১০ দিন আগে সিঙ্গুরে ‘টাটার মাঠে’র সভা থেকে শিল্প সংক্রান্ত কোনও সুনির্দিষ্ট বক্তব্য শোনা যায়নি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতায়। ১০ দিন পরে বুধবার সেই সিঙ্গুরে সভা করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জোড়া শিল্পের কথা বললেন। তার মধ্যে একটি হয়ে গিয়েছে। অন্যটি শীঘ্রই হবে।
রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে উপভোক্তার খতিয়ান দিতে দিতেই শিল্প-প্রসঙ্গে প্রবেশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রথমেই মমতা উল্লেখ করেন যে শিল্প হয়ে গিয়েছে তার কথা। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘৮ একর জমির উপর ৯ কোটি ২০ লক্ষ টাকা খরচ করে সিঙ্গুর অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়়ে তোলা হয়েছে। ২৮টি প্লটের মধ্যে বরাদ্দ হয়ে গিয়েছে ২৫টি। অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। কৃষিও চলবে, শিল্পও চলবে, কৃষিজমি দখল করে নয়।’’
এর পরেই কী হতে চলেছে, তার উল্লেখ করেন মমতা। বলেন, ‘‘আরেকটা প্রকল্প আমরা নিয়েছি। ৭৭ একর জমিতে প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ে তোলা হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। অ্যামাজন আর ফ্লিপকার্ট এখানে বড় ওয়্যারহাউস তৈরি করছে। যেটা আমরা ইতিমধ্যেই ক্লিয়ার (প্রশাসনিক ছাড়পত্র) করেছি। আমরা মুখে বলি না। আমরা কাজে করি।’’
আরও পড়ুন:
যদিও মমতা শিল্প সংক্রান্ত যে খতিয়ান দিয়েছেন, তা আদৌ ‘শিল্প’ কিনা সেই প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা। দু’দশক আগে সিঙ্গুরে যে ধরনের শিল্প নির্মাণ শুরু হয়েছিল, তার সঙ্গে মমতা বর্ণিত জোড়া শিল্পের তুলনা হয় কি না, সেই প্রশ্নও তোলা হচ্ছে। বিজেপি মুখপাত্র তরুণজ্যোতি তিওয়ারি বলেছেন, ‘‘এই ধরনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক হল বিশ্ববঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের মউ-এর মতো। স্বাক্ষরিত হওয়ার পরে মৌমাছি হয়ে উড়ে যায়। এখানেও তাই। এই ধরনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কগুলিতে কী উৎপাদন হচ্ছে, তার খতিয়ান দিন মুখ্যমন্ত্রী।’’ হুগলির সিপিএম নেতা ঐকতান দাশগুপ্ত বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর কাছে চপ-তেলেভাজা বিক্রিও শিল্প। আবার কাশফুলের বালিশ তৈরিও শিল্প। তাই তিনি আর এর চেয়ে বেশি কোন শিল্পের কথা বলবেন? তাঁর থেকে আশা করাটাই বাতুলতা। আমার ধারণা, তৃণমূলের কর্মীরাও এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করেন না।’’
এর বাইরে সিঙ্গুরে শিল্প সংক্রান্ত আর কোনও কথা বলেননি মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর ৪০ মিনিটের বক্তৃতার অধিকাংশ জুড়েই ছিল এসআইআর নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার, নির্বাচন কমিশন, মোদী এবং অমিত শাহের বিরুদ্ধে চোখা চোখা আক্রমণ। বিবাহিত মহিলাদর পদবি এবং ঠিকানা বদলের জন্য এসআইআরের শুনানিতে ডেকে হেনস্থা করার অভিযোগ আগেই তুলেছিলেন মমতা। মঙ্গলবার সিঙ্গুরের সরকারি সভামঞ্চ থেকে মোদী এবং শাহের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের স্ত্রীদের কি বিয়ের পরে পদবি বদল হয়নি? ঠিকানা বদল হয়নি? এই পুরো বিষয়টিকে ‘মহিলা-বিরোধী ষ়ড়যন্ত্র’ বলে তোপ দাগেন মমতা। ভোটের পরে ফের যে তাঁরাই সরকারে ফিরবেন, তা-ও জোরগলায় দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁকে জেলে ভরলে, গুলি করলেও তিনি যে ডরানোর নেত্রী নন, তা-ও স্পষ্ট করে দেন। মমতার কথায়, ‘‘আমি এমনিতে ঠান্ডা শীতল বাতাসের মতো বয়ে যাই। কিন্তু আমায় আঘাত করলে টর্নেডো, তুফান, কালবৈশাখী হয়ে যাই। আমায় রুখতে পারার সাধ্য কারও নেই।’’
সিঙ্গুরের কর্মসূচি থেকেই ২০ লক্ষ মানুষের অ্যাকাউন্টে আবাস যোজনার প্রথম কিস্তির টাকাও পাঠানো হয়েছে। এর আগের দফায় ১২ লক্ষ মানুষকে আবাস যোজনার অর্থ দিয়েছিল রাজ্য সরকার। অর্থাৎ, গত দেড় বছরে মো়ট ৩২ লক্ষ মানুষকে মাথায় ছাদ দিল রাজ্য সরকার। শাসকদলের আশা, বিধানসভা ভোটে যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। গড়ে প্রতিটি পরিবারে চার জন থাকলেও প্রায় দেড় কোটি মানুষকে ছোঁবে এই প্রকল্প।
আরও পড়ুন:
বুধবারই মমতার দিল্লি যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিমান দুর্ঘটনায় মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী অজিত পওয়ারের মৃত্যুর পরে তিনি রাজধানী সফর স্থগিত করেন। তবে খুব শীঘ্রই যে তিনি দিল্লি যাবেন, তা-ও স্পষ্ট করে দেন মমতা। সিঙ্গুরের মঞ্চ থেকে মমতা বলেন, ‘‘আজ না হলে কাল তো আমি দিল্লি যাবই। দরকারে কোর্টে আমিও যাব। আইনজীবী হয়ে নয়, সাধারাণ মানুষ হিসাবে। সব ডকুমেন্ট রেখে দিয়েছি। জ্যান্ত মানুষকে মৃত বানিয়ে দিচ্ছে! এত বড় স্পর্ধা!’’ দিল্লিতে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে মমতার দেখা করার কর্মসূচি রয়েছে। আগামী সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি তৃণমূলনেত্রীকে সময় দিয়েছেন জ্ঞানেশ। ইতিমধ্যেই রাজ্যের জেলাগুলি থেকে এসআইআরের কারণে মৃতদের পরিবারের সদস্যেরা দিল্লির উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার তাঁদের দিল্লিতে পৌঁছে যাওয়ার কথা।
বুধবার সিঙ্গুরের মঞ্চ থেকে বহু প্রতীক্ষিত ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানেরও উদ্বোধন করেন মমতা। উপস্থিত ছিলেন ঘাটালের তৃণমূল সাংসদ তথা অভিনেতা দেব। মমতা বলেন, ‘‘দেব আমাকে বার বার বলত। বন্যায় বার বার ঘাটালে ছুটে গিয়েছি। ডিভিসি-র জলে ভাসত। ১০ বছর ধরে কেন্দ্রকে চিঠি লিখেছি। ওরা দেয় শুধু ধোঁকা। ওদের বানিয়ে বোকা আমরা দিলাম টাকা।’’ মুখ্যমন্ত্রী জানান, ৫০০ কোটি টাকার কাজ ইতিমধ্যে হয়ে গিয়েছে। বাকি হাজার কোটি টাকার কাজ শেষ হবে শীঘ্রই। তিনি বলেন, ‘‘অনেকে বড় বড় কথা বলেন। রাখেন না। আমি মরে যাব, তা-ও ভাল। কিন্তু কথা রাখব ১০০ শতাংশ। আমি মা-মাটি-মানুষের সরকার। ডবল ইঞ্জিন সরকার নই।’’
মোদীর সভার ‘পাল্টা’ মমতার সভায় তৃণমূল সাংগঠনিক ভাবে বড় জমায়েতের প্রস্তুতি নিয়েছিল। সেখানে ভিড়ও হয়েছিল চোখে পড়ার মতো। যদিও বিরোধীদের দাবি, প্রশাসনিক স্তরে ‘চাপ’ তৈরি করে লোক নিয়ে গিয়ে ভিড় দেখানো হয়েছে। ওই জমায়েত ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ নয়। প্রসঙ্গত, মোদীর সভাস্থলে যেমন ভিড়ে বহু মানুষের হাতে জাতীয় পতাকা দেখা যায়, বুধবার সিঙ্গুরে মমতার সভাস্থলেও সে দৃশ্য দেখা গিয়েছে।