Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৩ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

দুই প্রধানের দ্বন্দ্বে শিকেয় চিকিৎসকদের ভোট

পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতা ২৬ নভেম্বর ২০১৬ ০৩:৪৬
মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে নির্মল মাজি (বাঁ দিকে) ও শান্তনু সেন (ডান দিকে)।—ফাইল চিত্র

মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে নির্মল মাজি (বাঁ দিকে) ও শান্তনু সেন (ডান দিকে)।—ফাইল চিত্র

এক জন রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি। আর এক জন চিকিৎসকদের সর্বভারতীয় সংগঠন ‘ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’ (আইএমএ)-র রাজ্য শাখার সম্পাদক। এক জন বিধায়ক। অন্য জন কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর। তৃণমূলের এই দুই চিকিৎসক নেতা নির্মল মাজি ও শান্তনু সেনের কোন্দলে শিকেয় উঠেছে আইএমএ-র রাজ্য শাখার নির্বাচন। আইএমএ-র নির্বাচন কমিশন জরুরি বৈঠকে বসেও সাংগঠনিক নির্বাচনের নির্ঘণ্ট তৈরি করতে পারেনি। ফলে তারা রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক সুনীল গুপ্তের মত চেয়েছে। এমন ঘটনার নজির সংগঠনের ইতিহাসে নেই বলে জানাচ্ছেন আইএমএ-র কর্তারা।

সম্প্রতি নোট কাণ্ড নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাস্তায় নামার সময়ে তাঁর দুই পাশে দেখা গিয়েছিল তৃণমূলের দুই চিকিৎসক নেতা নির্মল মাজি ও শান্তনু সেনকে। এসএসকেএম হাসপাতালে আগুন লাগার পরে সেখানেও মুখ্যমন্ত্রীর পাশে দেখা গিয়েছিল ওই দু’জনকে। অর্থাৎ ভারে যে তাঁরা দু’জনেই সমান তা বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন নির্মল ও শান্তনু। এ হেন দুই চিকিৎসক নেতার মধ্যে আইএমএ-র নির্বাচন নিয়ে গোলমাল হওয়ায় রাজ্যের চিকিৎসক শিবির বিব্রত। আইএমএ রাজ্য শাখাই রাজ্যের চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রণ করে। সেই নিয়ন্ত্রণের রাশ কার হাতে থাকবে, কার কথা শুনে ডাক্তারবাবুরা কাজ করবেন, সরকারি হাসপাতালগুলিতেই বা কে বেশি ছড়ি ঘোরাবে তা নিয়েই লড়াই।

আইএমএ সূত্রের খবর, আড়াই মাস আগে সাংগঠনিক নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুই নেতার অনুগামীরা যে ভাবে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছেন তাতে কাজই এগোচ্ছে না। নির্বাচন আর হবে কী না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। নির্মলপন্থীদের অভিযোগ, নির্মল মাজিকে সভাপতি পদে দাঁড়াতে বাধা দিচ্ছেন শান্তনু সেন। আর শান্তনুর অনুগামীরা জানাচ্ছেন, নির্মল সময়মতো কাগজপত্র সংগঠনের নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাতে পারেননি। তাই তাঁকে মনোনয়নপত্র দেওয়া হয়নি। অভিযোগ উঠেছে, নির্মল এর পর রীতিমতো হুমকি দিয়ে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াটাই আটকে দিয়েছেন। ৫ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যালটপেপার বিলি-র কথা ছিল। তা হয়নি। ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা। তা হবে কিনা কেউ জানেন না।

Advertisement

উপায়ান্তর না দেখে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী অফিসারের মতামত চেয়ে পাঠিয়েছে আইএমএ-র রাজ্য শাখার নির্বাচন কমিশন। রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্য নির্বাচনী অফিসার শৈবাল বর্মণ বলেন, ‘‘এমন অনুরোধ আগে কখনও আমাদের কাছে আসেনি। আমরাও ঠিক জানি না এই অবস্থায় আমাদের কী করণীয়। সাধারণত কোনও সংগঠনের নির্বাচনে আমাদের কোনও ভূমিকা নেই।’’

তৃণমূল এ রাজ্যে প্রথম বার ক্ষমতায় আসার পরে চিকিৎসক শিবিরের উপরে নির্মল মাজির প্রবল নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়েছিল। সেই সময় নির্মল একই সঙ্গে রাজ্যে চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রায় সব কমিটি ও সংগঠনেরই মাথায় বসেছিলেন। অভিযোগ উঠেছিল, একাধিক সরকারি হাসপাতালের কর্তৃপক্ষকে তাঁর কথা মেনে চলতে হয়। এমনকী খোদ স্বাস্থ্যভবনেও তাঁর আঙুলের ইশারায় অনেক কাজ হয়। তাঁর বিরুদ্ধে স্বজনপোষণ, দুর্ব্যবহারের অভিযোগও বার বার উঠেছে।

কিন্তু তৃণমূল দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় আসার পর নির্মলের প্রভাব অনেক কমেছে। এই ফাঁকেই চিকিৎসক শিবিরে ক্ষমতা বাড়ে শান্তনু সেনের। একাধিক সরকারি হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতিতে তিনি ঢুকে পড়েন। ঢুকে পড়েন স্বাস্থ্য দফতরের উচ্চ পর্যায়ের নজরদারি কমিটিতেও। তৃণমূলপন্থী চিকিৎসকরা দুটি গোষ্ঠীতে আড়াআড়ি ভাবে ভাগ হয়ে যান।

দুই গোষ্ঠীর দুই নেতা কী বলছেন? নির্মল বলেছেন, ‘‘যা শুনছেন সব গুজব। শান্তনু আর আমি ঘনিষ্ঠ বন্ধু। নির্বাচন নিয়ে কিছু সমস্যা হয়েছে। মিটে যাবে।’’

আর শান্তনু সেনের মন্তব্য, ‘‘নির্মলদা আর আমি অতীতেও আইএমএ-তে একসঙ্গে ছিলাম। ভবিষ্যতেও ওঁর সঙ্গে কাজ করতে পারলে খুশি হব। নির্বাচন সংক্রান্ত সমস্যা সংগঠনের নির্বাচন কমিশনই মিটিয়ে ফেলতে পারবে।’’

২০১৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত আইএমএ-র রাজ্য শাখার সভাপতি ছিলেন নির্মল। নিয়মানুযায়ী এই পদের মেয়াদ এক বছর। তাই ২০১৪ সালে পদ ছেড়ে দিতে হয় নির্মলকে। সংগঠনের এক নেতার বক্তব্য, ‘‘রাজ্যের চিকিৎসকদের পরিচালনার ক্ষমতা চলে যাওয়াতে যথেষ্ট ম্রিয়মান হয়ে গিয়েছিলেন নির্মল। মরিয়া হয়ে ২০১৫ সালে আইএমএ-র কলকাতা শাখার সভাপতি পদে দাঁড়িয়ে জিতে যান তিনি।’’ শান্তনু ২০১২ সাল থেকে টানা রাজ্য শাখার সম্পাদক পদে রয়েছেন। ফলে তাঁর প্রতিপত্তিও বেড়েছে। স্বভাবতই নির্মল রাজ্য শাখায় নিজের প্রভাব ফের বাড়াতে এখন মরিয়া।

আইএমএ-র রাজ্য শাখার তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান অশোক চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, ২৫ অক্টোবর সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে প্রার্থীদের অনুমতিপত্র পেশের শেষ সীমা ছিল। কিন্তু নির্মলবাবুর অনুমতি তার মধ্যে আসেনি। পরে সে দিন রাত ন’টায় তিনি চিঠি দিয়ে দাবি করেন, স্পিড পোস্টে পাঠানো সংগঠনের চিঠি পাননি বলে তিনি সময়মতো অনুমতি দিতে পারেননি। কিন্তু স্পিডপোস্টের রিপোর্ট বলছে, কমিশনের চিঠি সঠিক সময়ে গিয়েছে। অশোকবাবুর কথায়, ‘‘গোটা পরিস্থিতির কথা জানিয়ে আমরা রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী অফিসারের মত চেয়ে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু উত্তর পাইনি।’’

আরও পড়ুন

Advertisement