শিক্ষকদের ভাতা বন্ধ ২৫ মাস। ছাত্রছাত্রীদের ভাতা মেলে না ৩৬ মাস। আর স্কুল বন্ধ আট মাস। অতি-সংক্ষেপে এটাই মুর্শিদাবাদের শিশু শ্রমিক স্কুলগুলির হাল-হকিকত!
প্রতিকার চেয়ে বহুবার জেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন শিক্ষকেরা। ফল হয়নি। এই পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার সুতির সাজুর মোড়ে ঘণ্টাখানেক ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক অবরোধ করলেন শিশু শ্রমিক স্কুলের শতাধিক শিক্ষক-শিক্ষিকা। তাঁদের অভিযোগ, কেন্দ্রের নির্দেশের আট মাস পরও জেলায় বন্ধ হয়ে থাকা ১৪০টি শিশু শ্রমিক স্কুল চালুর কোনও উদ্যোগ নিচ্ছে না প্রশাসন। টনক নড়াতেই এই পদক্ষেপ।
ভোটের আগে এই কর্মসূচিতে তাঁরা পাশে পেয়েছে কংগ্রেসকে। কংগ্রেসও এ দিন পথে নামে। অবরোধের জেরে জাতীয় সড়কের দু’পাশে কয়েক’শো যানবাহন আটকে যায়। সংগঠনের জেলা সম্পাদক গোলাম নাসেরর হুঁশিয়ারি, স্কুলগুলি অবিলম্বে চালু না হলে এ বার দিনভর সড়ক অবরোধ করা হবে।
শিশুদের শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগানোর প্রবণতা রুখতে ১৯৮৮ সালে দেশজুড়ে ২৭০টি জেলায় এই প্রকল্প চালু করা হয়। বর্তমানে যে ১১৫টি জেলায় এই প্রকল্প চালু রয়েছে। মুর্শিদাবাদের ১৪০টি শিশু শ্রমিক স্কুলের সবগুলি বিড়ি শ্রমিক অধ্যুষিত জঙ্গিপুর মহকুমার বিভিন্ন ব্লকে। গোলাম নাসের জানান, বিড়ি শ্রমিক পরিবারের ছেলেমেয়েদের সুবিধে মতো সময়ে শিক্ষার জন্য স্কুলগুলি তৈরি হয়। প্রতিটি স্কুলে ৫০ জন করে ছাত্রছাত্রী ভর্তি হয়। চতুর্থ শ্রেণি পাশের পর তাদের এলাকার হাইস্কুলে ভর্তি করানোই লক্ষ্য। স্কুল প্রতি দুই বা তিন জন করে শিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের মাসিক চার হাজার টাকা ভাতা দেয় কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রক। সরাসরি সেই টাকা জেলা প্রশাসনের কাছে আসে।
সুতির চন্দ্রপাড়া শিশু শ্রমিক স্কুলের শিক্ষক সেরাজুল ইসলাম জানান, মিড ডে মিল ছাড়াও ছাত্রছাত্রীদের মাসিক ১৫০ টাকা করে বৃত্তির টাকা বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু গত ৩৬ মাস ধরে ছাত্রছাত্রীরা সে টাকা পায়নি। শিক্ষকেরা ভাতা পাননি গত ২৫ মাস! ফরাক্কার গোপালগঞ্জ শিশু শ্রমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক দাউদ হোসেনের অভিযোগ, ‘‘এ নিয়ে দিল্লিতে গিয়ে শ্রম মন্ত্রকের কর্তাদের সঙ্গে দেখা করেছি। তাঁরা জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসন এই স্কুলগুলির জন্য আর্থিক চাহিদা সময় মতো না জানানোয় টাকা সময়ে আসেনি। ২৭ অক্টোবর শ্রম মন্ত্রকের ডেপুটি সেক্রেটারি অনিতা ত্রিপাঠি জেলা প্রশাসনের কাছে আর্থিক চাহিদার পরিমাণ জানতে চেয়ে তিন পাতার ফর্ম-সহ চিঠি পাঠিয়েছেন। কিন্তু গত দু’মাসেও জেলা প্রশাসন তার উত্তর দেয়নি।’’
কেন? অতিরিক্ত জেলাশাসক সমনজিৎ সেনগুপ্ত বলেন, ‘‘প্রশাসনের তরফে গাফিলতি নেই। টাকা এলে ভাতা মেটানো হবে। আর্থিক চাহিদার অঙ্ক কষে হিসেবও পাঠানো হবে।’’ এত দিন তা হয়নি কেন, সে সদুত্তর দেননি তিনি। মুর্শিদাবাদে কংগ্রেস শক্তিশালী বলেই পরিকল্পিত ভাবে জেলা প্রশাসন গোটা বিষয়টি নিয়ে টালবাহানা করছে, অভিযোগ কংগ্রেসের।
এ দিকে, গত মে মাস থেকে ১৪০টি শিশু শ্রমিক বিদ্যালয়ের সবগুলিরই ঝাঁপ বন্ধ। সমীক্ষা করে বিড়ি শ্রমিক পরিবারের শিশু শ্রমিকদের চিহ্নিত করে এই স্কুলে ভর্তি করাতে হয়। এ বছর গত ২ জুলাই কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রকের শিশু শ্রমিক শাখার যুগ্ম সচিব ধীরাজকুমার জেলা প্রশাসনকে লিখিত ভাবে সমীক্ষা শুরুর নির্দেশ পাঠালেও জেলা প্রশাসন সেই সমীক্ষা শুরুর নির্দেশ এখনও স্কুলগুলিতে পাঠায়নি। ধুলিয়ান শহরের কৃষ্ণপুরপল্লির শিশু শ্রমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘‘ফলে বছর শেষ হয়েও ছাত্রের অভাবে স্কুল চালু করা যায়নি।’’