Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২০ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

বাড়ল বেতন, হাসি ফুটল নীলুদের মুখে

নিজস্ব সংবাদদাতা
শ্যামপুর ০৭ মে ২০১৬ ০১:৪৮
শ্যামপুরে ইটভাটা। ছবি- সুব্রত জানা।

শ্যামপুরে ইটভাটা। ছবি- সুব্রত জানা।

মাথার উপরে গনগনে সূর্য। ভর দুপুরে উবু হয়ে বসে ছাঁচে ফেলে কাঁচা ইট তৈরি করছিলেন নীলু পাত্র, বাদল বেরা। শ্যামপুরের একটি ইটভাটায় দেখা গেল এই ছবি। মাসে কত টাকা রোজগার করেন? প্রশ্নের উত্তরে নীলু বললেন, ‘‘মেরেকেটে ২ থেকে আড়াই হাজার।’’ একই উত্তর পাওয়া গেল বাদলবাবুর কাছ থেকেও। কিন্তু বেতন বৃদ্ধি সংক্রান্ত চুক্তি না হওয়ায় মরসুমের প্রথম দিকে তাঁদের মন বেশ খারাপ ছিল।

অবশেষে তাঁদের সেই মন খারাপ কাটল বলা চলে। কারণ, ইটের মরসুমের শেষের দিকে অর্থাৎ গত ১ মে তাঁদের সংগঠনগুলির সঙ্গে বেতন সংশোধন সংক্রান্ত চুক্তি হয়েছে শ্রমিকদের। এ বছর ৯ শতাংশ হারে বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভাটা মালিকেরা এবং শ্রমিক সংগঠনগুলি। শেষ পর্যন্ত মজুরি বাড়ায় মুখে হাসি ফুটেছে নীলু পাত্র, বাদল বেরাদের। তবে ভাটা মালিকেরা আশ্বাস দিয়েছেন, দেরি করে চুক্তি হলেও শ্রমিকদের সমস্যা হবে না। শ্রমিকেরা মরসুম শুরু হওয়ার দিন থেকে বর্ধিত বেতনের বকেয়া পেয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন ভাটা মালিকপক্ষ।

হাওড়ার শ্যামপুর ইট ভাটার জন্য প্রসিদ্ধ। এই এলাকায় দামোদর এবং রূপনারায়ণের ধারে রয়েছে অন্তত দেড়শো ইটভাটা। প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক এই ভাটায় কাজ করে দিন গুজরান। প্রায় ১০ শতাংশ শ্রমিক আসেন ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশা থেকে। কিছু শ্রমিক আসেন মুর্শিদাবাদ থেকে। বাকি শ্রমিকদের সকলেই এলাকার বাসিন্দা। ফলে ইট ভাটা থেকে যে টাকা তাঁরা উপার্জন করেন তার সবটাই কাজে লাগে স্থানীয় অর্থনীতির উন্নতিতে।

Advertisement

ইট ভাটায় নানা ধরনের শ্রমিক কাজ করেন। একদল আছেন যাঁরা ছাঁচে ফেলে কাঁচা ইট তৈরি করেন। তাঁদের বলা হয় গড়নদার। কাঁচা ইট চুল্লিতে বয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ যাঁরা করেন তাঁদের বলা হয় ‘কাঁচা রেজা’। চুল্লি থেকে পোড়ানো ইট যাঁরা বাইরে বয়ে আনেন তাঁদের বলা হয় ‘পাকা রেজা’। পোড়ানোর জন্য চুল্লির ভিতরে ইট সাজানোর কাজ যাঁরা করেন তাঁদের বলা হয় বেলদার। চুল্লিতে যাঁরা আগুন দেন তাঁদের বলা হয় ‘ফায়ারম্যান।’ সব মিলিয়ে একটি ভাটায় প্রায় দেড়শো শ্রমিক কাজ করেন। সব থেকে বেশি রোজগার বেলদার এবং ফায়ারম্যানদের। মাসে গড়ে তাঁরা রোজগার করেন ৬ হাজার টাকা করে। বাকিদের গড়ে রোজগার মাসে ২-৩ হাজার টাকা করে। ভাটার মরসুম শুরু হয় নভেম্বর মাস থেকে। চলে জুলাই মাস পর্যন্ত। সেই হিসেবে ভাটা শ্রমিকেরা বছরে ৬-৮ মাস কাজ পেয়ে থাকেন।

প্রতি বছর মার্চ মাস নাগাদ ভাটা মালিকদের সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনগুলির বেতন সংক্রান্ত চুক্তি হয়। তার ভিত্তিতে প্রতিটি ভাটায় শ্রমিকদের বেতন বাড়ানো হয়। ২০১১-১২ সালে শ্রমিকদের বেতন বেড়েছিল ৮ শতাংশ হারে। ২০১২-১৩ বছরে বেতন বেড়েছিল ১২ শতাংশ হারে। ২০১৩-১৪ বছরে বেতন বেড়েছিল ৫ শতাংশ হারে। গত বছরে বেতন বেড়েছিল খুব কম। মাত্র ১ শতাংশ হারে। গত বছর কয়লার দাম বাড়ার ফলে এই শিল্পে মুনাফা কম হয়েছিল। তাই কম বেতন বাড়ানো হয়েছিল বলে শ্রমিক সংগঠনগুলি সূত্রে জানা গিয়েছে।

কিন্তু এ বছর বেতন বাড়ানো সংক্রান্ত চুক্তি করতে এত দেরি হল কেন? ভাটা মালিকদের দাবি, তিনটি বৈঠক হয়েছিল। কিন্তু শ্রমিক সংগঠনগুলি বেতন বৃদ্ধি সংক্রান্ত ব্যাপারে মালিকদের দেওয়া প্রস্তাবের সঙ্গে একমত হতে না পারায় চুক্তি করা যায়নি। মূলত সিটুর পক্ষ থেকে মালিকদের দেওয়া প্রস্তাবের বিরোধিতা করা হয়। সেই কারণেই সব আলোচনা ভেস্তে যায়। মালিকেরা ৫ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব দেন। কিন্তু সিটু তা মানেনি। এ বিষয়ে সিটু নেতা উত্তম রায়চৌধুরী বলেন, ‘‘গত বছর কয়লার দাম বেশি থাকায় মাত্র ১ শতাংশ বেতন বেড়েছিল। আমরা তা মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু এ বছর কয়লার দাম কমে গিয়েছে। ফলে ৪০ শতাংশ বেতন বাড়াতে হবে।’’

সব টালবাহানার শেষে ১ মে-র বৈঠকে ভাটা মালিকেরা স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ৪০ শতাংশ হারে বেতন বাড়ানো সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত ৯ শতাংশ হারে বেতন বাড়াতে রাজি হন তাঁরা। শ্যামপুর থানা ব্রিক ফিল্ড ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অরূপ মান্না বলেন, ‘‘আমরা ফের ১ মে শ্রমিক সংগঠনগুলির সঙ্গে আলোচনায় বসেছি। সকলের সঙ্গে আলোচনা করেই ৯ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে।’’ সিটু নেতা উত্তমবাবু বলেন, ‘‘ইট শিল্পের সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনা করেই আমরা এই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি।’’

এই সিদ্ধান্তে তাঁরা খুশি বলে জানিয়েছেন টিইউসিসি নেতা অসিতবরণ সাউ।

আরও পড়ুন

Advertisement