Advertisement
E-Paper

রাজ্যে রেড জোনের তিন ভাগ, ছাড়ে মেয়াদি পরিকল্পনা

মমতার কথায়, ‘‘অনন্ত কাল বসে থাকলে চলবে না। করোনা এবং আর্থিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে। তাই লকডাউনের মধ্যেও পারস্পরিক দূরত্ববিধি মেনেই কাজকর্ম শুরু করতে হবে।’’

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৩ মে ২০২০ ০৪:৪৯
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফাইল চিত্র।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ফাইল চিত্র।

তাড়াতাড়ি করোনা থেকে রেহাই পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই একই সঙ্গে করোনা-প্রতিরোধ এবং ধাপে ধাপে জীবন-জীবিকা স্বাভাবিক করার পথে এগিয়ে যেতে হবে— মঙ্গলবার নবান্নে এ কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ দিনই জেলাশাসক-পুলিশ সুপারদের সঙ্গে ভিডিয়ো বৈঠকে জনজীবন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার পথে এগোনোর নির্দেশ দেন তিনি। এর আগে গ্রিন ও অরেঞ্জ জ়োনে বিভিন্ন কাজকর্মে ছাড় দিয়েছিল রাজ্য সরকার। এ বার রেড জ়োনেও জনজীবন স্বাভাবিক করার পথে এক ধাপ এগোল রাজ্য। এ দিন মুখ্যমন্ত্রী জানান, রেড জ়োনকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। সেই ভাগ অনুসারে কিছু বিষয়ে ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে রাজ্য সরকার।

মমতার কথায়, ‘‘অনন্ত কাল বসে থাকলে চলবে না। করোনা এবং আর্থিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ভারসাম্য আনতে হবে। তাই লকডাউনের মধ্যেও পারস্পরিক দূরত্ববিধি মেনেই কাজকর্ম শুরু করতে হবে।’’ আপাতত তিন মাসের স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে রাজ্য। তার পর ‘মিড টার্ম’ এবং ‘লং টার্ম’ মেয়াদে পরবর্তী ধাপ নির্ধারিত হবে।

সরকারের অন্দরে কয়েক দিন ধরেই লকডাউন আর কত দিন টেনে রাখা উচিত হবে, সেই চর্চা চলছিল। নবান্নের শীর্ষ সূত্রের অভিমত, লকডাউনের ফলে সামগ্রিক ভাবে শুধু মানুষের রুজির উপরে চাপ পড়ছে তা নয়, মানসিক এবং সামাজিক ভাবেও এটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে ছাড়ের কথা সরকারকে এখন দ্রুত ভাবতে হবে। প্রধানমন্ত্রীও এ দিন বলেছেন, লকডাউনের চতুর্থ দফা অনেক অন্য রকম হতে চলেছে।

ছাড়ে মেয়াদি পরিকল্পনা

প্ল্যান এ: পরিকল্পনা কার্যকর হতে পারে আজ থেকে

প্ল্যান বি: পরিকল্পনা বলবৎ হবে ২১ মে থেকে

প্ল্যান সি: প্ল্যান বি-র পরিকল্পনা রূপায়ণ সম্পূর্ণ হলে তৃতীয় স্তরের কাজ শুরু

প্ল্যান এ-র আওতায় কী কী ছাড়

(কন্টেনমেন্ট এলাকার বাইরে শর্তাধীনে চালু)

কোন এলাকায়, কোন জ়োনে দোকান খুলবে, তা স্থির করবেন ডিএম এবং এসপি

• গ্রিন জ়োন জেলা, কলকাতায় ১৩ রুটে বাস চলায় ছাড়।

• ভাড়া না বাড়িয়ে ২০ জন যাত্রী নিয়ে সরকারি বাস

• বেসরকারি বাস নিজের মতো করে ‘ভাড়া’ ঠিক করবে

• ট্যাক্সি পরিষেবা

• একক দোকান খুলবে

• গয়না, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম, রং, বৈদ্যুতিন পণ্য, মোবাইল চার্জিংয়ের দোকান খুলবে

• রেস্তরাঁ ছাড়া অন্য খাবারের দোকান (চপ-মুড়ি, রোল) ১২টা থেকে ৬টা পর্যন্ত। দোকানে বসে খাওয়া নয়।

• ফিল্ম এবং টেলিভিশনের কাজে বিধি মেনে এডিটিং, ডাবিং, মিক্সিংয়ে অনুমতি।

• বিশ্ববাংলা হাট, তাঁতের হাট, স্বনির্ভর গোষ্ঠী, খাদি বাজারে সবুজ সঙ্কেত

• বকেয়া নির্মাণ কাজ, বাংলা আবাস, সড়ক যোজনা, জনস্বাস্থ্য কারিগরি, পূর্ত, সেচ, মৎস্য, খাদ্য, কৃষি, কৃষি বিপণন, প্রাণিসম্পদ, উদ্যানপালন, হর্টিকালচারে কাজ শুরু

• আমদানি, রফতানি সংক্রান্ত গতিবিধিতে ছাড়

• বিড়ি শিল্প, চা-বাগানে ৫০% কর্মী

মুখ্যমন্ত্রী এ দিন জানান, গত দু’মাস ধরে রাজ্যের কোনও রোজগার নেই। কারণ, ব্যবসাবাণিজ্য সব বন্ধ। কেন্দ্রের কাছে রাজ্যের প্রাপ্য চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কিছুই মেলেনি। অন্য রাজ্য সরকারি কর্মীদের বেতন কেটে নিলেও, এখনও এ রাজ্য সে পথে যায়নি। বেসরকারি ক্ষেত্রের চাকুরে, সর্বোপরি অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, কর্মচারীদের অবস্থা আরও শোচনীয়। তাই স্বাভাবিক আর্থিক কর্মকাণ্ড শুরু করতে হবে। যাতে মানুষের হাতে কাজ, পেটে খাবারের ব্যবস্থা হয়, তা দেখতে হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।

আরও পড়ুন: রাজ্যে মৃত্যু ৮ জনের, কিছুটা স্বস্তি সুস্থতার হারে

আরও পড়ুন: মোদীর স্বদেশি আত্মনির্ভরতার ডাকেও সংশয় অনেক

লকডাউন বিধির মধ্যে আর্থিক কর্মকাণ্ড শুরু করার ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী গ্রামীণ অর্থনীতির দিকেই প্রাথমিক নজর দিয়েছেন। তিনি জানান, শপিং কমপ্লেক্স, মল না-খুললেও সব ধরনের দোকান খোলা যাবে। গ্রিন জেলাগুলিতে বাস চালানো শুরু

হয়েছে। কলকাতা-সহ অন্যত্র বাস পরিষেবাও বাড়ানো হবে। সরকারি বাস ২০ জন যাত্রী নিয়ে চলবে। কিন্তু বেসরকারি বাসমালিকেরাও ২০ জন যাত্রী নিয়ে চালাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে ভাড়া তাঁরা নিজেরা ঠিক করে নেবেন বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘রাস্তায় বাস নামাতে বেসরকারি মালিকেরা নিজেরা ভাড়া ঠিক করতে পারেন। সরকার এর মধ্যে নাক গলাবে না। পরিবহণমন্ত্রী বাসমালিকদের সঙ্গে বসে সবটা ঠিক করে নেবেন।’’

পথ চেয়ে: জানলা দিয়েই শহর-দর্শন কলকাতার বিবেকানন্দ রোডের বাসিন্দাদের। ছবি: সুমন বল্লভ

জেলার মধ্যে বাস চললেও এখনও এক জেলা থেকে অন্য জেলা বা ভিন্‌ রাজ্যে বাস চলাচল করবে না বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি সোনা, বৈদ্যুতিন সামগ্রী, কম্পিউটার, মোবাইল রিচার্জের দোকান খুলে দেওয়া হবে। রেস্তরাঁ না-খুললেও খাবারের দোকান (চপ-মুড়ি, রোল-চাউমিন) খোলার অনুমতি দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, সরকার এখনই দোকানে গিয়ে ‘মাখামাখি’ হলে তা মেনে নেবে না। তাই দোকান থেকে খাবার কিনে চলে যেতে হবে। সব ধরনের দোকানই ১২টা থেকে ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। কারণ, সকালে মাছ-আনাজের বাজার খোলা থাকে, অফিসযাত্রীরা পথে বেরোতে পারেন। সেই সময় অন্য দোকান খোলা থাকলে ভিড় হতে পারে। তাই সকালের বাজার বন্ধ হওয়ার পরে অন্য সামগ্রীর দোকান খুলবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘বহু সংখ্যক মানুষ যে সব আর্থিক কারবারে যুক্ত তা খুলে দেওয়া হবে। বন্দরে স্বাভাবিক কাজকর্ম ফেরানো হবে। টলিউড-টেলিউডে এডিটিং, মিক্সিং, ডাবিংয়ের কাজ শুরু করা হবে। তবে এখনও শুটিং শুরু করা হচ্ছে না।’’

রাজ্যে রেড জ়োনে তিন ভাগ

• রাজ্যের বিচারে রেড জ়োনের জেলা— কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনা, পূর্ব মেদিনীপুর

• রেড জ়োনকে তিন ভাগে ভাগ— এ, বি, সি

• তিন দিনের মধ্যে পুলিশ রেড জ়োনের বিভাজন সরকারকে জমা দেবে।

• প্রশাসন ও স্বাস্থ্য দফতর ছাড়ের এলাকা ও বিষয় জানাবে।

• ১৫ মে-র পর প্রকাশিত হতে পারে নির্দেশিকা।

• রেড জ়োন (এ) কঠোর ভাবে বহাল থাকবে লকডাউন। ছাড় নয়।

• রেড জ়োন (বি) নিয়ন্ত্রিত ছাড়। যে-সব ব্যবসা, কারবারে ছাড় দিলে সমস্যা নেই, দেওয়া হবে।

• রেড জ়োন (সি) এলাকা আংশিক ভাবে খুলে দেওয়া হতে পারে।

গ্রামীণ জীবনে আর্থিক কর্মকাণ্ড শুরু করতে ১০০ দিনের কাজে জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। পরিযায়ী শ্রমিকদেরও সেই কাজ দেওয়া যেতে পারে বলে তিনি জানান। এ ছাড়া কৃষক বন্ধু প্রকল্পে চাষিদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ২০ মে-র মধ্যে ২৫০০ টাকা করে জমা দেওয়া হবে। সমস্ত ধরনের পেনশন প্রাপকদের জুন-জুলাইয়ের পেনশনও আগাম দিয়ে দেবে সরকার। ১১ লক্ষ কিষাণ ক্রেডিট কার্ডের আবেদনেও মঞ্জুরি দিচ্ছে নবান্ন। পুরনো বাতিল রেশন কার্ড (সাদা রঙের) নিয়ে এলেও সরকার তিন মাসের খাদ্যসামগ্রী দেবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। সেই সঙ্গে খুলবে তাঁতের হাট, বিশ্ববাংলা বাজার, বাংলা সড়ক যোজনা, বাংলা আবাস যোজনার কাজও দ্রুত শুরু করার নির্দেশ দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘গ্রামে সরকারি প্রকল্পগুলি শুরু করে মানুষের হাতে কাজ এবং উপভোক্তাদের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। খাবারও দেওয়া হচ্ছে। মানুষ যাতে অভুক্ত না-থাকে, তা দেখার জন্য জেলাশাসকদের বলেছি।’’

সরকাির-বেসরকারি প্রকল্পে কাজ করতে এলে পুলিশ যাতে শ্রমিক, কর্মীদের অনুমতি দেয়, সে জন্য নির্দেশ দিয়েছে সরকার। শ্রমিকদের যাতায়াতের সমস্যা হলেও সরকার বাসের ব্যবস্থা করবে। কারণ, ধীরে ধীরে জনজীবন স্বাভাবিক করাই এখন সরকারের কাজ।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘তবে ভুললে চলবে না লকডাউনেই কাজ শুরু হচ্ছে। ফলে পারস্পরিক দূরত্ববিধি বজায় থাকবে। এর লঙ্ঘন করা চলবে না। যদি কোথাও দূরত্ববিধি না-মানা হয়, মাস্ক না-পরা হয়, হাত না-ধোয়া হয়, সে ক্ষেত্রে পুলিশ বিপর্যয় মোকাবিলা বিধি মেনে ব্যবস্থা নেবে। ২১ মে পর্যন্ত লকডাউনের সমস্ত নিয়ম মেনেই চলতে হবে। এর পরে সরকার নতুন নির্দেশিকা দেবে।’’

মুখ্যমন্ত্রী জানান, গত আড়াই মাসে সরকারের প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকার রোজগার ধাক্কা খেয়েছে। করোনার প্রভাব থেকে থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য রাজ্যের গঠিত আর্থিক টাস্ক ফোর্স ১ লক্ষ ৫২ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজের পরিকল্পনা করেছে। সেই টাকা কোথা থেকে আসবে, তা অবশ্য খোলসা করেননি মুখ্যমন্ত্রী।

Red Zones Coronavirus Mamata Banerjee
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy