E-Paper

বিরোধীদের অস্ত্র ‘অনুন্নয়ন’, প্রিয়া মানতে নারাজ

সাঁকরাইল কেন্দ্রের আবাদা স্টেশন সংলগ্ন পুকুরপাড়ার বাসিন্দাদের এই বক্তব্যই কার্যত এই বিধানসভার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ছবিকে বেআব্রু করে দিয়েছে।

দেবাশিস দাশ, অরিন্দম বসু

শেষ আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১০:২৭
আগাছায় ভরেছে জরি হাব।

আগাছায় ভরেছে জরি হাব। ছবি: দীপঙ্কর মজুমদার।

এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে প্রধানমন্ত্রী গ্রামীণ সড়ক প্রকল্পের ঢালাই রাস্তা। পাশে সার দেওয়া ছিটেবেড়ার টালির চালের ঝুপড়ি। গ্রাম জুড়ে কোথাও ঘাড় কাত করে পড়ে রয়েছে চাপাকল, কোথাও কলের অবশিষ্টাংশ। মানুষকে এখনও এখানে শৌচকর্ম সারতে হচ্ছে বনে-বাদাড়ে। পানীয় জল আনতে যেতে হয় কয়েক কিলোমিটার দুরে।

সুজাতা পাত্র, রেণুকা হাজরা, প্রমীলা পাত্রের মতো গ্রামবাসীরা বলছেন, ‘‘গত পাঁচ বছরে লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা ছাড়া আর কিছু পাইনি। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় বাড়ি হয়নি, পানীয় জল আনতে যেতে হয় পাশের গ্রামে। রাস্তার পাশে একটি গুমটি বসাতে গেলেও শাসক দলকে মোটা টাকা দিতে হয়।’’

সাঁকরাইল কেন্দ্রের আবাদা স্টেশন সংলগ্ন পুকুরপাড়ার বাসিন্দাদের এই বক্তব্যই কার্যত এই বিধানসভার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ছবিকে বেআব্রু করে দিয়েছে। একই অভিযোগ শোনা গিয়েছে দক্ষিণ সাঁকরাইল, ধূলাগড়ি, কান্দুয়া, মাশিলা, আন্দুলের বিস্তীর্ণ এলাকায়। ভোটে সেটাই বিরোধীদের প্রচারের অস্ত্র হয়ে উঠেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, পাঁচ বছরে বিধায়িকা প্রিয়া পালের কাজকর্মে মানুষ ক্ষুব্ধ। এলাকায় নতুন কোনও হাসপাতাল, শিল্প হওয়া দূর, হাজি এসটি মল্লিক বা মহিয়াড়ি লক্ষ্মীকমল হাসপাতালের কোনও উন্নতি হয়নি। ডেল্টা জুটমিল, ন্যাশনাল জুটমিল বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। মুম্বই রোডের পাশে বেসরকারি কারখানা শাসক দলের তোলাবাজির জন্য। হয় স্থানান্তরিত হয়েছে, নয় শিকেয় উঠেছে।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, পাঁচ বছরে উন্নয়ন কিছু হয়নি, তবে তোলাবাজি সংস্কৃতি বেড়েছে। মানিকপুরে ১২০০ কোটি টাকার জলপ্রকল্পের কাজ আজ পর্যন্ত শেষ হয়নি। মুখ্যমন্ত্রীর সাধের ‘জরি হাব’ প্রায় বন্ধের মুখে।

অভিযোগ মানেননি তৃণমূল প্রার্থী প্রিয়া পাল। গত বিধানসভা নির্বাচনে তফসিলি জাতিদের জন্য সংরক্ষিত এই আসনে প্রার্থী হয়ে তিনি বিজেপি প্রার্থীকে ৪০ হাজার ৪২৭ ভোটে হারান। পঞ্চায়েত নির্বাচনে জেলা পরিষদের পাঁচটি আসন এবং পঞ্চায়েত সমিতির অধিকাংশ আসন দখলে রাখে তৃণমূল। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল এই কেন্দ্রে ৪২ হাজার ৬২০ ভোটে এগিয়ে যায়।

এ বার সাঁকরাইলের কয়েকটি জায়গা ছাড়া পথের দু’ধারে প্রিয়ার হয়ে দেওয়াল লিখন বা ব্যানার-ফেস্টুন সে ভাবে চোখে পড়ছে না। দলের একাংশের দাবি, বিদায়ী বিধায়িকা ফের প্রার্থী হওয়ায় দলের একাংশ মেনে নেয়নি। প্রিয়া অবশ্য দাবি করছেন, ‘‘২০২১-এ যখন প্রার্থী হই, তখন মানুষ আমার সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। এখন সব জানেন। জানেন, পাঁচ বছর ধরে আমি নানা উন্নয়ন করেছি। এ বারেও জয়ের ব্যবধানে কোনও তফাত হবে না।’’ তাঁর প্রার্থী হওয়া নিয়ে দলীয় কর্মীদের একাংশের কোনও অসন্তোষের কথা তিনি মানতে চাননি।

শুরুতে দলীয় কর্মীদের অসন্তোষ ছিল বিজেপি প্রার্থী বর্ণালি ঢালি নস্করকে নিয়েও। রাজ্য নেতৃত্বের হস্তক্ষেপে তা কেটে যাওয়ার পর প্রচারে নেমেছেন প্রার্থী। বর্ণালির দাবি, ‘‘ভোটে জিতে সাঁকরাইল জুড়ে তোলাবাজি-সংস্কৃতি বন্ধ করব। পানীয় জল, বেহাল নিকাশির উন্নতি করা আমার প্রথম কাজ। এ ছাড়া বেপরোয়া তোলাবাজির জন্য ছাড়া কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা উঠে যাচ্ছে। সেটাও বন্ধকরতে হবে।’’

সিপিএম প্রার্থী সমীর মালিক বলছেন, ‘‘এলাকার অনুন্নয়ন ছাড়াও গত পঞ্চায়েত নির্বাচনের ভোট গণনার সময়ে সিকম কলেজে পুলিশকে নিয়ে বর্তমান তৃণমূল প্রার্থী যে লুটপাট, মারধর করেছিলেন, তা মানুষ মনে রেখেছেন। তাই তৃণমূলকে মানুষ ভোট দেবে না।’’ কংগ্রেস প্রার্থী বেচুরাম মালিকের দাবি, ‘‘এসআইআরের কারণে বহু ভোটারের নাম বাদ যাওয়ায় সমস্যায় পড়বে শাসক দল। যার পরোক্ষ সুবিধা পাবে বিরোধীরা। ভোটে জিতে আমি প্রথমেই সাঁকরাইলের নিকাশি ব্যবস্থার হাল ফেরাব।’’

এই কেন্দ্রেও শাসক দলের চাপের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। এই কেন্দ্রে ৩৭ শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাস। এসআইআরের তিনটি পর্বে সব মিলিয়ে বাদ গিয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার নাম। যা গত বিধানসভা নির্বাচনে সাঁকরাইলে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধানের চেয়ে অনেক বেশি। যদিও এই সংখ্যাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ তৃণমূল প্রার্থী। তিনি বলেন, ‘‘এসআইআরই তৃণমূলকে এগিয়ে দিয়েছে।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

sankrail TMC BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy