ছোট্ট রোহন বাবার কাছে জানতে চেয়েছিল, তার পাড়ার অনেক বন্ধুই কেন ছাই দিয়ে দাঁত মাজে। কেন ওরা তার মতো টুথব্রাশ ব্যবহার করে না।
সে দিন ছেলেকে উত্তর দিতে না পারলেও মনে মনে এর বিহিত করার কথা ভেবেছিলেন বীরভূমের কীর্ণাহারের ব্যবসায়ী তরুণ প্রামাণিক। কী ভাবে, তা মাথায় আসছিল না। ক’দিন পরে টিভি-তে ‘এমএলএ ফাটাকেষ্ট’ দেখতে দেখতেই আইডিয়াটা এল। রোহনের বন্ধু-সহ এলাকার পড়ুয়াদের হাতে তন্ময়বাবু তুলে দিলেন টুথপেস্ট, টুথব্রাশ, জিভছোলা, হাত ধোওয়ার সাবান ও শ্যাম্পু। এবং সঙ্গে একটি করে লক্ষ্মীর ভাঁড়! ওই ছবিতেও রাজ্য কোষাগারের ঘাটতি পূরণ করতে জনগণের সামনে লক্ষ্মীর ভাঁড় রেখেছিলেন সাত দিনের অর্থমন্ত্রী মিঠুন চক্রবর্তী।
মঙ্গলবার স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিনে স্থানীয় একটি অনুষ্ঠান ভবনে লাভপুর, নানুর ও লাগোয়া বর্ধমানের ১৮টি প্রাথমিক স্কুলের প্রায় ৫০০ খুদে পড়ুয়ার হাতে তুলে দেওয়া হল ওই সামগ্রী। যা হাতে পেয়ে খুশিতে ডগমগ কচিকাঁচারা। কিন্তু, স্বাস্থ্য সচেতনতায় মাজন-ব্রাশের সঙ্গে লক্ষ্মীর ভাঁড়ের যোগটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলেন না উপস্থিত অভিভাবক ও শিক্ষকেরা।
তরুণ প্রামাণিক ছবি: সোমনাথ মুস্তাফি
খোলসা করলেন তেলকলের মালিক তরুণবাবুই। তাঁর ব্যাখ্যা, বহু দুঃস্থ পরিবার আজও মাজন-ব্রাশ কিংবা সাবান কেনাটা বিলাসিতার চোখেই দেখে। দাঁত মাজতে তারা ছাই, মাটি দিয়েই কাজ চালিয়ে দেন। আবার অনেক পরিবারে সাবানের বদলে মাটি দিয়েই হাত-মুখ ধোওয়ার চল। ‘‘ওই কুঅভ্যাস দূর করতেই এই পরিকল্পনা। মাসখানেকের মধ্যেই আমার দেওয়া মাজন-ব্রাশ শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু, পয়সা জমিয়ে যাতে ওই শিশুরা এই স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখে, তার জন্যই এই লক্ষ্মীর ভাঁড়। এতে ওদের মধ্যে গড়ে উঠবে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের অভ্যাসও।’’—বলছেন ওই ব্যবসায়ী। গত সেপ্টেম্বরেই বন্যা কবলিত এলাকার একাদশ শ্রেণির ৫০ জন পড়ুয়াকে পাঠ্যবই কিনে দিয়ে ফের পড়াশোনায় ফিরিয়েছিলেন তিনি।
কীর্ণাহারের এই বন্যাপ্রবণ এলাকায় প্রায় প্রতি বছরই পেটের রোগ দেখা দেয়। তরুণবাবুর এই উদ্যোগ তাই কিছুটা হলেও ধাক্কা দিয়েছে সুজন মণ্ডল, দীপু মাঝিদের মনে। ওই অভিভাবকেরা মানছেন, ‘‘বাপ-ঠাকুরদার আমল থেকেই ছাই-মাটি দিয়ে দাঁত মেজে আসছি। এ নিয়েও যে ভাবা দরকার, সত্যিই তা কখনও মনে হয়নি।’’ তাই এখন থেকে সময়ে সময়ে দু’চার পয়সা ছেলেমেয়েদের হাতে দিয়ে তাদের লক্ষ্মীর ভাঁড় ভরার কাজে হাত লাগানোর আশ্বাস দিয়েছেন তাঁরা! স্থানীয় কেমপুর ও পরোটা গ্রামের দুই প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক শেখ শাহনওয়াজ এবং রাজু সিংহের কথায়, ‘‘এ ভাবনা আমাদের মাথাতেই আসেনি। আমরাও দেখব পড়ুয়ারা যাতে ব্রাশ-পেস্ট দিয়ে দাঁত মাজার অভ্যাস বজায় রাখে।’’ এই অভ্যাস বজায় থাকলে দাঁত ও পেটের অসুখ থেকে পড়ুয়ারা অনেকটাই মুক্তি পাবে বলে জানালেন এ দিন সেখানে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাজির থাকা চিকিৎসক সনৎ সরকার এবং অশেষ খাঁ।
এই জেলারই খয়রাশোলে গত বছর রাখির দিনে বোনকে শৌচাগার ‘উপহার’ দিয়েছিলেন দাদা। তন্ময়বাবুও স্বাস্থ্য সচেতনতায় এক নতুন বার্তা দিলেন বলে মনে করছেন চিকিৎসকেরা। কলকাতার দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ কুশলনারায়ণ চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘এটা খুবই অভিনব পদক্ষেপ। আমরা নিজেরাও গ্রামের স্কুলে দাঁত রোগের সচেতনতায় শিবির করি। কিন্তু, প্রত্যন্ত এলাকায় সব সময় যাওয়া সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে ওই ব্যবসায়ী যা করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার।’’ তাঁর মতে, বাচ্চা বয়স থেকেই এই সচেতনতা গড়ে তোলা উচিত। এর সঙ্গে ব্রাশ করার সঠিক পদ্ধতিটাও কোনও ভাবে শিখিয়ে দিতে পারলে উদ্যোগ সম্পূর্ণ হবে। কারণ, সঠিক ব্রাশিং দাঁতের নানা রোগ থেকে মুক্তি দেয়। কুশলবাবু জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদে ছাই-মাটি দিয়ে দাঁত মাজার ফলে দাঁতের এনামেল ক্ষয়ে যায়। মাড়িতে ঘা-ও হতে পারে। একই সঙ্গে নানা ধরনের জীবাণুও পেটে গিয়ে বড় বিপদ ঘটাতে পারে। তাই, বাড়ির বাচ্চাদের এ বিষয়ে সচেতন করে তোলার প্রাথমিক কাজ করা উচিত অভিভাবকদেরই।
জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের কর্মী তথা চিকিৎসক পুণ্যব্রত গুণ বলছেন, ‘‘স্বাস্থ্যের সুঅভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শৌচাগারের ব্যবহার যেমন জরুরি, তেমন টুথপেস্টের ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ।’’ গ্রামাঞ্চলে ছাই বা মাটি দিয়ে দাঁত মাজার প্রবণতা শুধু মুখের স্বাস্থ্য নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে বলে তাঁরও অভিমত।
ছাই-মাটি ফেলে টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত মাজার সঙ্কল্পও করে ফেলেছে স্থানীয় কেমপুর প্রাথমিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র রাহুল হাজরা, কোমরপুর স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র আদিত্য মেটেরা।