×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৩ মে ২০২১ ই-পেপার

দিল্লির দখলে খাগড়াগড়

রাজ্যের আপত্তি উড়িয়ে দায়িত্ব এনআইএ-কে

নিজস্ব সংবাদদাতা
নয়াদিল্লি ও কলকাতা ১০ অক্টোবর ২০১৪ ০৩:২০
খাগড়াগড়ের সেই বাড়িতে সিআইডি দল। বৃহস্পতিবার।—নিজস্ব চিত্র।

খাগড়াগড়ের সেই বাড়িতে সিআইডি দল। বৃহস্পতিবার।—নিজস্ব চিত্র।

রাজ্য সরকারের অনিচ্ছা সত্ত্বেও বর্ধমান বিস্ফোরণের তদন্তভার জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার (এনআইএ) হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ এখন ভোটের প্রচারে দিল্লির বাইরে। আগামিকাল তাঁর ফেরার কথা। তার পরেই আনুষ্ঠানিক ভাবে তদন্তের দায়িত্ব এনআইএ-র হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে বলে মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে। ফলে সারদা মামলার পর এ বার বর্ধমানের ঘটনাতেও কেন্দ্রীয় তদন্ত নিয়ে রাজ্য সরকারের আপত্তি ধোপে টিকল না।

সারদা কেলেঙ্কারিতে প্রথম থেকেই সিবিআই তদন্তে আপত্তি জানিয়ে আসছিল রাজ্য সরকার। বলা হচ্ছিল, রাজ্য পুলিশ এই তদন্ত করতে সক্ষম। শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ওই তদন্ত হাতে নিয়েছে সিবিআই। বর্ধমান কাণ্ডেও এনআইএ-কে দিয়ে তদন্ত করানোর বিরোধিতা করে আসছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। এবং বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা না-করেই এনআইএ-র সিদ্ধান্ত ঘোষণা হয়ে যাওয়ায় রীতিমতো অসন্তুষ্ট শাসক দল। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য, এটি একান্ত ভাবেই নরেন্দ্র মোদী তথা বিজেপির তরফে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এর আগে কখনও রাজ্যকে না জানিয়ে এনআইএ-কে কাজে লাগানো হয়নি। কারণ, আইনশৃঙ্খলা রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত বিষয়। তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় আঘাত করল। এনআইএ-র তদন্তের ব্যাপারে আমলা স্তরে কোনও আলোচনা যদি হয়েও থাকে, সেটা শেষ কথা হতে পারে না দাবি করে তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কেন্দ্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কথা বলা জরুরি ছিল।

Advertisement

কিন্তু বিরোধীরা বারবারই বলছিলেন, বর্ধমান বিস্ফোরণ কোনও মামুলি আইনশৃঙ্খলাজনিত ঘটনা নয়। রাজ্যের বাইরে দেশ, দেশের বাইরে বিদেশ পর্যন্ত এর জাল ছড়ানো রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। এনআইএ-কে তদন্তভার দেওয়ার ক্ষেত্রে এই যুক্তিগুলো যেমন কাজ করেছে, তেমনই কেন্দ্রের তরফে রাজ্য পুলিশের ব্যর্থতা ও গাফিলতির দিকটিও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে।

সার্বিক ভাবে বর্ধমান বিস্ফোরণকে কেন্দ্র করে রাজ্যের ভূমিকায় মোদী সরকার বেশ ক্ষুব্ধ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বক্তব্য, প্রথম থেকেই বিষয়টিকে হাল্কা ভাবে নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন। ঘটনার পরেই রাজ্যকে বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিল মন্ত্রক। দু’দিন আগে রাজ্য পুলিশের ডিজি জি এম পি রেড্ডি দাবি করেছিলেন, বর্ধমান নিয়ে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট কেন্দ্রকে পাঠাচ্ছে রাজ্য। কিন্তু দু’দিন পরেও সেই রিপোর্ট মন্ত্রকের কাছে জমা পড়েনি। কবে রিপোর্ট আসবে, আর এলেও তাতে বিশদ তথ্য কতটা কী থাকবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দিহান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কর্তারা।

যদিও তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব প্রশ্ন তুলছেন, সীমান্ত-নজরদারি রাজ্যের বিষয় নয়। সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বাহিনীও ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না বলে তাঁদের দাবি।

অন্য দিকে কেন্দ্রের পর্যবেক্ষণ, প্রথম থেকেই তদন্ত নিরপেক্ষ পথে হয়নি। বরং তদন্তের অভিমুখ ঘোরানোর জন্য রাজনৈতিক চাপ ছিল। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রকের কাছে যে অভ্যন্তরীণ রিপোর্ট জমা পড়েছে,

তাতে বর্ধমান থানা তথা রাজ্য পুলিশ কী ভাবে গোটা ঘটনাটিকে ছোট্ট ঘটনা বলে চালাতে চেষ্টা করেছিল সে বিষয়ে সবিস্তার জানানো হয়। বিষয়টি চেপে দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক চাপ রয়েছে বলেও রিপোর্টে প্রকাশ। মন্ত্রকের বক্তব্য, ঘটনাটির সঙ্গে যে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জড়িয়ে রয়েছে, সেটাই বুঝতে চাইছে না রাজ্য প্রশাসন। মন্ত্রকের এক কর্তার কথায়, “হয় শাসক দলের চাপে ঘটনাটি লঘু করার চেষ্টা করেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। অথবা তারা প্রথমে বুঝতেই পারেনি ঘটনার গুরুত্ব কতখানি।”

সব দিক বিচার করেই তাই আজ এনআইএ-র হাতে তদন্তভার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রক। এই সিদ্ধান্তের কথা জানার আগেই রাজ্যের মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় এ দিন বলছিলেন, “আমরা এনআইএ-র বিরোধিতা করছি না। আমাদের প্রশাসনের উপরে আস্থা রাখছি।” সেই সঙ্গেই তাঁর বক্তব্য ছিল, “এনআইএ চাইলে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবেই তদন্তের ভার নিতে পারে, আইনে সেই সংস্থান আছে।” কারণ ইতিমধ্যেই ধৃতদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ (আনলফুল অ্যাক্টিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট) আইনে মামলা দায়ের করেছে রাজ্য।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকও বস্তুত এই মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিল। মন্ত্রকের একাংশের ব্যাখ্যা, আগ বাড়িয়ে তদন্তের দায়িত্ব এনআইএ-র হাতে তুলে দিলে রাজনৈতিক তরজার পথ আরও প্রশস্ত হতো। রাজ্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের চক্রান্ত বলে সুর চড়াত শাসক দল। কিন্তু সিআইডি ইউএপিএ-তে মামলা রুজু করার পরে আর সে সমস্যা থাকল না বলেই মনে করছে মন্ত্রক। প্রাথমিক ভাবে ঠিক ছিল, রাজনাথ সিংহ প্রচারের কাজে ব্যস্ত থাকায় আগামী সপ্তাহে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। রাজনাথ নিজে কেন্দ্র-রাজ্য বিরোধের রাজনীতিকে কিছুটা এড়াতেও চাইছিলেন। বলেছিলেন, “সন্ত্রাস হল সন্ত্রাস। তা নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের রাজনীতি করা উচিত নয়। কেন্দ্র তদন্তে সব রকম সাহায্য করতে প্রস্তুত।” কিন্তু রাজ্য পুলিশের ‘ব্যর্থতা’ই কেন্দ্রকে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে দিল না বলে মন্ত্রকের কর্তাদের দাবি। বিরোধীরা বারবারই অভিযোগ করছিলেন, তদন্ত প্রভাবিত করছে শাসক দল। তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করছে পুলিশ। এই অবস্থায় আজ সন্ধ্যায় মন্ত্রকের শীর্ষ কর্তাদের বৈঠকে ঠিক হয়, যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনে কাল থেকেই তদন্ত শুরু করবে এনআইএ। কারণ, ঘটনার পরে সাত দিন এখনই কেটে গিয়েছে। আরও দেরি হলে তদন্ত কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে।

রাতে অবশ্য পার্থবাবুর সঙ্গে ফের যোগাযোগের চেষ্টা করে লাভ হয়নি। তবে কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করেছে বিরোধী সব দলই। সিপিএম সাংসদ মহম্মদ সেলিম এনআইএ-র সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “এ রাজ্যে ধর্ষণ থেকে বিস্ফোরণ সব কিছুই ছোট্ট ঘটনা বলে চালানো হয়। বর্ধমান বিস্ফোরণের মতো সুদূরপ্রসারী সন্ত্রাসের নেটওয়ার্কের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে যে দক্ষতা প্রয়োজন, সেটা এনআইএ-রই আছে।” মন্ত্রক সূত্রে খবর, পরবর্তী পদক্ষেপে বিস্ফোরণস্থল ঘুরে নমুনা সংগ্রহ, যারা বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয় করেছিল তাদের সঙ্গেও কথা বলবে এনআইএ। সিআইডির হেফাজতে থাকা ধৃতদের নিজের হেফাজতেও নেবে বলে খবর।

Advertisement