সরকারি স্বীকৃতিহীন ‘গ্রামীণ চিকিৎসক’ বা ‘গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিবেশক’-দের সংগঠনকে গত ৬ ফেব্রুয়ারি সমাজমাধ্যম পোস্টে ‘শাখা সংগঠন’ হিসাবে ঘোষণা করে তুমুল বিতর্কের মুখে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের তৃণমূলপন্থী সংগঠন ‘পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মচারী ফেডারেশন’।
সংগঠনের স্বাস্থ্য শাখার করা ওই পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদর্শকে পাথেয় করে আজ (৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) মা-মাটি-মানুষের সরকারের অনুগামী গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিবেশকদের নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মচারী ফেডারেশনের শাখা সংগঠন আত্মপ্রকাশ করল।’ এতে যে প্রশ্ন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে তা হল, যে গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিবেশকদের সরকারি স্বীকৃতিই নেই, তাঁদের সংগঠন কী ভাবে রাজ্য সরকারি কর্মচারী ফেডারেশনের শাখা হতে পারে? তা হলে তো গ্রামীণ চিকিৎসকদের কার্যত সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বাম আমলে যাঁরা ‘হাতুড়ে’ চিকিৎসক ছিলেন, তাঁরাই মমতা-সরকারের সময়ে, ২০১৫ সাল নাগাদ গ্রামীণ চিকিৎসক বা ‘গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিবেশক’ হিসাবে পরিচিত হন। গত ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতার খাদ্য ভবনে কর্মচারী ফেডারেশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা গ্রামীণ চিকিৎসকদের সাংগঠনিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয় বলে পোস্টে দাবি করা হয়েছে। সেখানে গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিবেশকদের সংগঠনের রাজ্য কমিটি তৈরির কথাও বলা আছে। চেয়ারম্যান করা হয়েছে পশুপালন দফতরের এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী সুনীল করকে। আর উপদেষ্টা হয়েছেন রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরে কর্মরত দুই অফিসার জয়ন্ত ঘোষ ও সব্যসাচী চক্রবর্তী! অর্থাৎ, সুচতুর ভাবে গ্রামীণ চিকিৎসকদের সংগঠনে সরকারি কর্মীদের মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।
বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হতেই ওই পোস্টের দায় একে অন্যের ঘাড়ে চাপানো শুরু করেছেন ফেডারেশনের কর্তারা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা ফেডারেশনের কোর কমিটির সদস্য বারীন মজুমদারের বক্তব্য, ‘‘গ্রামীণ চিকিৎসকেরা ফেডারেশনের শাখা হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে তাঁদের নেওয়া হবে কিনা, এখনও ঠিক হয়নি। আমাদের ৩ লক্ষ ১০ হাজার কর্মী। তাঁদের মধ্যে কে, কখন ওই পোস্ট করে দিয়েছেন, কী করে বলব?’’ ফেডারেশন স্বাস্থ্য শাখার সভাপতি সব্যসাচী চক্রবর্তীর মন্তব্য, ‘‘যা বলার আমাদের আহ্বায়ক প্রতাপ নায়েক বলবেন। উনি সব জানেন।’’ প্রতাপ নায়েকের উত্তর, ‘‘আমি এই পোস্টের বিষয়ে কিছু জানি না। গ্রামীণ চিকিৎসকেরা সরকারি কর্মী নন। ওঁরা আমাদের সহযোগী হতে পারেন, শাখা হতে পারেন না। কে পোস্ট করে দিল, খোঁজ নিচ্ছি।’’
খাদ্য ভবনের ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গ্রামীণ চিকিৎসকদের একাংশকে নিয়ে গঠিত, সদ্য রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত সংগঠন ‘কলকাতা ইনফর্মাল হেল্থকেয়ার প্রোভাইডার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’-এর সদস্যেরা। সংগঠনের সহ-সভাপতি বিপ্লব রায়ের বক্তব্য, ‘‘ফেডারেশন হয়তো আমাদের তাদের শাখা বলেই মনে করছে, তাই ওই পোস্ট করেছে। আমরা তো ফেডারেশন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদর্শেই চলি। আমরা ওদের সহযোগী হয়েই কাজ করব।’’
গোটা ঘটনায় ক্ষুব্ধ ফেডারেশনের আদি নেতারা ও গ্রামীণ চিকিৎসকদের অন্য একাধিক সংগঠন। ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা-সদস্যদের অন্যতম মনোজ চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘কোনও দিন ফেডারেশনের সংবিধানে সরকারি নন, এমন লোকেদের সদস্য করা হত না বা শাখা সংগঠনে নেওয়া হত না। ভোটের রাজনীতি শুরু হয়ে গিয়েছে। ভোটের প্রয়োজনে সদস্য বাড়াতে ফেডারেশন এ সব করছে।’’
আর পল্লি চিকিৎসক সংগঠনের রাজ্য সভাপতি দিলীপকুমার পানের অভিযোগ, ‘‘এ সব হল সদস্য বাড়িয়ে তোলাবাজি বাড়ানোর ফিকির। একটা অনুষ্ঠান করে মুখে-মুখে এবং ফেসবুক মারফত জানিয়ে দিল যে, তোমরা আমাদের শাখা এবং সদস্য। এ বার সদস্য-পিছু ১০০০-১৫০০ টাকা চাঁদা তুলবে।’’
যদিও চাঁদার কথা অস্বীকার করেছেন ‘কলকাতা ইনফর্মাল হেল্থকেয়ার প্রোভাইডার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতি জয়ন্ত চক্রবর্তী এবং সহ-সভাপতি বিপ্লব রায়। তবে তাঁরা জানিয়েছেন, ভোটের সময় সংগঠনের সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে গ্রামে-গ্রামে তৃণমূলের হয়ে প্রচারের কাজ করবেন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)