অতীতের ভোটগুলিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গালভরা সংখ্যার ঘোষণা থাকলেও কার্য ক্ষেত্রে তার ন্যূনতম প্রতিফলন পাননি সাধারণ মানুষ। ফলে বাহিনীর ‘ফিরিস্তি’ সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হলেও ভোটের অশান্তিতে রাশ পড়েনি। আসন্ন ভোটে তাই কার্যত মুখরক্ষার চ্যালেঞ্জ রয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সামনে। ভোট ঘোষণার অনেক আগে থেকে অবসরপ্রাপ্ত এক আইপিএস অফিসারকে রাজ্যের বিশেষ হিসাবে নিয়োগ করার নেপথ্যে সেই ভাবমূর্তি উদ্ধারের কৌশল রয়েছে বলে প্রশাসনিক মহলের অনেকে মনে করছেন। কারণ, ওই পর্যবেক্ষক ভোটের সময় প্রধানত পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনীর ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণ দেখভাল করবেন।
ভোট ঘোষণা না-হওয়া পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রাজ্যের হাতেই থাকে। ভোট ঘোষণার পরে তেমনই ব্যবস্থা চলে ঠিকই, কিন্তু তাতে কমিশনেরও নিয়ন্ত্রণ থাকে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮ ব্যাচের সিকিম ক্যাডারের অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস অফিসার এন কে মিশ্রকে এ রাজ্যের বিশেষ পর্যবেক্ষক হিসাবে নিয়োগ করেছে কমিশন। ইতিমধ্যে দায়িত্বও গ্রহণ করেছেন তিনি। একটি সূত্রের দাবি, তাঁর গোয়েন্দা ব্যুরোতেও কাজের অভিজ্ঞতা আছে। তাই কমিশনের হয়ে তাঁর আইনশৃঙ্খলা এবং বাহিনী ব্যবহারের দিক দেখভাল করার বিষয়টি ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ বলে মনে করছেন অনেকে।
এই নজরদারির বিষয়ে ইতিমধ্যে কিছু পদক্ষেপের ভাবনাচিন্তা হয়েছে বলেও খবর। সূত্রের দাবি, কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রতিটি গাড়িতে জিপিএস ব্যবস্থায় থাকবে। কোথায় গাড়ি আছে, তা কোথায় তা যাচ্ছে— সবই কমিশন নজরে রাখতে পারবে। পাশাপাশি প্রতিটি গাড়িতে ক্যামেরা লাগানোর পরিকল্পনাও আছে। তা থেকে লাইভ ফুটেজও পাওয়া যাবে। এই নজরদারিতে নির্দিষ্ট কমান্ড সেন্টারও থাকবে। জানা যাচ্ছে, কোথাও গোলমাল হলে স্থানীয় পুলিশ কেন্দ্রীয় বাহিনীকে যথাযথ পথে নিয়ে যাচ্ছে কি না, তা এই ব্যবস্থায় বোঝা যাবে।
অভিজ্ঞ কর্তাদের অনেকে জানাচ্ছেন, কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের কাছে অন্যতম একটি প্রতিকূলতা যে তাঁরা প্রতিটি এলাকার সব রাস্তা, গলিপথ চেনেন না। তাই গোলমালের জায়গায় পৌঁছতে পুলিশের উপরে ভরসা করতে হয়। অভিযোগ, সেখানেই প্রতিবার ঘাটতি থেকে যায়। কমিশনের কাছেও তথ্য পৌঁছয় না। বছর ছয়েক আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক পরিকল্পনা করেছিল, কেন্দ্রীয় বাহিনীর কমান্ডান্টেরাই বাহিনী পরিচালনা করবেন। রাজ্যের আপত্তি থাকায় সেই ব্যবস্থা কার্যকর করা যায়নি।
বস্তুত, এ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা কখনও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে ওঠেনি। ভোট হোক বা এসআইআর— অশান্তির নানা ঘটনা রাজ্যের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় স্তরেও সমালোচিত হয়েছে। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতকেও সমালোচনা করতে শোনা গিয়েছে। এই অবস্থায় এন কে মিশ্রের আগেভাগে এসে দায়িত্বগ্রহণ যে বিশেষ বার্তাবহ তা-ও মনে করিয়ে দিয়েছেন অনেকে। সোমবার রাজ্য পুলিশের ডিজি, এডিজি (আইনশৃঙ্খলা), কলকাতার পুলিশ কমিশনার-সহ কেন্দ্রীয় বাহিনীর কো-অর্ডিনেটরকে নিয়ে কমিশন যে বৈঠক করেছিল, সেখানেও মিশ্র হাজির ছিলেন।
সেই বৈঠকে প্রাথমিক পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি করতে বলা হয়েছে পুলিশকে। কোন কোন এলাকা স্পর্শকাতর, উত্তেজনাপ্রবণ বা সংবেদনশীল, সেই তালিকা তৈরি করতে বলা হয়েছে। সূত্রের দাবি, এর পাশাপাশি অতীতের ভোট এবং এসআইআর-এ হিংসার ঘটনার উদাহরণ ঘেঁটে পৃথক তালিকা তৈরি করবেন মিশ্রও। সে ভাবেই বাহিনী মোতায়েন করা হবে। আপাতত খবর, রাজ্যের ১০০% বুথকে স্পর্শকাতর ধরেই নিরাপত্তা পরিকল্পনা তৈরি করতে চাইছে কমিশন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)