Advertisement
E-Paper

একে একে নিবিছে দিদির দেউটি! জয়ীরা ঝাঁপাচ্ছেন দ্রোহী শিবিরে, হেরোরা ছাড়ছেন পদ! কালীঘাটে ক্রমেই কোণঠাসা হচ্ছেন মমতা

যাঁরা জিতেছেন, তাঁদের বারো আনাই বিদ্রোহী শিবিরে শামিল হয়েছেন। আর যাঁরা হারার পরেও সাংগঠনিক স্তরে দায়িত্ব পেয়েছিলেন সদ্য, তাঁরাও সরে যাচ্ছেন দিদির পাশ থেকে।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ ২১:৪৬
Firhad Hakim to Jyotipriya Mullick, Mamata\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\\'s trusted lieutenants are leaving TMC supremo

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।

এত দ্রুত? সত্যি!

ক্ষমতা চলে গেলে তাঁর নিজের হাতে গড়া দল যে এত দ্রুত ধসে পড়বে, তা কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক বারও ভেবেছিলেন? তাঁর দেওয়া টিকিটে যাঁরা জিতেছেন, তাঁদের বারো আনাই বিদ্রোহী। নতুন করে যাঁদের সাংগঠনিক দায়িত্ব দিচ্ছেন, তাঁরাও দিদির পাশ থেকে সরে যাচ্ছেন দ্রুত। শুক্রবার সেই তালিকায় নাম লেখালেন জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী! গত দেড় মাসে কোন কোন ‘কাছের লোক’কে হারালেন মমতা?

হাকিমে হানা!

তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে চেতলার ববি মমতার ছায়াসঙ্গী। তাঁর ‘প্রশ্নাতীত’ আনুগত্যের প্রতিদানও দিয়েছেন মমতা। তাঁকে তুলে ধরেছিলেন দলের প্রধান সংখ্যালঘু নেতা হিসেবে। পুরসভা ভোটে টিকিট না-পেয়ে এক বার ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন ববি। ক্ষতে মলম দিয়ে কাছে টেনে নিয়েছিলেন মমতা। তার পর কলকাতার প্রথম সংখ্যালঘু মেয়র হয়েছেন ফিরহাদ হাকিম, মমতার সৌজন্যেই। সেই সঙ্গে পেয়েছেন পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর। মেয়রের হাতেই পুর দফতর থাকা নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন বিরোধীরা, মমতা আমল দেননি। ভোট-বিপর্যয়ের পরেও ফিরহাদকে পরিষদীয় দলের মুখ্যসচেতক করেছিলেন। কিন্তু দলে বিদ্রোহ দানা বাঁধতেই দিদির বৃত্তের বাইরে চলে গিয়েছেন ববি। নাম লিখিয়েছেন ঋতব্রত শিবিরে। শুক্রবার ‘বিদ্রোহী’ বিধায়কদের পরিষদীয় পাঠশালায় ববিই ছিলেন হেডমাস্টার।

অরূপের ‘বিশ্বাস’ভঙ্গ!

কাউন্সিলর থেকে ক্লাব সংগঠনে হাত পাকানো অরূপের তৃণমূলে উত্থান রকেট গতিতে। মমতার প্রথম মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি বটে, কিন্তু মন্ত্রী হওয়ার পরে অচিরেই দিদির আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলেন। অরূপের প্রতি মমতার নির্ভরতা যত বেড়েছে, ততই দলে এবং সরকারে দাপট বেড়েছে অরূপের। শেষ তৃণমূল সরকারে বিদ্যুৎ দফতরের দায়িত্বে ছিলেন অরূপ। সেখানে অনিয়মের অভিযোগ ছিল বিস্তর। দিদি কিছুই কানে তোলেননি। মেসি-কাণ্ডেও স্রেফ ক্রীড়ামন্ত্রীর পদ কেড়েই ছাড় দিয়েছিলেন অরূপকে। দাদার জোরে ভাই স্বরূপ হয়ে উঠেছিলেন টলিউডের হর্তাকর্তা। মমতার আস্থাভাজন বলেই তৃণমূলের কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছিল অরূপকে। কিন্তু দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করার দাবি জানিয়ে তাঁর চিঠি বুঝিয়ে দিল অরূপের রিমোট আর মমতার হাত নেই।

নাম মুছল ‘বালু’কা বেলায়!

গাইঘাটার বালুর সঙ্গে মমতার যোগ যুব কংগ্রেস পর্ব থেকে। তৃণমূল তৈরির সময় থেকে বালু ছিলেন গোটা উত্তর ২৪ পরগনায় ‘দিদির দূত’, মমতার চোখ এবং কান। তিনিই মমতাকে মতুয়া রাজনীতির গর্ভগৃহে প্রবেশ করিয়েছিলেন। জেলে যাওয়ার পরেও তাঁকে মন্ত্রিসভায় রেখে দিয়েছিলেন মমতা, পরে বাদ দেন ‘প্রভাবশালী তকমা এড়াতে। এ হেন বালুকে ৫ জুনের রদবদলে দলের জাতীয় কর্মসমিতিতে রেখেছিলেন মমতা। শুক্রবার তিনি বিদায় নিলেন। কোন ঢেউ এসে বালুর নাম মুছে দিল বোঝা কঠিন নয়।

নিভল প্রদীপ

দীর্ঘ দিন ধরেই মমতার সঙ্গে রয়েছেন ছিলেন খড়গপুরের প্রদীপ সরকার। ২০১৯ সালে খড়গপুর সদরে দিলীপ ঘোষের ছেড়ে যাওয়া আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী হয়ে জিতেছিলেন। সেই জয়ের নেপথ্য কারিগর ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী! গত মঙ্গলবার জেলাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টনের সময় প্রদীপকে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা তৃণমূলের সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন মমতা। পরের দিনই দলকে চিঠি লিখে প্রদীপ জানিয়ে দিয়েছেন এই দায়িত্ব পালনে তিনি অপারগ।

অস্তাচলে রবি

পূর্ব বর্ধমানের দুই নেতা গত দুই দশক ধরে মমতার আস্থাভাজন— রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় এবং স্বপন দেবনাথ। সিঙ্গুর আন্দোলনের সময়ে মমতা যখন দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের পাশে টানা ধর্নায় বসেছিলেন, সেই পর্বে বর্ধমান থেকে পালা করে লোকলস্কর পাঠানোর ভার নিয়েছিলেন রবি। সেই সাংগঠনিক জোরই মমতার খাতায় তাঁর নম্বর বাড়িয়ে দিয়েছিল। একে একে সবাই যখন তাঁকে ছেড়ে যাচ্ছে, তখন ভরসা করে রবিকে পূর্ব বর্ধমান জেলা সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন মমতা। পদ ফিরিয়ে রবি বুঝিয়ে দিলেন, তিনিও আর মমতার সঙ্গে নেই।

মানসের মন বদল

কংগ্রেসে তিনি যখন কোণঠাসা, তখন তাঁকে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির চেয়ারম্যান করেছিলেন মমতা, আব্দুল মান্নানদের আপত্তি গ্রাহ্য না করে। তার পর জোড়া খুনের মামলায় নাম জড়ায় মানসের। দল ছেড়ে তৃণমূলের যোগ দিতেই হইচই বন্ধ হয়ে যায় সেই মামলা ঘিরে। মানসকে প্রথম রাজ্যসভায় পাঠান মমতা, তার পর রাজ্যের মন্ত্রী। এ বারের ভোটে খাসতালুক সবংয়ে হেরে মন ভেঙে গিয়েছে মানসের। মমতাকে ত্যাগ দিয়েছেন, রাজনীতিকে নয়।

সংসদে ‘ভূতনির চর’

গঙ্গা ভাঙনের কবলে পড়ে মালদহের ভূতনির চর বিপন্ন, তার চেয়েও করুণ দশা তৃণমূলের সংসদীয় দলের। ২০ জন সাংসদ তৃণমূল থেকে বেরিয়ে মিশে গিয়েছেন নতুন দল এনসিপিআই-তে। যাঁরা গিয়েছেন, তাঁদের অধিকাংশের সঙ্গেই মমতার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। যেমন, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। মাঝে তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়েছিল মমতার, দল ছেড়েছিলেন। আবার ফিরে এসে সাংসদ হয়েছেন। সুদীপের স্ত্রী নয়নাকে বিধায়ক করে সুসম্পর্কের প্রতিদান দিয়েছেন মমতা। শেষ মুহূর্তে সুদীপ কী ভাবে বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখালেন, তৃণমূলের অনেকের কাছে সেটা এখনও বিস্ময়।

একই কথা খাটে কাকলি ঘোষ দস্তিদার সম্পর্কে। মমতার সঙ্গে তাঁর চার দশকের যোগাযোগের কথা নিজেই বলেছেন কাকলি। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যখন দলের ঝামেলা, তখন কাকলিকে সংসদীয় দলের মুখ্যসচেতক করেছিলেন মমতা। আর এখন কাকলি তো দল ছেড়েইছেন, বিয়েতে দেওয়া মমতার উপহারও ফিরিয়ে দিচ্ছেন কাকলির ছেলে!

Mamata Banerjee TMC Inner Conflict FirhadHakim Jyotipriya Mallick West Bengal Politics
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy