পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার তৈরির পঞ্চম সপ্তাহে প্রথম নাগরিক পরিষেবা সংক্রান্ত শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। কর্মসূচির নাম— জনকল্যাণ শিবির। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রতিটি নাগরিক যাতে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের সামাজিক প্রকল্পগুলির সুবিধা পান, সেটাই তাঁদের লক্ষ্য। সোমবার, ১৫ জুন থেকে বুধবার, ১৭ জুন পর্যন্ত এই প্রশাসনিক কর্মসূচি চলবে ব্লকে ব্লকে। সব মিলিয়ে ১১০০ জায়গায় শিবির হয়েছে। নন্দীগ্রামের রেয়াপাড়ায় জনকল্যাণ শিবিরের উদ্বোধন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। রাজ্যের অন্যান্য ব্লকে বিভিন্ন শিবিরে উপস্থিত থাকছেন রাজ্যের মন্ত্রী এবং বিজেপি বিধায়কেরা।
জনকল্যাণ শিবিরের লক্ষ্য মূলত তিনটি। এক, সরকারের নানা প্রকল্পের সুবিধা সাধারণ মানুষকে দেওয়া। দুই, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প নিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা এবং তিন, একই শিবিরে একাধিক প্রকল্পের ফর্ম পূরণ, নথিভুক্তিকরণ ও যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন করা। শুভেন্দুর সরকারের এই উদ্যোগে ৫৫ ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও নাগরিক পরিষেবা পাবেন মানুষ। কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের ফর্ম পাওয়া যাবে শিবিরগুলিতে। সেগুলি পূরণ করে জমা দেওয়া— প্রত্যেক ধাপে সাধারণ মানুষকে সাহায্য করবেন প্রশাসনিক আধিকারিক এবং কর্মীরা।
শিবিরের সুবিধা
১) অন্নপূর্ণা যোজনা, যুবশক্তি প্রকল্প, পিএম কিসান যোজনা, বিধবা ভাতা এবং বার্ধক্য ভাতার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলির জন্য নতুন করে নাম নথিভুক্ত করা যাবে।
২) ভোটার কার্ড, আধার কার্ড ইত্যাদি সরকারি পরিচয়পত্রে ভুল থাকলে সংশোধন করা যাবে।
৩) সরকারি প্রকল্পের পরিষেবা বা সুবিধা পেতে সমস্যার মুখে পড়েছেন কিংবা বার বার সরকারি অফিসে গিয়েও সমস্যার সমাধান হয়নি, এমন কোনও তথ্য বা অভিযোগ থাকলে সেটাও শিবিরে জানানো যাবে।
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা
সোমবার জনকল্যাণ শিবিরের সূচনায় নন্দীগ্রামের রেয়াপাড়ায় গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, এই কর্মসূচি এবং উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে বৃক্ষরোপণ। রাজ্যে ১ কোটি ১০ লক্ষ গাছ লাগানো হবে এ বছর। তার পরিচর্যার ব্যবস্থা হবে। ১৫ থেকে ১৭ জুন ১১০০ স্থানে এই শিবিরের আয়োজন হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের ৫৫টি প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধা এই শিবিরগুলি থেকে পাবেন রাজ্যবাসী। তাঁর কথায়, ‘‘এই শিবিরের সুযোগ সকলে নিন। আমি চাইব, একটি সঠিক তালিকা তৈরি হোক। যার ফলে রাজ্যের প্রান্তিক মানুষ যাতে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের সমস্ত সুযোগ পান।’’
নন্দীগ্রাম থেকে আবার লক্ষ্মীর ভান্ডার-সহ বিগত তৃণমূল সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে ভুয়ো অ্যাকাউন্ট খুলে সরকারি অর্থ নয়ছয়ের জন্য তোপ দাগেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘এ বার এই তালিকায় আপনাদের যা যা প্রয়োজন, তা পৌঁছে দেবে সরকার। যেখানে দুর্নীতি থাকবে না, প্রতারণা থাকবে না, কোনও মধ্যস্বত্বভোগী থাকবে না। আপনারা নাগরিক হিসাবে তার সুযোগ পাবেন।’’
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, একশো দিনের কাজে (প্রকল্পটি বর্তমানে ১২৫ দিনের) এ মাসেই ২০ দিনের জন্য ৭০০ কোটি টাকা দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। মোট ৮৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে ১২৫ দিনের কাজে। ৭৯ লক্ষ মহিলাকে লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে ৩০০০ টাকা দেওয়া হচ্ছে। ২০ জুলাই থেকে আবাস যোজনার সমীক্ষা হবে। যোগ্য কিন্তু বঞ্চিত হয়েছেন, এমন কেউ টোল ফ্রি নম্বরে যোগাযোগ করতে পারবেন।
শিবিরে অব্যবস্থা, অন্তর্ঘাতের অভিযোগ
জনকল্যাণ শিবিরে অব্যবস্থায় অন্তর্ঘাতের অভিযোগ খোদ উত্তরপাড়ার বিধায়কের। উত্তরপাড়া পুরসভার পুরপ্রধান এবং এগ্জ়িকিউটিভ অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন বিজেপি বিধায়ক দীপাঞ্জন চক্রবর্তী। উত্তরপাড়া পুরসভা এলাকায় মণীন্দ্র ভবনে জনকল্যাণ শিবিরের আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু নাগরিকদের জন্য পানীয় জলের বন্দোবস্ত হয়নি দেখে ক্ষিপ্ত হন বিধায়ক। তাঁর অভিযোগ, ‘‘উত্তরপাড়ার চেয়ারম্যান দিলীপ যাদব এবং এগ্জ়িকিউটিভ অফিসার ঠান্ডা মাথায় ভেবেচিন্তে অন্তর্ঘাত করেছেন। কোন্নগর পুরসভায় কিন্তু খুব সুন্দর ব্যবস্থা হয়েছে এবং এর থেকে অনেক বেশি মানুষ যাচ্ছেন সেখানে। অথচ এখানে যে কোনও মুহূর্তে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। পুরসভার চেয়ারম্যানের মোবাইল বন্ধ। বোঝাই যাচ্ছে, সবটা জেনেবুঝেই করেছেন তাঁরা।’’ দীপাঞ্জন জানিয়েছেন বিষয়টি তিনি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু এবং মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের কানে তুলবেন।
পুরুলিয়া শহরের এমএসএ ইন্ডোর স্টেডিয়ামে শিবিরে চড়া রোদ, তীব্র গরম উপেক্ষা করে প্রচুর মানুষকে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গিয়েছে। পুরুলিয়া-১ ব্লকের শিবিরেও একই অবস্থা। কিন্তু বিভিন্ন প্রকল্পের ফর্ম না পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন অনেকে। রাজ্যের রেশন কার্ড থাকায় আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পে আবেদন করতে না পেরে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন কয়েক জন। শিবিরে আসা মালতী মাহাতো বলেন, ‘‘চূড়ান্ত অব্যবস্থা। এত গরম উপেক্ষা করে অন্নপূর্ণা যোজনায় আবেদন করার জন্য এলাম। অথচ এখানে এসে জানতে পারছি অনলাইনে আবেদন করতে হবে। এমন হয়রানির কি দরকার ছিল!’’