Advertisement
E-Paper

দুশ্চিন্তার ছায়া কুপার্স ক্যাম্পে

এনআরসি আতঙ্কে ভুগছে গোটা রাজ্য। পরিস্থিতি ঘুরে দেখল আনন্দবাজারসিপিএমের এরিয়া কমিটির সদস্য সেই অশোক সম্মিলিত কেন্দ্রীয় বাস্তুহারা পরিষদের জেলা সম্পাদক। বারান্দায় ছোট টেবিলের বেশির ভাগ জুড়ে বই, কাগজপত্র।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০৪:০৯
—ফাইল চিত্র।

—ফাইল চিত্র।

সেই ১৯৫০ সালে মাত্র আট বছর বয়সে বাবার হাত ধরে পুব-বাংলা ছেড়েছিলেন অশোক চক্রবর্তী। বনগাঁ স্টেশনে উদ্বাস্তু পরিচয়ে আশ্রয়। কয়েক দিন পরে পাঠিয়ে দেওয়া হল শিয়ালদহ স্টেশনে। সেখানে দিন কুড়ি থাকার পরে রানাঘাটে কুপার্স ক্যাম্প। প্রথমে ঠাঁই হয়েছিল একটা গুদামে। পরে দোচালা টিনের ঘর মেলে।

সিপিএমের এরিয়া কমিটির সদস্য সেই অশোক সম্মিলিত কেন্দ্রীয় বাস্তুহারা পরিষদের জেলা সম্পাদক। বারান্দায় ছোট টেবিলের বেশির ভাগ জুড়ে বই, কাগজপত্র। গত কয়েক দিন ধরে তাঁর বাড়িতে বাড়ছে মানুষের ভিড়। ঘনঘন ফোন আসছে। চিন্তিত মুখে অশোক বলেন, “উদ্বাস্তু দফতর বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তরিত হওয়ায় অনেক মূল্যবান নথি খোয়া গিয়েছে। সেগুলো হাতে থাকলে ভাল হত।”

যেমন ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা প্রদীপ হাওলাদার। তিনি বলেন, “সরকারি ডিসপারসাল কার্ডটা পাচ্ছি না। তাই দুশ্চিন্তায় আছি। কী করা যায় জানতে অশোকবাবুর কাছে এসেছি।” নদিয়ার জেলার এই এলাকার বাসিন্দারা সবাই হিন্দু। অসমের এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের বেশির ভাগই হিন্দু জেনে রীতিমতো আতঙ্ক ছড়িয়েছে তাঁদের মধ্যে। খোঁজ পড়েছে কাগজপত্রের। অশোকবাবুর বাড়ির সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাচ্চু মালি বলেন, ‘‘আমরা তো এখনও জমির দলিল পাইনি!” কুপার্স বাজারে চেম্বারে বসে গ্রামীণ চিকিৎসক দেবাশিস মণ্ডলও বলেন, “১৯৮৪ সালে ঠিক হয়েছিল, আমাদের দলিল দেওয়া হবে। এখনও পাইনি।”

Advertisement

প্রবল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে হাজির সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ। একটু ধাতস্থ হয়েই কথা পাড়েন, “এক ছেলে এখানে থাকে। বাকি তিন জনকে নিয়ে আমি আন্দামানে থাকি। আমাদের নিয়ে খুব একটা ভয় দেখছি না। কিন্তু এই ছেলেকে নিয়ে ভাবনা হচ্ছে। এখনও সে জমির পাট্টা পায়নি।”

কুপার্স ক্যাম্প নোটিফায়েড এরিয়ার চেয়ারম্যান, তৃণমূলের শিবু বাইন বলেন, “এখানে সকলে উদ্বাস্তুর বৈধ কাগজপত্র পেয়েছিলেন। কিন্তু, এত দিন সেই কাগজকে গুরুত্ব দেননি, হারিয়ে ফেলেছেন। অর্ধেক মানুষ তা দেখাতে পারবেন না। এখন তাঁদের সবার মাথায় হাত পড়েছে।”

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনা ছাউনি ছিল কুপার্স ক্যাম্প। যুদ্ধ শেষে সেনারা চলে যাওয়ার পরে বড় বড় গুদাম, ঘর, হাসপাতাল ফাঁকা পড়ে ছিল। ১৯৪৯ সাল নাগাদ ফরিদপুর, বরিশাল, নোয়াখালি, যশোহর, খুলনার মতো নানা জায়গা থেকে ভিটে হারানো মানুষ এখানে আসতে শুরু করেন। তাঁদের বেশির ভাগ দিনমজুর বা খেতমজুর।

এক সময়ে কুপার্স ছিল ‘ট্রানজ়িট ক্যাম্প’। ছিন্নমূলদের তিন খুঁটির তাঁবুতে থাকতে দেওয়া হত। পরে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৫০ সালে জওহরলাল নেহরু পরিদর্শন করে গিয়ে এখানে শিবির করার কথা বলেন। সে বছরই ১৩ মার্চ কুপার্স ক্যাম্প গঠিত হয়। (১৯৯৬ সালে ১২ আসনের ‘কুপার্স ক্যাম্প নোটিফায়েড এরিয়া’ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে)।

এক বার ভিটে খুইয়ে কুপার্সে যাঁরা আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই এখন গভীর দুশ্চিন্তায়— আবার কি চলে যেতে হবে? এ বার কোথায়? ডিটেনশন ক্যাম্পে?

যাঁরা ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে এ দেশে আসার প্রমাণ দেখাতে পারেননি, অসমে নাগরিক পঞ্জি থেকে তাঁদের নাম বাদ গিয়েছে। বাংলায় কী হবে তা এখনও অজানা। কুপার্স ক্যাম্প নোটিফায়েড অফিসের সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কানের কাছে মুখ এনে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের এক মজুমদারবাবু বলেন, “আমরা ১৯৭২ সালে এসেছি। আমাদের কী হবে? কিছুই তো বুঝতে পারছি না।” পাশে কল থেকে জল তুলছিলেন মাঝবয়সি অঞ্জলি ঘরামি। তাঁর বিশ্বাস, “আমাদের তো পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছে। আবার ভয় কী?” শুনে পাশে দাঁড়ানো এক জন ঝাঁঝিয়ে ওঠেন, “বড় বড় কথা বোলো না তো! কত বড় লোকের নাম বাদ গিয়েছে অসমে, তুমি-আমি তো কোন ছার!”

কুপার্স মার্কেট কমপ্লেক্সে একটি ঘরে বসেছিলেন কুপার্স শহর তৃণমূল সভাপতি তথা ১১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার পিন্টু দত্ত। তাঁর দাবি, “এখানে সকলেই আতঙ্কিত। আমরা তাঁদের সাহস জোগাচ্ছি, প্রাণ থাকতে এনআরসি হতে দেব না।” অশোক অবশ্য মনে করেন, “উদ্বাস্তুদের জন্য লড়াই করছি, এ কথা বলার অধিকার তৃণমূলের নেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই প্রথম ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন। বিধানসভা ভোটের কথা মাথায় রেখে এখন ওরা উদ্বাস্তু প্রীতি দেখাচ্ছে।” কুপার্স শহর বিজেপি সভাপতি দীপক দের দাবি, “মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে তৃণমূলই। এখান থেকে কোনও হিন্দুকে বিতাড়িত হতে হবে না।”

কিন্তু তাঁদের কথায় বিশেষ ভরসা পাচ্ছেন না প্রদীপ হাওলাদার, শিবু বাইনের মতো কুপার্সের বাসিন্দারা।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy