ঝট করে স্বল্পপরিচিত কেউ যাতে চিনতে না পারেন, সে জন্য গোঁফ কামিয়ে ফেলেছিলেন। হুগলি ছেড়ে পালিয়েছিলেন কেরলে। পুলিশের দাবি, বিদেশে পালানোর পরিকল্পনা ছিল কোটি কোটি টাকা দুর্নীতিতে অভিযুক্ত আরামবাগ পুরসভার প্রাক্তন পুরপ্রধান স্বপন নন্দীর। আগেই পুরসভার নানা তথ্য নষ্ট করার চেষ্টা করেছেন তিনি। গ্রিন সিটি প্রকল্পের অর্থ নয়ছয়-সহ নানা দুর্নীতিতে অভিযুক্ত স্বপনকে মঙ্গলবার চুঁচুড়া আদালতে হাজির করানো হলে বিচারক তাঁকে ১৪ দিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেন।
পুলিশের দাবি, আরামবাগ পুরসভার পুরপ্রধান থাকাকালীন স্বপনের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ ওঠে। তার মধ্যে রয়েছে আরামবাগে গ্রিন সিটি প্রকল্পের সাত কোটি চল্লিশ লক্ষ টাকার দুর্নীতির মামলাও। ৪৪টি স্কুলে সোলার প্যানেল বসানোর কথা ছিল। ওই কাজের বরাত যাদের দেওয়া হয়েছিল, সেই সংস্থা ছিল এই কাজ করার অযোগ্য। টাকার বিনিময়ে তাদেরই বরাত পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল। তৃণমূল আমলে কেউ কেউ এই দুর্নীতির কথা জানলেও অভিযোগ করতে সাহস পাননি।
আরামবাগ পুরসভার বর্তমান চেয়ারম্যান সমীর ভান্ডারি গ্রিন সিটি প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ করার পর পুলিশ তদন্ত শুরু করেছিল। তদন্তকারীদের দাবি, বেশ কিছু তথ্য তাঁদের হাতে এসেছে। কেরল থেকে গ্রেফতারের পর স্বপনের মোবাইল বাজেয়াপ্ত হয়েছে। সেখান থেকে বেশ কিছু তথ্য মিলেছে। প্রাথমিক তদন্তের পর জানা গিয়েছে, কেরল হয়ে মালদ্বীপ পালানোর ছক কষেছিলেন স্বপন। তবে তার আগেই তিরুঅনন্তপুরমে পৌঁছে যায় রাজ্য পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল।
সংশ্লিষ্ট মামলার মুখ্য সরকারি আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘চেয়ারম্যান পদ চলে যাওয়ার পর সমস্ত তথ্য পুরসভার কম্পিউটার থেকে মুছে দিয়েছিলেন স্বপন নন্দী। যদিও তার অনেকটাই গুগল ক্লাউড থেকে উদ্ধার করা গিয়েছে। তদন্ত চলছে।’’
স্বপনকে রবিবার বিকেলে থানায় আনার সময় বিক্ষোভ দেখান বিজেপি নেতা-কর্মী থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা। এলোপাথাড়ি চড়-থাপ্পড় পড়ে গালে-ঘাড়ে-পিঠে। পুলিশের ঢাল হাতে নিয়ে দৌড়ে থানায় ঢুকতে গিয়ে একের পর এক কাঁচা ডিমের ঘায়ে সাদা রঙের জামা হলুদ হয়েছে। কালিও ছেঁটানো হয় প্রাক্তন পুরপ্রধানের গায়ে।
আরও পড়ুন:
আরামবাগের তৃণমূলের প্রাক্তন কাউন্সিলর গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়ের অভিযোগ, সমস্ত সরকারি প্রকল্পেই ‘ব্যাপক দুর্নীতি’ করেছিলেন স্বপন। তাঁরা ওই বিষয়ে একদা আরামবাগের তৎকালীন বিধায়ক এবং সাংসদের কানে তুলেছিলেন। কিন্তু দল (তৃণমূল) সব কিছু জেনেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন। গৌতমের কথায়, ‘‘বিজেপি ক্ষমতায় না এলে এই দুর্নীতির কোনও বিচার হত বলে মনে হয় না।’’ বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য স্বপন পাল বলেন, ‘‘তৃণমূল আর দুর্নীতি সমর্থক। চাল, ত্রিপল, চাকরি— সব কিছুই চুরি করেছে এরা। পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে মন্ত্রী, সকলে দুর্নীতিগ্রস্ত। তখন পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। এখন আইন আইনের পথে চলছে।’’
অন্য দিকে, স্বপন দাবি করেছেন, তাঁর সময়ে এলাকায় ঢালাও উন্নয়ন হয়েছে। আরামবাগে মেডিক্যাল কলেজ থেকে হেলিপ্যাড তৈরি, সব কিছুই তিনি পুরপ্রধান থাকাকালীন করেছেন। তাঁকে চক্রান্ত করে ফাঁসানো হয়েছে। তিনি বিদেশে পালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন, এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। স্বপনের দাবি, কেরলে গিয়েছিলেন চিকিৎসা করাতে।
দুর্নীতি দমন আইনে ধৃত স্বপনকে এখন হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে পুলিশ।