সত্যের দুর্দৈবের দিনে খাঁটি সাংবাদিকতায় আস্থা ফেরানোর এক প্রধান সৈনিক তিনি। ভুয়ো খবর শনাক্ত করার কাজটা দীর্ঘ দিনই করছেন অল্ট নিউজ়ের অন্যতম কর্ণধার মহম্মদ জ়ুবের। তবে এই যুদ্ধ-যুদ্ধ আবহেই ওঁর অবদানের গুরুত্ব অনেকে তীব্র ভাবে টের পাচ্ছেন।
সমাজমাধ্যম থেকে কিছু বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমে ভুয়ো খবর, ভুয়ো ছবি, বিকৃত খবর চিনিয়ে এ যাবৎ কোনও কোনও তথাকথিত ‘দেশভক্ত’-এর চক্ষুশূলই হয়েছিলেন চল্লিশোর্ধ্ব জ়ুবের। কিন্তু এ বার পাকিস্তানি শিবিরের ভুয়ো তথ্যের মিসাইল রোধে সেই জ়ুবেরকেই ভারতের হয়ে কার্যত সবার আগে ব্যাট ধরতে দেখা গিয়েছে। গত মঙ্গলবার গভীর রাতে পাকিস্তান ও পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের কিছু জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্য করে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর প্রত্যাঘাতের পরেই পাকিস্তানের হয়ে আসরে নামে এক্স হ্যান্ডলের বেশ কিছু রহস্যজনক প্রোফাইল। ভারতের অবসরপ্রাপ্ত নৌ সেনানি, ‘গর্বিত ভারতীয়’ বা ‘কট্টর কংগ্রেস সমর্থক’ গোছের তকমাধারী ভারতীয় নামের কয়েকটি প্রোফাইল পাক হামলায় ভারতের বিপন্নতার ভুয়ো তথ্য পোস্ট করতে থাকে। রবিবার বিকেলে বেঙ্গালুরুবাসী জ়ুবের বলছিলেন, ‘‘সে দিন রাত জেগে আমি অন্তত ১৫০-২০০ টুইট, কো-টুইট করেছি বা টুইটে মিথ্যাচারের জবাব দিয়েছি। ভারতের রাফালের পতন থেকে অমুক সেনাঘাঁটিতে হামলার ডাহা মিথ্যা খবর ওই সময়ে পাকিস্তানিদের তরফে নেটমাধ্যমে ছড়ানোর চেষ্টা চলছিল।’’
পাকিস্তানে এক্স হ্যান্ডল এমনিতে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু পহেলগাম হামলার পরে ভারতীয় প্রত্যাঘাতের সময়ে তা সক্রিয় হতে দেখা যায়। জ়ুবেরের বক্তব্য, ‘‘ভুয়ো তথ্য বর্ষণ বা অপপ্রচারের লক্ষ্যেই পাকিস্তানে এক্স হ্যান্ডল খোলে, মনে করার কারণ আছে। তদন্তে ভারতীয় পরিচয়ের ভেকধারী ওই প্রোফাইলগুলি আমরা চিহ্নিত করে সম্প্রতি তালিকা প্রকাশ করেছি। তবে দেশ, ধর্ম নির্বিশেষে যে কোনও ভুয়ো তথ্যই আমরা লাগাতার ফাঁস করে গিয়েছি। পরে ভারতীয়দের দিক থেকেও নানা ভুয়ো তথ্য ছড়ানো হয়েছে।’’
দুই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু, প্রবাসী বাঙালি প্রতীক সিংহ এবং জ়ুবের মিলে ২০১৭ নাগাদ অল্ট নিউজ়ের মাধ্যমে এই ভুয়ো খবর-বিরোধী অভিযান শুরু করেন। এর আগে এ দেশের গেরুয়া-শিবিরের তোপে বিস্তর হেনস্থা হয়েছেন জ়ুবের। একটি পুরনো সিনেমার দৃশ্য নিয়ে চুটকির মিম পোস্ট করে এক মাসের কাছাকাছি জেলেও যেতে হয়েছিল জ়ুবেরকে। ‘দেশদ্রোহী’ তকমায় তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আনা হলেও চার্জশিটে এখনও নাম ওঠেনি। সেই জ়ুবেরকেই এখন এক্স হ্যান্ডলে রীতিমতো কুর্নিশ করছেন গেরুয়া দেশভক্তরাও। জু়বের বলছেন, ‘‘আমরা কিন্তু বরাবর দেশের যে কোনও রাজনৈতিক শিবিরের তরফে ভুয়ো প্রচারেরই বিরোধিতা করেছি।’’
এ যাত্রা দেখা গিয়েছে, পাকিস্তানি শিবির গাজ়া, বেইরুট, ইন্দোনেশিয়ার বিস্ফোরণের ছবি বা একটি ইজ়রায়েলি ভিডিয়ো গেমের ছবি ভারতের ঘটনা বলে মেলে ধরে। বেঙ্গালুরু, রাজস্থানে ভারতীয় যুদ্ধবিমানের তালিমকালীন দুর্ঘটনার ছবি পাকিস্তানের সাফল্য বলে প্রচার করা হয়। ভারতের কর্নেল সোফিয়া কুরেশি বা উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিংহের এক্স প্রোফাইলেরও নীল দাগখচিত ভুয়ো সংস্করণ বেরিয়েছে। আবার পাকিস্তানে নানা জায়গায় বিস্ফোরণের ভুয়ো ছবি ভারতীয়দের দিক থেকেও প্রচার হয়। সরকারি দফতর পিআইবি-ও ভুয়ো খবর চেনায়। তবে অল্ট নিউজ় মিথ্যাচারের খুঁটিনাটি ফাঁস করে। বুম লাইভ, কুইন্ট ফ্যাক্টচেক, ফ্যাক্টলি, নিউজ় চেকার প্রমুখও খবরের সত্যান্বেষণে ব্রতী।
সত্যান্বেষী জ়ুবেরের মতে, ‘‘ভুয়ো খবর নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে। কিন্তু নানা ডিজিটাল পরিসরে শেয়ার বাড়লে টাকা রোজগারের সুযোগ মানুষকে অপপ্রচারের লোভও দেখাচ্ছে। অনেকেই ওই খবরে ঠকে যান। ভারতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলই ৯০ শতাংশ ভুয়ো খবর প্রচার করে।’’ গঞ্জনা বা প্রশংসা যাই আসুক, সত্য চেনানোর কাজটা করে যেতে চান তাঁরা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)