Advertisement
E-Paper

জঙ্গল-আবর্জনাই নিশ্চিন্ত আস্তানা মশার

‘আইসোলেশন বিভাগে’ যাওয়ার পথে থমকাতে হল।একতলায় মেল মেডিসিন বিভাগে পাঁক ভর্তি নর্দমার পাশে ছয় ফুট লম্বা বড় বড় বুনো গাছ। বর্ষার জলে আড়ে-বহরে দিব্যি বেড়েছে। মাথায় ছাউনিওলা সরু বাঁধানো রাস্তার দু’ধারে এখন ঘন জঙ্গল। ডান দিকে মর্গের রাস্তা। তার বাঁয়ে বাড়িটার দেওয়ালে বড় করে লেখা ‘রান্নাঘর’।

গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১০ অগস্ট ২০১৬ ০২:০৮
এমনই হাল উত্তরপাড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতালের। ছবি: দীপঙ্কর দে।

এমনই হাল উত্তরপাড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতালের। ছবি: দীপঙ্কর দে।

‘আইসোলেশন বিভাগে’ যাওয়ার পথে থমকাতে হল।

একতলায় মেল মেডিসিন বিভাগে পাঁক ভর্তি নর্দমার পাশে ছয় ফুট লম্বা বড় বড় বুনো গাছ। বর্ষার জলে আড়ে-বহরে দিব্যি বেড়েছে। মাথায় ছাউনিওলা সরু বাঁধানো রাস্তার দু’ধারে এখন ঘন জঙ্গল। ডান দিকে মর্গের রাস্তা। তার বাঁয়ে বাড়িটার দেওয়ালে বড় করে লেখা ‘রান্নাঘর’। এখন সেই রান্নাঘরের পথে পর পর তিনটে শুয়োর ব্যস্ত পায়ে চলেছে। তাদের পিছনে হলুদ বড়সড় একটা হুলো বেড়াল। জঙ্গলের এই ছোট মিছিলকেই পথ করে দিতে রোগীর বাড়ির লোকেরা কিছুটা থমকে গেলেন।

তবে চমকের আরও বাকি ছিল। আইসোলেশন বিভাগের ডান দিকে অর্থাৎ রান্নাঘরের পিছনেই এক থেকে দেড়ফুট পচা পাঁকভর্তি জল জমে আছে অনেকটা জায়গা জুড়ে। তাতে বাচ্চা বেশ কয়েকটা শুয়োর খুনসুটি করছে। এই সবের মধ্যে উত্তরপাড়া থানার পুলিশ কর্মীরা একটি অস্বাভাবিকভাবে মৃতের সুরতাহাল (ইনকোয়েস্ট) করছেন। কর্মী নেই, তাই হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার (ফেসিলিটি ম্যানেজার) বাবুল দত্ত মশার লার্ভা নিধনে নিজেই কেরোসিন তেল ছড়ানোর অভিযানে নেমেছেন।

এ সবের মাঝেই জ্বর নিয়ে রোগীরা আসছেন হাসপাতালে। এ পর্যন্ত গত এক সপ্তাহে ৪০ থেকে ৪২ জনকে জ্বরের কারণে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ২২ থেকে ২৪ জনের রক্ত ডেঙ্গি সন্দেহে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। তবে উত্তরপাড়া হাসপাতালে ভর্তি মোট তিনজনের রক্তে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গির জীবাণু মিলেছে। চলতি সপ্তাহের প্রথমদিন সোমবার উত্তরপাড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতালের চৌহদ্দিতে এটাই ছিল খণ্ডচিত্র। তবে এই ছবি সব কথা বলে না।

বস্তুত শতাব্দী প্রাচীন রাজবাড়িকে হাসপাতালের চেহারা দেওয়া হয় কয়েক দশক আগে। তিনটি খেলার মাঠ, দু’টি পুকুর-সহ কয়েক একর জমির উপর হাসপাতাল রয়েছে। জেলার একমাত্র স্টেট জেনারেল হাসপাতালটি ২০৪ শয্যার। জিটি রোড, দিল্লি রোড, এক্সপ্রেসওয়ে, মেন, কর্ড এবং ডানকুনি-শিয়ালদহ রেল শাখার অদূরেই এই হাসপাতালের অবস্থান। গত এক দশকে উত্তরপাড়ায় লাফিয়ে বেড়েছে জমির দাম। পাল্লা দিয়ে লোক সংখ্যা। সময়ের দাবি মেনে হাসপাতালের পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। জমির আকালে এই রাজ্যে হাসপাতালে বিঘের পর বিঘে জমি গরু, শুয়োরের বিচরণ ক্ষেত্রে।

শহরেরই প্রবীণ চিকিৎসকের আফশোস, ‘‘কেউ ভাবল না, এই হাসপাতালে সোনা ফলতে পারত। কলকাতার কাছে, এত জমি স্রেফ পড়ে নষ্ট হচ্ছে? মেডিক্যাল কলেজ, চিকিৎসা গবেষণার ক্ষেত্র হতে পারত হাসপাতালটি। কিছুদিন আগে জিটি রোডে হাসপাতালের বহির্বিভাগের একাংশ ভেঙে পড়ে। পরিত্যক্ত ভিটেতে মদ, জুয়া আড্ডা চলছে এখন।’’ এটা অবশ্য স্বপ্নভঙ্গের সালতামামি।

কিন্তু কী আছে হাসপাতালে? পরিকাঠামোটাই বা কী? চিকিৎসকদের একাংশের বক্তব্য, নাকে অক্সিজেনের নল নিয়ে কোনওক্রমে বেঁচেবর্তে আছে এই হাসপাতাল। হাসপাতালে চিকিৎসকের সঙ্গেই জিডিএ (জেনারেল অ্যাটেন্ডস্ ডিউটি) স্টাফ জরুরি। ডোম দীর্ঘদিন ধরে নেই। ঝাড়ুদার ২৩ এর জায়গায় ৮ জন। অ্যাম্বুল্যান্স ক্লিনার, ড্রেসার নেই। ওর্য়াড মাস্টার তিন জনের জায়গায় দু’জন আছেন। একজনকে নিয়মের জাঁতাকলে মাঝে মাঝে বসিয়ে দেওয়া হয়। পরিকাঠামোর এই চিত্রে পরিষেবার হাল ঢিলেঢালা হচ্ছে, মত এলাকাবাসীর। ব্লাড স্টোরেজ ইউনিটের মেশিনে ধুলো পড়ছে। দীর্ঘসূত্রিতায় চালু হচ্ছে না। জেনারেল সার্জেন চার বছর নেই। নেই সব সময়ের অ্যানাস্থেটিস্ট।

তার উপরে মরার উপর খাঁড়া, স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। হাসপাতালের এক কর্মীর আক্ষেপ, ‘‘ওঁরা ব্যবসা করেন। কিন্তু পাঁচিলের এ-পাশটা ওঁদের ময়লা ফেলার জায়গা। নির্মল ভারত অভিযান হচ্ছে। কিন্তু হাসপাতালের জঙ্গলে অনেকে শৌচকর্ম করে যাচ্ছেন।’’ হাসপাতালের পুকুর, নর্দমার জমা জল মশার আঁতুড়ঘর। স্বাস্থ্য দফতর বলছে কামান দাগতে। কর্তৃপক্ষের অনুযোগ, বহু চিঠি দিয়েছি,কামান দূরঅস্ত, পুরসভার কেউ ময়লা আর নর্দমা পরিষ্কারেও আসে না।

বর্তমান পরিস্থিতে এটাই এখন উত্তরপাড়ার ভরসা।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy