Advertisement
E-Paper

রাজ্যপালকে সব খুলে বললেন সুশান্ত

কখনও ফোঁস করেছেন, কখনও ঢোক গিলেছেন। কখনও আবার দাবি করেছেন, তিনি বড়ই অসহায়। কলকাতা পুরভোটে ব্যাপক সন্ত্রাস এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও রাজ্য নির্বাচন কমিশনার সুশান্তরঞ্জন উপাধ্যায় এখনও অবধি কোনও ব্যবস্থা নিয়ে উঠতে পারেননি। তবে বুধবার রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর কাছে গিয়ে সব কথা ‘খুলে বলে’ এসেছেন বলে দাবি করছেন তিনি।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০১৫ ০৪:৩৮

কখনও ফোঁস করেছেন, কখনও ঢোক গিলেছেন। কখনও আবার দাবি করেছেন, তিনি বড়ই অসহায়। কলকাতা পুরভোটে ব্যাপক সন্ত্রাস এবং অনিয়মের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও রাজ্য নির্বাচন কমিশনার সুশান্তরঞ্জন উপাধ্যায় এখনও অবধি কোনও ব্যবস্থা নিয়ে উঠতে পারেননি। তবে বুধবার রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর কাছে গিয়ে সব কথা ‘খুলে বলে’ এসেছেন বলে দাবি করছেন তিনি।

কলকাতার পুরভোট নিয়ে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের কাছ থেকেই নানা ধরনের অভিযোগ পৌঁছেছে রাজভবনে। নবান্নের কর্তারা ‘অবাধ’ ভোটের দাবি করলেও সমাজের বিভিন্ন মহল থেকে রিগিং, ছাপ্পা ভোট এবং বুথ দখলের অভিযোগ উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে বুধবার রাজ্য নির্বাচন কমিশনারকে রাজভবনে ডেকে পাঠান রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী। তাঁর সঙ্গে দেখা করার পরে সুশান্তবাবু সাংবাদিকদের জানান, সেদিন ভোট নিয়ে যে ধরনের অভি়যোগ এসেছে সেগুলি তিনি রাজ্যপালকে বলেছেন। ভোট পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজ্য প্রশাসন যে তাঁকে কোনও গুরুত্বই দিচ্ছে না, সে কথাও বলেছেন। নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য, ‘‘১৮ই ভোটের দিন কী হয়েছে, ২৫ তারিখের ভোটের প্রস্তুতি কেমন হচ্ছে, তা আমার কাছে জানতে চান রাজ্যপাল। আমি তাঁকে সব কিছু খুলে বলেছি। ভোটের দিন বিভিন্ন দল, প্রার্থী ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যে সব অভিযোগ পেয়েছি, তারও সবিস্তার জানিয়েছি রাজভবনের কর্তাকে।’’ কলকাতার পুরভোট যে আদর্শ পরিবেশে হয়নি, সে কথা ভোটের দিন নিজেই কবুল করেছিলেন সুশান্তবাবু। রিটার্নিং অফিসারের রিপোর্ট যে তাঁকে সন্তুষ্ট করেনি, মঙ্গলবার জানিয়েছিলেন সে কথাও। এ দিন ফের তিনি বলেন, ‘‘কলকাতা পুরভোট নিয়ে রিটার্নিং অফিসার যে চূড়ান্ত রিপোর্ট দিয়েছেন, তার সবটার সঙ্গে আমি সহমত নই। এ কথা রাজ্যপালকে জানিয়েছি।’’

সুশান্তবাবুর বক্তব্য, ভোটের দিন তিনি নিজের অফিসে বসে ওয়েবক্যামে পরিস্থিতি মনিটর করছিলেন। অন্যান্য সূত্র থেকে অভিযোগ পাওয়ার পাশাপাশি, তিনি নিজের চোখে যা দেখেছেন, তার সঙ্গেও রিটার্নিং অফিসারের রিপোর্টে ফারাক রয়েছে।

কী রকম? সুশান্তরঞ্জন জানান, তিনি নিজে ওয়েবক্যামে দেখেছেন চারটি ক্ষেত্রে সিসিটিভি ক্যামেরার মুখ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভাঙা হয়েছে একটি ক্যামেরা। অথচ রিটার্নিং অফিসার তথা দক্ষিণ ২৪ পরগণার জেলাশাসকের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ওই ওয়েবক্যামগুলি ‘ঠিকমতো কাজ করেনি’। কমিশনার জানান, ঘটনার সত্যতা জানতে যে সংস্থা ওই ক্যামেরাগুলি দিয়েছিল তাদের কাছ থেকে সে দিনের রিপোর্ট চাওয়া হবে।

একই সঙ্গে সুশান্ত রাজ্যপালকে জানিয়েছেন, ভোটের দিন অন্তত দু’টি বুথের প্রিজাইডিং অফিসার টেলিফোনে জানান, তাঁদের বুথ দখল হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ভোটের শেষে তাঁরা যে লিখিত দিয়েছেন, সেখানে ওই বিষয়ের কোনও উল্লেখ নেই! এই অফিসারদের কি শোকজ করা হবে? সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তাঁর জবাব, ‘‘সেটা ভেবে দেখছি।’’ শুধু তাই নয়, রাজভবনকে সুশান্ত জানিয়েছেন, ভোটের দিন প্রিজাইডিং অফিসারদের একটি অংশ বেলা আড়াইটের পর এসএমএস-এ ভোটের হার জানানো বন্ধ করে দেন। যার ফলে ভোটের হার নিয়ে কমিশনকে দু’রকম তথ্য জানাতে হয়েছে। নির্বাচনের দিন পাওয়া হিসেব অনুযায়ী ৬২.৪ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে তিনি জানতে পারেন। কিন্তু সব ইভিএম জমা পড়ার পরে রিটার্নিং অফিসার যে রিপোর্ট পাঠান, সেখানে জানানো হয়, ভোট পড়েছে ৬৮.৫৯ শতাংশ।

রিপোর্ট নিয়ে অভিযোগ তো রয়েছেই। তার সঙ্গে সার্বিক ভাবেই প্রশাসনের তরফে অসহযোগিতার অভিযোগ এনেছেন সুশান্ত। যেমন তাঁর অভিযোগ, গিরিশ পার্কে পুলিেশর গুিল খাওয়ার ঘটনার রিপোর্ট এখনও তাঁর হাতে এসেই পৌঁছয়নি। শনিবার ভোটের দিন বিকেলে গিরিশ পার্কে গুলিবিদ্ধ হন কলকাতা পুলিশের সাব ইনস্পেক্টর জগন্নাথ মণ্ডল। নিয়ম মতো, পুলিশ কমিশনার অথবা তাঁর হয়ে অন্য কোনও পদাধিকারীর নির্বাচন কমিশনে রিপোর্ট পাঠানোর কথা। এই নিয়ে তাঁকে কিছু না জানানোয় রবিবার নিজেই পুলিশ কমিশনারের কাছে ঘটনার রিপোর্ট চেয়ে পাঠান নির্বাচন কমিশনার। বুধবার রাজ্যপালকে তিনি জানিয়েছেন, ওই ঘটনা নিয়ে এ দিন পর্যন্ত লালবাজার থেকে তাঁকে কিছুই জানানো হয়নি। পরে সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘‘সাবইনস্পেক্টরের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর এখনও তাঁকে জানানো
হয়নি। তিনি যেটুকু জেনেছেন, তা সংবাদ মাধ্যমে।’’

কেন নির্বাচন কমিশনকে রিপোর্ট পাঠানো হল না? এ দিন রাতে সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে নগরপাল সুরজিৎ কর পুরকায়স্থ এবং যুগ্ম কমিশনার (সদর) রাজীব মিশ্রকে প্রথমে ফোন এবং পরে এসএমএস করা হলেও তার কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। কলকাতা পুরভোটের রিটার্নিং অফিসার ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলাশাসক শান্তনু বসু আগেই জানিয়েছেন, ওই ঘটনার রিপোর্ট কমিশনকে দেওয়ার দায় লালবাজারের, তার নয়।

রাজ্যপালকে সুশান্ত আরও জানিয়েছেন, ভোটের দিন শহরের বিভিন্ন প্রান্তে গোলমালের খবর পেয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষক এবং পুলিশকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা জানতে পেরেছেন ঘটনার প্রায় ৭২ ঘণ্টা পরে, মঙ্গলবার। একই ভাবে, বিরোধীরা যে ৩০টি বুথে পুনর্নির্বাচনের দাবি করেছে, তা নিয়ে রিপোর্টও তাঁর হাতে এসেছে মঙ্গলবার। এবং সেখানে বলা হয়েছে, কোনও বুথে কোনও গোলমাল হয়নি। সর্বত্রই অবাধে ভোট
দিয়েছেন ভোটাররা।

আইনি সীমাবদ্ধতা তাঁর হাত-পা বেঁধে রেখেছে বলেই এ সব নিয়ে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না বলে বারবার দাবি করছেন সুশান্ত। তা হলে কেন তিনি কমিশনারের পদ আঁকড়ে রয়েছেন, সেই প্রশ্নও উঠেছে। এ দিন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছেন। কমিশনারকে মেরুদণ্ডহীন বলে কটাক্ষ করে তিনি বলেছেন, ‘‘ওনার কাজ করার ক্ষমতা না থাকলে ইস্তফা দিন। উনি বলুন, রাজ্য এমন অক্টোপাসের মতো বেঁধে রেখেছে যে কাজ করতে পারছেন না।’’ এমন নির্বাচন কমিশন রেখে দেওয়া ‘অতিরিক্ত ব্যয়’ বলেও মন্তব্য করেন বিমানবাবু। ‘অ্যাপেনডিক্সে’র মতো এই কমিশনকে ‘অপারেশন করে বাদ দেওয়া’ উচিত বলেও মন্তব্য করেন ফ্রন্ট চেয়ারম্যান।

তিনিও কি তাই ভাবছেন? সুশান্তবাবুর জবাব, ‘‘রাজনৈতিক দলের নেতাদের বক্তব্যের কোনও জবাব দেব না।’’ কিন্তু কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তো সাধারণ মানুষই প্রশ্ন তুলছেন! উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘রাজ্য নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা সাধারণ মানুষের চোখে কী দাঁড়াবে আমি বলতে পারব না। তা মানুষই বলবেন।’’

Susanta Ranjan Upadhyay Kesari Nath Tripathi Election Commission KolkataMunicipal Corporatio BJP KMC abpnewsletters
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy