×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৩ জুন ২০২১ ই-পেপার

এ দেশেও ছিল নাশকতার ছক, জানাল হাকিম

সুরবেক বিশ্বাস
কলকাতা ১৬ অক্টোবর ২০১৪ ০৩:২৭

এক খাগড়াগড় বিস্ফোরণই পর পর খুলে দিচ্ছে জঙ্গি নেটওয়ার্ক ও নাশকতার ছকের বহু পর্দা। পশ্চিমবঙ্গের চারটি জেলা নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও বর্ধমানের বিভিন্ন গোপন গুদামে অসংখ্য আইইডি (ইম্প্রোভাইজ্ড এক্লপ্লোসিভ ডিভাইস) মজুত করা আছে বলে জেনেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। গোয়েন্দাদের বক্তব্য, ভারত ও বাংলাদেশ, দু’দেশেই নাশকতার লক্ষ্যে ওই সব মারণাস্ত্র তৈরি করা হয়েছে। এনআইএ-র দাবি, খাগড়াগড় বিস্ফোরণে জখম, এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি আব্দুল হাকিম ওরফে হাসানকে সোমবার থেকে দফায় দফায় জেরা করে মিলেছে ওই তথ্য। বুধবারও হাসপাতালে গিয়ে হাকিমকে দু’ঘণ্টা জেরা করেন এনআইএ গোয়েন্দারা।

গোয়েন্দাদের দাবি, বছর তেইশের হাকিম ভারতীয় জঙ্গি সংগঠন জমিয়ত-উল-মুজাহিদিন-এর সদস্য। এ দেশে যে ৩৬টি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের তালিকা এনআইএ তৈরি করেছে, তার ২৭ নম্বরে রয়েছে জমিয়ত-উল-মুজাহিদিন। ১৯৯০ সালে হিজবুল মুজাহিদিন ভেঙে কাশ্মীরে ওই সংগঠন তৈরি হয়। ওই সংগঠনের সদস্য হিসেবে হাকিম নিজে তিন বছর ধরে আইইডি তৈরি করছিল। খাগড়াগড়ে তৈরি আইইডি-র একটা বড় অংশ ভারতে নাশকতার কাজে ব্যবহার করার পরিকল্পনা তাদের ছিল বলে সে জেরায় কবুল করেছে।

হাকিম এখন সুস্থ, বোমার স্প্লিন্টার পা থেকে বের করে দেওয়ার পর এখন তাকে ভর্তি রাখার আর দরকার নেই বলে এনআইএ-কে জানিয়েছেন এসএসকেএম কর্তৃপক্ষ। হাসপাতাল কর্তাদের কেউ কেউ গোয়েন্দাদের জানিয়েছেন, হাকিম এসএসকেএমে থাকলে গোটা হাসপাতালেরই নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। খাগড়াগড় বিস্ফোরণের একমাত্র জীবিত প্রত্যক্ষদর্শী হাকিম। সে বীরভূমের মহম্মদবাজারের দেউচা গ্রামে বহু বছর থাকলেও জন্ম মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরে। হাকিমের নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয়েছে জনা পঁচিশ বন্দুকধারী পুলিশ। আজ, বৃহস্পতিবার হাকিমকে ছাড়তে চাইছেন এসএসকেএম কর্তৃপক্ষ। তা সম্ভব কি না, দেখছে এনআইএ।

Advertisement

গোয়েন্দা সূত্রের খবর, জেরায় হাকিম জানিয়েছে, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও বর্ধমান এই চার জেলায় শ’য়ে শ’য়ে আইইডি মজুত করে রাখা আছে বিভিন্ন গোপন গুদামে। প্রতি জেলায় ওই রকম একাধিক গুদাম রয়েছে বলে হাকিমের বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পেয়েছেন গোয়েন্দারা। আর সেগুলিতে তল্লাশি চালাতে গিয়ে যাতে কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে, এ জন্যই এই ব্যাপারে সিদ্ধহস্ত এনএসজি (ন্যাশনাল সিকিওরিটি গার্ড)-র সহায়তা চেয়েছে এনআইএ। গত বছর পটনার গাঁধী ময়দানে নরেন্দ্র মোদীর সভায় ধারাবাহিক বিস্ফোরণের পর এনএসজি গিয়ে তিনটি আইইডি খুঁজে বের করে সেগুলি নিষ্ক্রিয় করেছিল।



তবে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের বক্তব্য, জেরায় হাকিম দাবি করেছে, খাগড়াগড়ে হাসান চৌধুরীর বাড়ির দোতলায় অস্ত্র ও বিস্ফোরকের গবেষণাগার বা কারখানার মতো ডেরা রাজ্যে ওই একটিই ছিল। তার আগে ওই রকম গবেষণাগার মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় ছিল এবং অন্তত তিন বছর সেখানে আইইডি তৈরির পর তা সরানো হয়েছিল খাগড়াগড়ে।

এনআইএ-র বক্তব্য, বিস্ফোরণের ঠিক আগে শাকিল আহমেদ ও সুবহান শেখের সঙ্গে হাত মিলিয়েই হাকিম খাগড়াগড়ে হাসান চৌধুরীর বাড়ির দোতলায় বসে আইইডি তৈরি করছিল। তবে গোয়েন্দাদের বক্তব্য, শাকিল ও সুবহান বাংলাদেশেরই জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর সদস্য। এনআইএ-র ধারণা, জেএমবি বাংলাদেশে যে রকম জেহাদি কার্যকলাপ করে, তেমনই নাশকতা হাকিম ও তার দলবল ভারতেও ঘটানোর চেষ্টা করছিল।

কিন্তু এত বছর ধরে অসংখ্য আইইডি তৈরি করা হলেও এ দেশে ওই চক্রটি নাশকতা ঘটাল না কেন?

এক অফিসারের কথায়, “চক্রটি খুব বড় মাপের নাশকতা ঘটানোর পরিকল্পনায় ছিল, যা হয়তো আমাদের আন্দাজের বাইরে।” চক্রটি ধরা পড়লে বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা।

খাগড়াগড় বিস্ফোরণে নিহত, বছর ছাব্বিশের সুবহান মণ্ডলের প্রাথমিক পরিচয়ও হাকিমের কাছ থেকে জেনেছেন গোয়েন্দারা। ২ অক্টোবর, মৃত্যুর কিছু ক্ষণ আগে মুমূর্ষু ওই যুবক পুলিশকে জানিয়েছিল, তার নাম স্বপন মণ্ডল ও বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের উত্তরপাড়ায়। আর হাকিম জানিয়েছে, নিহত ওই যুবকের আসল নাম সুবহান শেখ, সে বাংলাদেশের নাগরিক ও শাকিল আহমেদের আত্মীয়। এনআইএ-র এক কর্তার বক্তব্য, শাকিলের মোবাইল থেকেই কাশ্মীরে জমিয়ত-উল-মুজাহিদিন-এর কাউকে ফোন করা হয়েছিল। সংগঠনটি কাশ্মীরে বহু নাশকতার সঙ্গে জড়িত।

Advertisement