ধার করে ঘি খাওয়ার নীতিতে বিজেপি সরকার যে চলবে না, তা গত এক মাসেই বুঝিয়ে দিয়েছে নবান্ন। সেই সরকারের হাত দিয়েই আজ, সোমবার পেশ হতে চলেছে চলতি আর্থিক বছরের (২০২৬-২৭) পূর্ণাঙ্গ বাজেট। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, ঋণের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার যেমন চেষ্টা চলবে, তেমনই ফাঁকফোকর গলে অযথা রাজস্ব লোকসান ঠেকিয়ে নিজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্যও থাকবে। অগ্রাধিকারের প্রশ্নে শিল্প-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-পরিকাঠামোর মতো বেশ কিছু ক্ষেত্রের উপরে জোর পড়তে পারে। কেন্দ্রীয় আর্থিক সহযোগিতা (বিশেষ প্যাকেজ), কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা নিয়ে দফতর-ভিত্তিক নিজস্ব অতিরিক্ত খরচের বোঝা লাঘবে নজর রাখা হতে পারে। তবে সরকারি কর্মচারী মহলের বিশেষ আগ্রহ থাকবে ডিএঘোষণা নিয়েই।
যখন বিজেপি সরকার তাদের প্রথম বাজেট পেশ করতে চলেছে, তখন রাজ্যের ঘাড়ে পুঞ্জীভূত ধারের বোঝা প্রায় ৮.১৫ লক্ষ কোটি টাকা (ভোটের আগে অন্তর্বর্তী বাজেটের অনুমান অনুযায়ী)। রাজ্যের অভ্যন্তরীণ গড় উৎপাদনের (জিএসডিপি) নিরিখে তা প্রায় ৪০%। অর্থকর্তাদের অনেকের মতে, দেশের অন্য বড় রাজ্যগুলিতে ধারের বোঝা থাকলেও, জিএসডিপি-র নিরিখে তার শতাংশের হার এতটা নয়। ফলে সুদে-আসলে এ রাজ্যের ধার শোধের পরিমাণ ছুঁতে চলেছে বছরে ১ লক্ষ কোটি টাকায়। সমান্তরালে সঙ্কুচিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব আয়ের পথগুলি। তাই প্রতি বছরই ধারের সঙ্গে লাফিয়ে বেড়েছে রাজস্ব এবং রাজকোষ ঘাটতি। সে কারণে বিগত সরকারের আমলে গত বেশ কয়েক বছরে বাজেট বরাদ্দের মধ্যে একটা ক্ষুদ্র অংশই খরচের অনুমতি পেয়েছিল বেশির ভাগ দফতর। ফলে অনুদান খাতে তখনকার সরকার দরাজ থাকলেও, শিল্প, শিক্ষা, পরিকাঠামোর মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলি তুলনায় অবহেলিত ছিল।
এক কর্তার কথায়, “ঋণ করা খারাপ নয়। কিন্তু তা মূলধনী বা স্থায়ী সম্পদ তৈরিতে ব্যবহার হলে অর্থনীতি মজবুত হয়, বাড়ে কর্মসংস্থান। বিগত সরকারের আমলে নতুন ঋণের একটা অংশ চলে যেত ধার শোধ করতেই। এটা ইতিবাচক অর্থব্যবস্থারলক্ষণ নয়।”
সরকার গড়েই গত এক মাসের মধ্যে সব কেন্দ্রীয় প্রকল্প চালু করার কথা ঘোষণা করেছিল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। ঘটনাচক্রে, প্রতিটি দফতরেই কেন্দ্রের কিছু না কিছু প্রকল্পের বরাদ্দ পাওয়া সম্ভব। সেগুলি গ্রহণ করে রাজ্যের ভাগ কমিয়ে রাজস্ব খরচে খানিকটা রাশ টানতে চাইবে নবান্ন। অর্থকর্তাদের উদাহরণ— সংখ্যালঘু দফতরের বাজেট আচমকা লাফিয়ে বেড়েছিল। কারণ, আগে কেন্দ্রের ‘ন্যাশনাল স্কলারশিপ পোর্টাল’ (এনএসপি)-এ নবম শ্রেণি থেকে পড়ুয়াদের ১০০০ টাকা করে বৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। এমন উপভোক্তার সংখ্যা ছিল প্রায় ন’লক্ষ। বিগত সরকার কেন্দ্রের সেই প্রকল্প বন্ধ করে নিজেরা তা চালু করে প্রথম শ্রেণি থেকে। কমবেশি ৪০ লক্ষ উপভোক্তাকে ১১০০ টাকা করে দেওয়া শুরু হয়। ফলে বিপুল বরাদ্দের বোঝা চাপে রাজ্যের ঘাড়ে। সংশ্লিষ্ট দফতর সূত্রের খবর, এখন কেন্দ্রের প্রকল্পেই ফিরবে নবান্ন। ফলে সেই বরাদ্দের পুরোটা বহন করবে কেন্দ্র। অতিরিক্ত পুরো অর্থটা রাজ্যের হাতে থেকে যাবে। একই ভাবে সংখ্যালঘু উন্নয়নে কেন্দ্রের ‘পিএমজেভিকে’ প্রকল্প কার্যকর করবে রাজ্য। তাতে কেন্দ্রের ৬০% বরাদ্দ থাকবে। রাজ্যকে দিতে হবে শুধুমাত্র ৪০% অর্থ। এতে কমবেশি ৫০০০ কোটি টাকা বাঁচানো সম্ভব বলে মনে করছেন আধিকারিকেরা। এক কর্তার কথায়, “আগের সরকার কেন্দ্রের কোনও প্রকল্প না নেওয়ায় ১০০% টাকা নিজেদেরই খরচ করতে হত। কিন্তু এখনকার সরকার কেন্দ্রের সব প্রকল্পের সুবিধা নেওয়ায় অন্তত ৫০% বরাদ্দ পাবে দিল্লির থেকে। সেই পরিমাণ অর্থ প্রকল্পপিছু বাঁচিয়ে ফেলতে পারবে রাজ্য। এই নীতি সব দফতরের জন্যই প্রযোজ্য।”
ভোটের প্রচারেই বিজেপি ঘোষণা করেছিল, বকেয়া ডিএ দেওয়া হবে। কার্যকর হবে সপ্তম বেতন কমিশন। অনুদান-প্রকল্পগুলির সবই চালিয়ে যাবে সরকার। লক্ষ্মীর ভান্ডারের বদলে অন্নপূর্ণা যোজনার বরাদ্দ দ্বিগুণ হয়েছে। সরকারি শূন্য পদে নিয়োগ থেকে পঞ্চম বেতন কমিশনের বকেয়া ডিএ মেটানোর দায়ও রয়েছে বর্তমান সরকারের উপর। আবার ষষ্ঠ বেতন কমিশনের আওতায় এখনকার ডিএ ঘোষণা নিয়েও আগ্রহ-প্রত্যাশার পারদ ক্রমশ চড়ছে। সব মিলিয়ে রাজ্যের খরচও নেহাত কম নয়। আধিকারিকদের একাংশ জানাচ্ছেন, কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধায় দফতর-ভিত্তিক খরচের একটা বড় অংশ বাঁচানো গেলে তা এ সব কাজে ব্যবহার করা যায়। তা ছাড়া অনুদান প্রকল্পগুলিতে সরকার আয়ের মানদণ্ডে প্রকৃত উপভোক্তা বাছাই করছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের পরে তা থেকে পুরোপুরি বাদ যাওয়া ব্যক্তিদেরও তালিকাবদ্ধ করা হচ্ছে না। এতে সেই খরচের সাশ্রয়ও ক্রমশ বাড়ছে। এক আধিকারিক বলেন, “অর্থনীতির নিয়ম— টাকা তাঁকেই দেওয়া দরকার, যাঁর তা প্রকৃত অর্থেই প্রয়োজন। তবে সেই ব্যক্তির দিন গুজরান হবে এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাকাটা বাড়লে গড়াবে অর্থনীতির চাকা। আগের সরকারের কাছে আর্থিক মানদণ্ড কিছু না থাকায় অযথা খরচ অনেক বেড়েছিল।”
অর্থ-কর্তাদের মতে, নতুন সরকার শিল্পায়ন-পরিকাঠামোর উপরে বাড়তি জোর দেবে। সড়ক-সেতু-নদীপথ ইত্যাদিতে বরাদ্দ বাড়তে পারে উল্লেখযোগ্য হারে। নতুন বিনিয়োগ টানতে ভারী, মাঝারি, উৎপাদন, গাড়ি, বিদ্যুৎ, বিমানবন্দর, শিল্পনগরী, ক্ষুদ্র-ছোট-মাঝারি শিল্পক্ষেত্রের উপর পৃথক ভাবে জোর পড়তে পারে। বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ বাড়াতে শিল্পনীতি তথা শিল্পের উৎসাহ ভাতা সংক্রান্ত ইতিবাচক কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারে নবান্ন। জমির জোগান অবাধ রাখার বিষয়টিও নজরে রাখতে পারে সরকার।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)