পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের জেরে দেশের ও রাজ্যের অন্যান্য জায়গার মতো সঙ্কটে পড়েছে হাওড়া স্টেশন সংলগ্ন গঙ্গাতীরের পাইস হোটেলগুলি। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক এবং অবাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারের জোগানে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। যার জেরে বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে হাওড়া স্টেশন সংলগ্ন অধিকাংশ পাইস হোটেল। বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কয়লার উনুন অথবা কেরোসিন স্টোভের ব্যবস্থা করছেন কোনও কোনও হোটেল মালিক। কিন্তু অভিযোগ, তাতেও শুরু হয়েছে কালোবাজারি। যার জেরে লাফিয়ে বাড়ছে কেরোসিন ও কয়লার দাম। হোটেল মালিকদের বক্তব্য, এ ভাবে চললে হোটেল বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আর রাস্তা নেই।
পূর্ব রেলের গুরুত্বপূর্ণ প্রান্তিক স্টেশন হাওড়া দিয়ে প্রতিদিন কয়েক লক্ষ রেলযাত্রী যাতায়াত করেন। তাঁদের জন্যই স্টেশনের বাইরে গঙ্গার ধারে তৈরি হয়েছে অনেকগুলিছোট-বড় অস্থায়ী পাইস হোটেল। মাছ-ভাত, রুটি-তরকারি থেকে বিরিয়ানি, সবই পাওয়া যায় সেখানে। বহু নিত্যযাত্রীর প্রতিদিনেরখাওয়াদাওয়ার জায়গা এই পাইস হোটেল। সেই সঙ্গে বহু মানুষের রুজি-রুটিরও জায়গা সেগুলি। তাই পরিবেশ দূষণ বা গঙ্গা দূষণ ঠেকাতে আদালত এই পাইস হোটেলগুলি স্থানান্তরিত করার নির্দেশ দিলেও তা আজ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি।
কিন্তু বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের জেরে বাণিজ্যিক সিলিন্ডারের জোগান নিয়ন্ত্রিত হতেই মাথায় হাত পড়েছে এই হোটেল ব্যবসায়ীদের। গঙ্গাতীরের একটি পুরনো পাইস হোটেলের প্রবীণ কর্মী রথীন বসু বললেন, ‘‘আমাদের রান্না করতে প্রতিদিন দু’টি করে বাণিজ্যিক সিলিন্ডার লাগে। দু’-এক দিনের সিলিন্ডার মজুত আছে। এর পরে কী ভাবে রান্না হবে, ভেবে পাচ্ছি না। কারণ, সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।’’ রথীন জানালেন, গ্যাস সিলিন্ডার না পেলে কয়লার উনুন বাকেরোসিনের স্টোভে রান্না করার কথা তাঁরা ভেবেছিলেন। কিন্তু সেখানেও সমস্যা। কারণ, কয়লা আর কেরোসিনের ব্যাপক কালোবাজারি শুরু হয়েছে। কয়লার দামই কেজিতে ৩০-৪০ টাকা বেড়ে গিয়েছে। কেরোসিন বিক্রি হচ্ছে লিটার-প্রতি ১৩০ টাকা দরে।
হাওড়া স্টেশনের বাইরে গঙ্গাতীরের ফুটপাত জুড়ে শুধু মাছ-ভাতের হোটেল নয়, গজিয়ে উঠেছে চপ-মুড়ি, কচুরি, দোসার দোকানও। প্রতিটি দোকানেই রান্না হয় বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডারে। এখন প্রবল সমস্যায় পড়েছেন এই সব দোকানের মালিকেরা। তাঁদের বক্তব্য, বর্ধিত দামে বাণিজ্যিক সিলিন্ডার কিনে এই ছোট ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়। আর বর্তমানে কয়লা বা কেরোসিনের যা দাম উঠেছে, তাতে দোকান বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া কোনও পথ পাচ্ছেন না তাঁরা।
চপ-মুড়ির একটি দোকানের মালিক কৃষ্ণ দাস বললেন, ‘‘আমার একটি সিলিন্ডার আছে। এটা শেষ হলে আর গ্যাসে রান্না করব না। আজই একটি কেরোসিন স্টোভ কিনে আনব ভাবছি। কিন্তু কেরোসিনেরও যে ভাবে কালোবাজারি হচ্ছে, ক’দিন চালাতে পারব, জানি না।’’ একই কথা বলছেন হাওড়া স্টেশন চত্বরে থাকা ছোট-বড় হোটেলগুলির মালিক সন্দীপ জয়সওয়াল বা বাবলু প্রধান। সিলিন্ডারের অভাবে হোটেল ব্যবসা বন্ধ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরাও।
সনাতন মল্লিক নামে এক হোটেল মালিক জানালেন, বাণিজ্যিক এলপিজি সিলিন্ডার ছাড়া হোটেল চালানো প্রায় অসম্ভব। তিনি বলেন, ‘‘সকাল থেকে দৌড়ে বেড়াচ্ছি হোটেলের সিলিন্ডারের জন্য। কিন্তু কোথাও পাচ্ছি না। এ ভাবে চললে অনেক হোটেল, রেস্তরাঁ বন্ধ হয়ে যাবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)