দিকে কর্তাদের চোখে ফাঁকা দৃষ্টি।

প্রশ্ন: আপনারা বলছেন, জেলায় নার্সিংহোমের সংখ্যা ৪৪৭টি। সেখানে প্রতিদিন কত শিশু জন্মায়, কত জনের মৃত্যু হয়, তার হিসেব আছে কিছু?

উত্তর: না মানে...আচ্ছা দেখছি...।

পঞ্চাশ মিনিট ধরে এমন নানা প্রশ্নবাণে বেআব্রু হয়ে গেল উত্তর ২৪ পরগনায় শিশু-সুরক্ষার বেহাল চিত্র।

প্রশ্নকর্তার আসনে ছিলেন ‘ন্যাশনাল কমিশন ফর প্রোটেকশন অব চাইল্ড রাইটস’ বা জাতীয় শিশু অধিকার রক্ষা আয়োগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রূপা কপূর। যাঁর সামনে নাজেহাল হতে হল উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসক অন্তরা আচার্য, মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক প্রলয় আচার্য, শিশু ও সমাজকল্যাণ দফতরের আধিকারিক-সহ হোমরাচোমরা কর্তাব্যক্তিদের।

জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানাচ্ছে, দৃশ্যতই বিরক্ত রূপাদেবী হতাশ গলায় বলেন, ‘‘আমি শুনেছি, বহু শিশুকে মৃত বলে দেখানো হয়েছিল বাবা-মায়েদের। ময়না-তদন্তের ব্যবস্থাটা যদি অন্তত ঠিকঠাক থাকত, তা হলে অনেক আগেই জালিয়াতি চোখে পড়ত।’’ এর পর আধিকারিকদের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘‘তা-ও দেখছি আপনাদের টনক নড়েনি। বৈঠকে এসেছেন কোনও তথ্য হাতে না নিয়েই।’’

পরোক্ষে প্রশাসনের গাফিলতির দিকে ইঙ্গিত করেই এ দিনই শিশু পাচার নিয়ে বেশ কয়েকটি টুইট করেছেন কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী মানেক গাঁধীও। তিনিও লিখেছেন, খবরে পূর্বাশা হোম থেকে দশটি শিশুকন্যা উদ্ধারের কথা জেনে তিনি রাজ্যের শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনকে (ডব্লুবিসিপিসিআর) বলেছিলেন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে। পাশাপাশি রূপাও পাচার কাণ্ড নিয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে পনেরো দিনের মধ্যে রিপোর্ট তলব করেছেন। জেলাশাসক পরে বলেন, ‘‘যা যা চেয়েছিলেন, সব রিপোর্টই ওঁর কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।’’ রূপা জেলা প্রশাসনকে বলে গিয়েছেন, ৩০ ডিসেম্বর ফের বৈঠক করবেন। তার আগে যেন সব তথ্য মজুত থাকে।

কী কী তথ্য? রূপা জানতে চেয়েছেন, জেলায় এই মুহূর্তে প্রসূতির সংখ্যা কত। কী ভাবে মিলবে এই তথ্য? প্রশ্নটা তুলে রূপা নিজে উত্তরও বাতলে দেন। কটাক্ষের সুরে প্রশ্ন করেন, ‘‘আশা-কর্মী বলে একটা পদ আছে, জানেন তো?’’ এ বার অনেকেই উত্তর দেন, ‘‘হ্যাঁ হ্যাঁ ম্যাডাম।’’ রূপাদেবী বলেন, ‘‘বেশ, তা হলে তাদের কাজে লাগান। গ্রামে গ্রামে মহিলাদের বোঝাতে বলুন, সরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের সমস্ত খরচ বহন করে সরকার।’’ নার্সিংহোমেও দরিদ্র পরিবারের মহিলাদের জন্য প্রসবের খরচ লাগে না। সে সম্পর্কেও গ্রামের মহিলাদের সচেতন করতে বলেন রূপা। শুধু তাই নয়। বাচ্চার দু’বছর বয়স পর্যন্ত তারা কেমন আছে, সেই খবরও যেন থাকে সংশ্লিষ্ট দফতরের হাতে। এই কাজে পুলিশ, চাইল্ড লাইন, ইনটিগ্রেটেড চাইল্ড প্রোটেকশন সার্ভিসেসের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, সমস্ত নার্সিংহোমে যেন নোটিস দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়, শিশু পাচারের সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হবে।

বারাসতে জেলাশাসকের অফিসে বৈঠকের পরে রূপা যান মছলন্দপুরের সুজিত দত্ত মেমোরিয়াল ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টে। ভিতরে ঢুকতে গিয়ে থমকে যান গিয়ে মোবাইল বের করে ছবি তোলেন। কী দেখছেন ম্যাডাম? নিচু গলায় প্রশ্ন করেছিলেন এক পুলিশ কর্মী। কালো কাচে ঘেরা ট্রাস্টের ভবনের দিকে ইঙ্গিত করে রূপা
বলেন, ‘‘কেন একটা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের অফিস কালো কাচে ঘেরা হবে, এ নিয়ে কারও মনে কোনও প্রশ্ন উঠল না?’’

যে জমিতে পোঁতা হয়েছিল শিশুর দেহ, সেটাও ঘুরে দেখেন রূপা। কথা বলেন গ্রামের লোকের সঙ্গে। এর পরে যান বাদুড়িয়ার সোহান নার্সিংহোমে। মঙ্গলবার রাতের দিকে ঠাকুরপুকুরের ‘পূর্বাশা’ হোমেও গিয়েছিলেন। উত্তর ২৪ পরগনা জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র
জানাচ্ছে, পূর্বাশার হাল দেখে অসন্তোষ গোপন রাখেননি রূপাদেবী। নিজের চোখেই দেখে এসেছেন, মেয়াদ উত্তীর্ণ বেবিফুড দেওয়া হতো শিশুদের।

central official child trafficking district administration
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy