এ যেন ভোজবাজি!
যে পুলিশ অফিসারদের কয়েকদিন আগেও ‘দলদাস’-এর ভূমিকায় দেখা যেত, ভোটের দিন কোন জাদুবলে তারা যেন রাতারাতি হয়ে গেলেন ‘দাবাং’-এর সলমন খান কিংবা সিংহমের অজয় দেবগন। কোনওরকম বেচাল হলেই একেবারে ‘চড়াম-চড়াম’।
শনিবার পান্ডুয়া, সপ্তগ্রামে এমনই দাপুটে ভঙ্গি দেখা গেল কেন্দ্রীয় বাহিনী ও জেলা পুলিশের। রাস্তায় বা বুথের ২০০ গজের মধ্যে জমায়েত দেখলেই হয় তাড়া করে নয়তো লাঠি চালিয়ে মুহূর্তে ভিড় ফাঁকা করে দিয়েছে তারা। পরিস্থির উপর কড়া নজর রাখতে গাড়ি নিয়ে চক্কর কেটেছে শহরের অলিতে গলিতে, গ্রামের পথে। ফলে দিনভর যেমন শাসকের রক্তচক্ষু দেখতে হয়নি ভোটারদের। তেমনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলির কণ্ঠস্বর ছিল অনেক স্তিমিত। দিনের শেষে বিরোধী জোট সিপিএম-কংগ্রেস যখন ভোট শান্তিপূর্ণ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশের ভূমিকায় সন্তোষ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে। তখন কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝরে পড়েছে শাসক দলের কণ্ঠে।
ঘটনা ১) বেলা ১টা। বৈঁচিগ্রামের জয়গোপাল সিংহ নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়। ভোট দিতে এসে অসুস্থ হয়ে পড়া এক যুবককে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন তিন জওয়ান। মাঝপথে তৃণমূলের একদল সমর্থক গাড়ি আটকে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করে। খবর পেয়ে ছুটে আসে বাহিনীর আরও জওয়ান। মুহূর্তে লাঠি চালিয়ে এলাকা ফাঁকা করে দেয় তারা।
ঘটনা ২) বেলা ২টো। খন্যান নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন রথীন ঘোষ। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরেও ভোট না দিতে যাওয়ায় এক জওয়ান তাঁকে ওখান থেকে চলে যেতে বলেন। না যাওয়ায় লাঠি নিয়ে তাড়া করে এক জওয়ান।
ঘটনা ৩) বিকাল ৪টা। কলবাজারের সুলতানিয়া হাই মাদ্রাসার বুথের সামনে তৃণমূলের ক্যাম্প অফিসে জমায়েতের খবর পেয়েই নিমেষে হাজির পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। বেপরোয়া লাঠি চালিয়ে এলাকা ফাঁকা। ভেঙে দেওয়া হলো ক্যাম্প অফিসও।
তৃতীয় দফার ভোট থেকেই পুলিশ যে ‘আসল চেহারায়’ ফিরছিল এ দিনের এ সব ঘটনাই তা প্রমাণ করে দেয়। আর দীর্ধনিক পরে এমন নিরুত্তাপ ভোট দেখলেন পান্ডুয়ার মানুষ। মহিম হালদার নামে প্রবীণ এক ভোটারের কথায়, ‘‘হুগলিতে ভোট মানেই গোলমাল রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ দিন অন্য ভোট দেখলাম। এটাই ভোটের ছবি হওয়া উচিত।’’
সিপিএমের গড় বলে পরিচিত পান্ডুয়ায় তাঁর প্রার্থী হওয়া নিয়ে তৃণমূলের মধ্যেই ক্ষোভ ছিল। তাঁকে প্রার্থী করায় ব্লক স্তরের যে চারজন নেতা বিক্ষুব্ধ হয়েছিলেন তাঁরা বামরক্ষণ ভেঙে রহিমকে ফাইনাল পাশ দেবেন কিনা সেটাই ছিল মূল প্রশ্ন। সেই প্রশ্ন এ দিনই থেকে গিয়েছে। এদিন সকাল থেকেই দলীয় প্রার্থী রহিম নবীর সঙ্গে ভোটের ময়দানে ওই তৃণমূল নেতাদের দেখা যায়নি। কেউ ছিলেন বাড়ির আড্ডায়, কেউ ফেসবুকে। দিনভর একাই ছুটে বেরিয়েছেন রহিম।
গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের যে চোরা স্রোত বইছে তার পরেও কী তিনি বামরক্ষণ ভেঙে গোল দিতে পারবেন?
প্রশ্নের উত্তরে তৃণমূল প্রার্থী বলেন, ‘‘আমি খেলোয়াড়। প্রতিপক্ষকে কি ভাবে হারাতে হয় জানি।’’ নবির সেনাপতির দায়িত্বে নেওয়া তৃণমূল নেতা মলয় বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘‘পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী সিপিএমের হয়ে কাজ করেছে। ওরা সাধারণ ভোটারকেও মেরেছে। ফলে অনেকে ভোট দেননি।’’ সিপিএমের পান্ডুয়া জোনাল কমিটির সম্পাদক বীরেন সাধুখাঁর মন্তব্য, ‘‘ওরা হেরে যাচ্ছে বলেই এমন উদ্ভট অভিযোগ করছে। পুলিশ এদিন দলদাসের ভূমিকা না নিয়ে সঠিক কাজ করেছে।’’