Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২২ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

সিট বিক্রির সিন্ডিকেট

ভূগোলে ৬৫০০০, ইংরেজি ১৬০০০, হাজার হাজার টাকা দিলেই মিলবে সিট!

নীলোৎপল বিশ্বাস
কলকাতা ৩০ জুন ২০১৮ ০৪:২৯
সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ইউনিয়ন রুমে মার্কশিট নিয়ে ব্যস্ততা। —নিজস্ব চিত্র।

সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ইউনিয়ন রুমে মার্কশিট নিয়ে ব্যস্ততা। —নিজস্ব চিত্র।

হাতে কয়েকটি মার্কশিটের প্রতিলিপি। বুধবার ইউনিয়ন রুম কাঁপাচ্ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ সান্ধ্য কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক রঞ্জিত রায়, ‘‘ভূগোল ৬৫ হাজার চলছে। সাংবাদিকতা ৩৫। ইংরেজি অনার্স ১৬ হাজারে হয়ে যাবে। যাঁদের চাই, এখনই বলুন। বেশি জায়গা ফাঁকা নেই কিন্তু!’’

টাকার বিনিময়ে ভর্তিতে ইচ্ছুক পড়ুয়াদের হাত থেকে মার্কশিট নিয়ে এর পর গভীর মনোযোগে দেখতে শুরু করলেন তিনি। মাঝেমধ্যে বললেন, ‘‘এটা খুব কম নম্বর। হবে না বোন। তোর জন্য কিন্তু ভূগোলে ৯০ হাজার লাগবে। নয়তো ক্ষমা কর।’’ অন্য আর এক ছাত্রকে বললেন, ‘‘তোর তো ভাল নম্বর রয়েছে, আগে এলি না কেন? দাঁড়া, দাদাকে বলে দেখছি।’’ ওই ছাত্রের অভিভাবক বলার চেষ্টা করলেন, সময়েই এসেছিলেন তাঁরা। কিন্তু কলেজে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পাত্তা না দিয়ে রঞ্জিত বললেন, ‘‘শুধু নম্বরে এখন কিছু হয় না। টাকা লাগে।’’

এর পর কয়েকটি মার্কশিট হাতে দোতলায় উঠে গেলেন রঞ্জিত। ফিরেও এলেন দ্রুত। অভিভাবকদের বললেন, ‘‘চিন্তার কিছু নেই। কাজ হয়ে যাবে। ক্যাশ সঙ্গে এনেছেন তো! কাজ হলেই ইউনিয়ন রুমে জমা দেবেন।’’

Advertisement

বুধবার দুপুরে ছাত্রের অভিভাবক হয়ে কথাও (সেই কথোপকথনের ভয়েস রেকর্ডিং রয়েছে) বলা হয়েছিল রঞ্জিতের সঙ্গে। ইংরেজি অনার্সে ভর্তি করাতে চাই বলায় তিনি জানালেন, ১৬ হাজার টাকা লাগবে। টাকা নেই বলায় তাঁর প্রতিক্রিয়া, ‘‘অকারণে সময় নষ্ট করাবেন না। বহু লোক অপেক্ষা করছেন।’’ তার পরেই আত্মীয়কে সান্ধ্য বিভাগে ভর্তি করানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘১২ হাজারে হয়ে যাবে। ভূগোল যাচ্ছে ৬৫ হাজারে, ইংরেজি অনার্সের জন্য লাগছে ৩৫ হাজার।’’ কিন্তু ভর্তি করাতে টাকা দিতে হবে কেন? রঞ্জিতের জবাব, ‘‘দাদা নিজেই তো ১৫ হাজার নেবে। এখন সুপারিশে ভর্তি করানো বন্ধ করে দিয়েছে দাদা।’’ দাদাটি কে? ছাত্রনেতা বললেন, ‘‘দাদা মানে দেবুদা।’’

এ দিন সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভাইয়েরাই দেখিয়ে দিলেন ‘দেবুদা’— তৃণমূল নেতা দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে। হাতে তাঁর কয়েক গোছা মার্কশিট। ছাত্র ভর্তিতে আপনি কেন? দেবাশিসবাবু বলেন, ‘‘ছেলে-মেয়েরা থাকতে অনুরোধ করে, তাই এসেছি। তবে ভর্তিতে আমি নেই।’’

সুরেন্দ্রনাথ কলেজের অধ্যক্ষ ইন্দ্রনীল কর অবশ্য বলছেন, ‘‘বাইরের কাউকে কলেজে ঢুকতে দিচ্ছি না। কেউ ঢুকে থাকলে ব্যবস্থা নেব।’’ টাকার বিনিময়ে ভর্তির অভিযোগ প্রসঙ্গে তাঁর জবাব, ‘‘অভিযোগ করতে বলুন। দোষীদের কলেজ থেকে তাড়িয়ে দেব। পুলিশকে তো বলা আছে। এ সব তো তাদেরই দেখার কথা।’’

শুধু সুরেন্দ্রনাথই নয়, এ দিন মধ্য কলকাতার বেশ কয়েকটি কলেজ ঘুরে দেখা গেল, অধিকাংশ কলেজেই গেট আটকে দাঁড়িয়ে থাকছেন ছাত্রনেতারা। মেধা তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও পড়ুয়াদের তাঁরা কাউন্সেলিং রুমে ঢুকতে দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ। গেট আটকে নিজেদের ফোন নম্বর দিয়ে পরে যোগাযোগ করতে বলছেন। কলেজের সামনের রাস্তায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে অভিভাবক-দাদাদের দর কষাকষিও কানে আসছে।

এ দিন সকাল ১১টা নাগাদ ফুলবাগানের গুরুদাস কলেজের গেট আটকে দাঁড়িয়ে ছিলেন বেশ কয়েক জন ছাত্রনেতা। সওয়া ১১টা নাগাদ ওই কলেজেই প্রাণিবিদ্যা নিয়ে ভর্তি হতে গিয়েছিলেন এক পড়ুয়া। মেধা তালিকায় ৬৮ নম্বরে নাম ছিল তাঁর। কলেজের গেট পর্যন্ত পৌঁছতেই এক ছাত্রনেতার প্রশ্ন, ‘‘কত নম্বরে নাম? ক’টায় আসতে বলা হয়েছিল?’’ উত্তর শুনে ওই ছাত্রনেতার দাবি, ‘‘১১টায় আসতে বলেছে, এখন তো ১১টা ১৫ মিনিট। আর হবে না। আমাদের কারও সঙ্গে কথা বলে তো আসিসনি!’’

ভর্তিপ্রার্থী জানতে চান, মেধা তালিকায় তো নাম উঠেছে, তা হলে ইউনিয়নের সঙ্গে কথা বলতে হবে কেন? এক ছাত্রনেতার উত্তর, ‘‘আমারও ব্রাজিলের দলে নাম উঠেছিল। খেলতে পারলাম না তো! বাড়ি যা ভাই, বাবাকে ফোন করতে বলিস।’’ সব শুনে কলেজের অধ্যক্ষ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আজ (বুধবার) একটু সমস্যা হয়েছে শুনলাম। কিন্তু, কোনও অভিযোগ আমার কাছে আসেনি।’’

শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘আমায় সরাসরি অভিযোগ জানাক পড়ুয়া বা বাড়ির লোক। ব্যবস্থা নেব। কোন বহিরাগত ঢুকে ভর্তি প্রক্রিয়া বানচাল করছে, তা কলেজের কাছে জানতে চাইব।’’ আশাহত পড়ুয়া অবশ্য দাবি করছেন, ‘‘অভিযোগ করলে কলেজে পড়া হবে না। সব জায়গায় ওদের লোক!’’

(চলবে)

আরও পড়ুন

Advertisement