শীতকালীন মাকালু শৃঙ্গ (৮৪৮৫ মিটার, পঞ্চম উচ্চতম) অভিযানে সামিট পুশের সময়ে হঠাৎ দেখা যায়, অক্সিজেন মাস্ক কাজ করছে না চন্দননগরের পর্বতারোহী পিয়ালি বসাকের। ফলে ক্যাম্প ৩ থেকে নেমে আসতে হয় তাঁকে। তার পরেই শীর্ষ ছুঁয়ে ফেরার সময়ে জোড়া দুর্ঘটনার মুখে পড়ে তাঁর দল। এক শেরপার পড়ে যাওয়া ও ইরানি পর্বতারোহী নিখোঁজ হওয়ার পরে তাঁদের উদ্ধারকারী দলের সঙ্গেও এখনও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। এত কিছুর পরেও দমছেন না প্রাথমিক স্কুলশিক্ষিকা পিয়ালি। তাঁর কথায়, ‘‘নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে এসেছি। খেটে খাওয়া মানুষ, মেয়েদের প্রতিনিধিত্ব করছি। স্পনসর পাইনি। বিপুল পরিমাণ ব্যাঙ্ক ঋণ নিয়ে অভিযানে এসেছি। তাই এত কিছুর পরেও সামিটের দিকে এগোনোর কথা ভাবছি। তবে জানি না, কী হবে। কারণ, তাপমাত্রা আরও কমছে।’’
রবিবার কণ্ঠ স্বর-বার্তায় পিয়ালি জানিয়েছেন, আপাতত অ্যাডভান্সড বেসক্যাম্পে নেমে এসেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘বুধবার ক্যাম্প ৩ থেকে সামিট পুশের সময়ে দেখি, আমার অক্সিজেন মাস্ক কাজ করছে না। সানু শেরপাজি আমায় নীচে পাঠিয়ে দেন। কথা ছিল, ওঁরা সামিট করে নেমে এলে সেই মাস্ক নিয়ে আমি সামিটেরদিকে এগোব।’’
কিন্তু তার আগেই, প্রায় ২৭ হাজার ফুট উচ্চতায় ঘটে জোড়া দুর্ঘটনা। গত বৃহস্পতিবার সকালে মাকালুর শীর্ষে পৌঁছন সানু শেরপা ও ইরানি আরোহী আবুফজল গোজালি। পিছনে ছিলেন অতি দক্ষ আরও দুই শেরপা— সানুর ভাই ফুরবা ওংগেল শেরপা ও লাকপা রিনজিং। নামার সময়ে সানু লক্ষ্য করেন, তাঁর ভাই সমস্যায় পড়েছেন। ফলে আবুফজলকে সেখানেই অপেক্ষা করতে বলে তিনি উপরে উঠে যান। কিন্তু তিনি পৌঁছনোর আগেই প্রায় ২৭০০০ ফুট উচ্চতা থেকে হাজার তিনেক ফুট নীচে পড়ে যান ভাই ফুরবা। এর পরে আগের জায়গায় নেমে এসে সানু দেখেন, নিখোঁজ আবুফজলও! হাতে ফ্রস্টবাইট নিয়ে নীচে নেমে আসেন রিনজিং। ইতিমধ্যেই ওই দু’জনের খোঁজে চার শেরপার উদ্ধারকারী দল উপরে গেলেও পিয়ালি জানাচ্ছেন, সেই দলের সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে।
২০২৩ সালে গ্রীষ্মকালীন সফল মাকালু অভিযান করেছেন পিয়ালি। এভারেস্ট-সহ ছ’টি আট হাজারি শৃঙ্গে সফল অভিযানের কৃতিত্বও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। কিন্তু তার সঙ্গে শীতকালীন এই অভিযানের বিরাট পার্থক্য। পিয়ালি জানিয়েছেন, শীতে মাকালুর বেসক্যাম্পেই ১০০ কিলোমিটার বেগে হাওয়া চলছে। মাইনাস ৫০-৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেসক্যাম্প পর্যন্ত পৌঁছনোটাই অত্যন্ত কঠিন। পিয়ালির কথায়, ‘‘৩০০০ ফুট উচ্চতায় বেসক্যাম্পেই আইস ভারগ্লাস দেখেছি। অর্থাৎ পাথরের উপরে কাচের মতো স্বচ্ছ বরফের স্তর, যার উপরে অসাবধানে পা পড়লেই সোজা খাদে। ট্রেকিং রুটেও ঝর্না জমে বরফ, যে কোনও মুহূর্তে বিপদের আশঙ্কা ছিল। তবে পর্বতারোহণে এক মূহূর্তের ভুলেরও কোনও ক্ষমা নেই। ফুরবা স্যরের দুর্ঘটনা সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)