Advertisement
E-Paper

একটি গুলি, থামিয়ে দেয় ভোলানাথের দৌড়

গঙ্গার পশ্চিমপারের জেলা হুগলিতে নব্বই দশকের মাঝামাঝি গুলি করে খুন করা হয়েছিল একটি থানার দাপুটে বড়বাবুকে। দুষ্কৃতী দমনে যাঁর দাওয়াই ছিল আর পাঁচজন ওসির তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। সেই সময় পুলিশ ও রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন ফেলেছিল এই খুনের ঘটনা। কিন্তু কেন? নব্বই দশকে পুলিশ, রাজনীতি, দুষ্কৃতী—সমান্তরাল ছবির সেই পটভূমিকায় আনন্দবাজারের অনুসন্ধান। প্রাণ দিয়ে বিশ্বাসের দাম চুকিয়েছিলেন ভদ্রেশ্বর থানার এক সময়ের ডাকসাইটে ওসি ভোলানাথ ভাদুড়ি। এমনটাই মনে করেন হুগলি জেলা পুলিশের প্রবীণ অফিসাররা।

গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৭ মে ২০১৬ ০২:৪১

প্রাণ দিয়ে বিশ্বাসের দাম চুকিয়েছিলেন ভদ্রেশ্বর থানার এক সময়ের ডাকসাইটে ওসি ভোলানাথ ভাদুড়ি। এমনটাই মনে করেন হুগলি জেলা পুলিশের প্রবীণ অফিসাররা।

তিনি থানার দায়িত্বে থাকবেন, আর দুষ্কৃতীরা এলাকায় নেচে বেড়াবে— একেবারেই না-পসন্দ ছিল ভোলানাথবাবুর। যেমনটা তিনি পছন্দ করতেন না পুলিশের কাজে শাসকদলের হস্তক্ষেপ। কিন্তু বাস্তব সব সময়ই কঠিন। পুলিশের কোনও কাজে শাসকদলের সমস্যা হলে তাদের নাক গলানো বহুদিন ধরেই এ রাজ্যের রাজনীতির দস্তুর।

সেটা ন’য়ের দশকের গোড়া। ভোলানাথবাবু উত্তরপাড়া থানার দায়িত্বে। রাজ্যে ভরা বাম শাসন। উত্তরপাড়া এলাকায় শাসকদলেরই এক ডাকাবুকো কর্মীকে বেয়াদপি করার জন্য লকআপে ভরে দেন ভোলানাথবাবু। তাঁর সে দিনের এক সহকর্মী বলছিলেন তার পরের কাহিনি, ‘‘স্বাভাবিক কারণেই উত্তরপাড়ার এক বাম নেতা পুলিশের কাজে বিরক্ত হলেন। তিনি ওসি-র সঙ্গে দেখা করতে চান। কম বিরক্ত হয়নি ভোলানাথবাবু। শেষ পর্যন্ত তিনি ওই নেতার সঙ্গে দেখা করেন। তিনি নেতাকে বুঝিয়ে দেন, কেন ওই বামকর্মীর বিরুদ্ধে পুলিশি হস্তক্ষেপ করাটা জরুরি হয়ে পড়েছিল। না হলে তাঁদের দলেরই বদনাম ঠেকানো যেত না। সব শুনে অবশ্য ওই নেতা পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে ভোলাবাবুকে দোষারোপ অন্তত করতে পারেননি। তিনি ঠেকাতেও পারেননি দলে তাঁরই প্রিয় কর্মীর জেলযাত্রা।’’

Advertisement

এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিল। জেলা পুলিশের অনেকে মনে করেন, ভোলানাথবাবু ভুলটা করে বসেন ১৯৯৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে। শীতকাল। সন্ধ্যা থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। দীপুয়া, ভাকালুয়া, সুভাষ সাহানির মতো ভদ্রেশ্বর থানা এলাকার দুষ্কৃতীদের মাথারা কেউই জেলবন্দি নয়। সবাই জামিনে ছাড়া। ভদ্রেশ্বর থানার দায়িত্ব নেওয়ার পর ততদিনে ভোলানাথবাবু তাদের বুঝে নিয়েছেন। এলাকা মোটামুটি পুলিশের নিয়ন্ত্রণেই চলছিল। কিন্তু জাত দুষ্কৃতীদের কোনও চেনা ছকে ফেলা যায় না। সুযোগ পেলেই কিছু না কিছু তারা ঘটিয়ে ফেলবে। যেমন হয়েছিল ওই রাতে।

‘সোর্স’ মারফত ভোলানাথবাবু গভীর রাতে খবর পান, দীপুয়ারা বাইরের কিছু দলবল নিয়ে চাঁপদানির কোনও এক ডেরায় জমিয়ে মদ খাচ্ছে। কিন্তু কোন ডেরা, ভোলানাথবাবু তার হদিস পাচ্ছিলেন না। মোবাইলের সুবিধাও সে সময় ছিল না। স্বাভাবিক ভাবেই এর মাঝে কিছুটা সময় চলে গিয়েছে। পরে ভোলানাথবাবু খবর পান, চাঁপদানিতে ভাকালুয়ারা দলবল মিলে জিটি রোডের ধারের একটি পানশালায় ডাকাতি করছে। দেরি না করে তিনি দ্রুত সেখানে রওনা দেন। পুলিশ তাদের পিছু ধাওয়া করতে পারে, দুষ্কৃতীরা সেই আন্দাজ আগেভাগেই করেছিল। তারা ‘অপারেশনে’ দেরি না করে পানশালার ক্যাশিয়ারকে মারধর করে রিভলভারের বাট দিয়ে মাথা ফাটিয়ে ক্যাশ বাক্স লুঠ করে চম্পট দেয়।

ভোলানাথবাবু সেখানে পৌঁছে পানশালার লোকজনের থেকে খবর পান, দুষ্কৃতীরা জিটি রোড ধরে বৈদ্যবাটি রেলগেটের দিকে পালিয়েছে। তিনি দেরি না করে জিটি রোড ধরে দ্রুত গতিতে রেলগেটের দিকে যেতে থাকেন। পুলিশ ধাওয়া করায় দুস্কৃতীরা বিপদের গন্ধ পেয়ে রেলগেটের কিছুটা আগে একটি গলি দিয়ে পালাতে চেষ্টা করে। ভোলানাথবাবু জিপ থেকে নেমে সোজা তাদের পিছু নেন।

জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পিছু নেওয়ার সময় ভোলানাথবাবু দীপুয়া, ভাকালুয়ার নাম করে ডাকতে থাকেন। পালাতে নিষেধ করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, পরিচিত হওয়ায় দুষ্কৃতীরা পালাবে না। ধরা দেবে। তিনি যখন নিজেই ওদের চিনতে পেরে নাম ধরে ডাকছেন। ওসির সহকর্মীরা তখন জিপের ভিতরেই বসে রয়েছেন। কিন্তু দুষ্কৃতীরা ভোলাবাবুর মতো চেনা পুলিশ অফিসারকেও রেয়াত করেনি। বিপদের গন্ধ পেয়ে তারা গুলি চালাতে শুরু করে। একটি গুলি ভোলানাথবাবু থাইয়ে ঢুকে মূল রক্তবাহী নালিটিকে ছিন্ন করে দেয়। হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও তাঁকে বাঁচানো যায়নি।

দুষ্কৃতীদের একটি গুলিই দাঁড়ি টেনে দিয়েছিল ভোলানাথবাবুর জীবনে। কিন্তু ইতি টানতে পারেনি তাঁর নানা ‘রিয়েল লাইফ স্টোরি’র। যে গল্প আলোচনায় এলেই উচ্চারিত হয় ভোলানাথবাবুর নাম।

(শেষ)

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy