কথা ছিল, এলাকার গ্রামীণ হাসপাতাল ‘সুপার স্পেশ্যালিটি’ স্তরে উন্নীত হবে। অনুমোদনের পর্ব পেরনোর পরে তা কিন্তু চণ্ডীতলায় হচ্ছে না। কথা ছিল, কলেজ হবে। কিন্তু তা সরে গিয়েছে অন্য কোথাও। আইটিআইয়ের দান করা জমি এখনও অপেক্ষায় রয়েছে প্রশাসনিক স্তরে উদ্যোগের। এলাকাবাসীর অভিজ্ঞতা বলে, প্রতিশ্রুতির দীর্ঘ তালিকার ছায়া বাম থেকে তৃণমূল সরকারের আমলে ধারাবাহিক রয়েছে। কিন্তু চণ্ডীতলা ১ ও ২ ব্লকের বাসিন্দাদের কাছে এখনও অধরা রয়ে গিয়েছে অনেক কিছুই।
অথচ, ডানকুনি শিল্পাঞ্চল লাগোয়া এই জায়গায় গত এক দশকে কমবেশি ৩০টি ছোট-বড় শিল্প গড়ে ওঠেছে। আমূল দুগ্ধ প্রকল্প গড়ে উঠেছে চণ্ডীতলার কাছে কলাছড়াতে। রয়েছে একটি নামী ব্র্যান্ডের কাপড়ের কল। বেসরকারি উদ্যোগে দেশি মদের ‘বটলিং প্ল্যান্ট’ গড়ে উঠেছে। আছে বনস্পতির কারখানা। আছে সম্পূর্ণ বিদেশে রফতানি করা হয়, এমনই এক আচারের কারখানা। রয়েছে অন্তত ১০টি কাপড়ের এমব্রয়ডারি কারখানা, যেখানে এলাকার অনেক মহিলা কাজ পেয়েছেন। এ রকমই ছোট-বড় নানা কর্মোদ্যোগ।
যে কোনও শিল্প গড়ে ওঠে পরিকাঠামোর উপরে ভর করে। গত কয়েক বছরে গ্রামীণ এলাকা হলেও চণ্ডীতলায় পরিকাঠামোগত উন্নতি হয়নি, এ কথা প্রায় কেউই বলছেন না। এলাকার প্রধান সড়ক— অহল্যা বাই রোড চওড়া হয়েছে। অবস্থানগত ভাবে দিল্লি রোড এখান থেকে অল্প কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে। কালীপুর হয়ে মুম্বই রোডও কাছেই। এক সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের আতঙ্ক লেভেল ক্রসিংয়ের জন্য ডানকুনি স্টেশনে যানজটে আটকে পড়ার হাত থেকে রেহাই মিলেছে রেল-উড়ালপুল চালু হওয়ায়। ফলে পরিস্থিতি বদলেছে, তাতে সন্দেহ নেই।
চণ্ডীতলা অঞ্চলের এক শিল্পোদ্যোগী বলেন, ‘‘আগের থেকে কিছুটা হলেও এখন পরিস্থিতির বদল হয়েছে। দু’পা গেলেই পৌঁছনো যায় একাধিক জাতীয় সড়কে। এলাকার ভিতরের রাস্তাঘাটের উন্নতি চোখে পড়ছে। কিন্তু পরিকাঠামোগত আরও কিছু পরিবর্তন এখন কিন্তু জরুরি। চাই হাসপাতাল, কলেজ, আইটিআই আর অবশ্যই তার সঙ্গে শিল্পের পরিবেশ।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘কলকাতার এত কাছের এই জায়গা সরকারি স্তরে কিছুটা সাহায্য পেলেই কিন্তু রাজ্যের শিল্পের মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারে।’’
এলাকার অন্য এক উদ্যোগপতি অবশ্য চণ্ডীতলাতেও রাজ্যের শিল্প-চিত্রে এক স্থায়ী অসুখের উপসর্গ দেখছেন। তাঁর কথায়, ‘‘পরিকাঠামোর পাশাপাশি শিল্পের জন্য সুস্থ পরিবেশ পাওয়াটাও এখানে জরুরি। আমরা বহু ক্ষেত্রেই দেখেছি, রাজনীতির অনুপ্রবেশ, বিশেষ করে শাসক দলের। কখনও তা শ্রমিকদের পাওনাগন্ডা নিয়ে, কখনও ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নিয়ে। এ ধরনের রাজনৈতিক চাপ কিন্তু শিল্পোদ্যোগীদের কাছেও আতঙ্কের।’’
যদিও জেলা তৃণমূলের অন্যতম সম্পাদক সুবীর মুখোপাধ্যায় কিন্তু ওই শিল্পপতির অভিযোগ মানতে নারাজ। তাঁর দাবি, ‘‘স্থানীয় স্তরে বিচ্ছিন্ন ভাবে অপরিণতমনস্ক কেউ কিছু করতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিই। স্থানীয় প্রশাসনও কিন্তু শিল্পের ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা নজরে এলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায় না।’’
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ শুধু শিল্পক্ষেত্রে সুস্থ পরিবেশের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের মধ্যে অনেকের উষ্মার কারণ—বাম আমলে এলাকাতে কলেজ হওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও, তা সরে গিয়েছে মশাটে। তৃণমূলের জমানায় চণ্ডীতলার সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালের শ্রীরামপুরে সরিয়ে যাওয়া নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। এলাকার এক শিক্ষিকার কথায়, ‘‘ঢাকডোল পিটিয়ে ঘোষণা হল, চণ্ডীতলায় সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল হবে। কিন্তু এখন শুনছি, তা হবে শ্রীরামপুরে। যদিও শ্রীরামপুরে মহকুমা হাসপাতাল রয়েছে। আমরা কি ১৫ কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে শ্রীরামপুরে যাব?’’
এলাকার একাধিক তরুণের আক্ষেপ, ‘‘রাজ্যে ক্ষমতায় এসেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন, প্রতিটি ব্লকে আইটিআই হবে। চণ্ডীতলার এক বিশিষ্ট শিল্পপতি ছেলের স্মৃতিতে আইটিআইয়ের জন্য বহু টাকার জমি ছেড়ে দিতে চাইলেন। এমনকী, সেই জমিতে নিজের খরচে সীমানা-প্রাচীর গড়ে দিলেন। কিন্তু তার পরে তো সরকারি তরফে কোনও উদ্যোগ চোখে পড়ছে না?’’ চণ্ডীতলার একাধিক বাসিন্দাও বলেছেন, ‘‘সরকারি তরফে আইটিআই গড়ার আশ্বাস পেয়েই তো ওই শিল্পপতি এগিয়েছিলেন। প্রশাসনের তরফে এ ভাবে বিনা নড়াচড়ায় বসে থাকার অর্থ, ওঁর উদ্যোগকে অসম্মান করা।’’
জেলা প্রশাসনের এক কর্তার দাবি, ওই জমিতে আইটিআই গড়া যাবে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত লাগবে। সেটা জোগাড় করা না গেলে ওই জমিতে আইটিআই হবে কি না, তা বলা যাচ্ছে না। তবে ওই মতামত কবে পাওয়া যাবে, তা স্পষ্ট করতে পারেননি ওই কর্তা।
পাওয়া না পাওয়ার এই দোলাচলে এখন সরগরম চণ্ডীতলা। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দারা মনে করছেন, এলাকায় সম্ভাবনার অভাব নেই। চাই কেবল সে সব সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে আরও উদ্যোগ।