ট্রেনের কামরায় তাঁদের অভব্যতা নিয়ে নিত্যযাত্রীদের অভিযোগ আগেই ছিল। এ বার বসার জায়গা নিয়ে বচসার জেরে সহযাত্রী পাঁচ শিক্ষককে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ উঠল হুগলির গুপ্তিপাড়ার একটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের কিছু ছাত্রের বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার সকালে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তেতে ওঠে গুপ্তিপা়ড়া স্টেশন এবং সংলগ্ন এলাকা। প্রহৃত শিক্ষকদের মধ্যে দু’জনের মাথা ফাটে। ঘটনার প্রতিবাদে রেল অবরোধ করেন বলাগড় ব্লকের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষকেরা। ছাত্রদের আচরণের নিন্দা করেন সকলেই।
পরে রেল পুলিশের অফিসাররা প্রহৃত শিক্ষকদের নিয়ে কলেজে যান। সেখানে হামলাকারী কয়েক জন ছাত্রকে চিহ্নিত করা হয়। কলেজ কর্তৃপক্ষ ওই ছাত্রদের তিরষ্কার করেন। অধ্যক্ষ ইন্দ্রজিৎ সাঁতরা বলেন, ‘‘অভিযুক্ত ছাত্রেরা দোষ স্বীকার করেছে। এমন ভুল আর হবে না বলে তাঁরা মুচলেকাও দিয়েছে। তাঁদের অভিভাবকদের ডেকে পাঠানো হচ্ছে।’’ বিডিও মোদাশ্বর মোল্লা জানান, প্রয়োজনে ওই ছাত্রদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আক্রান্তদের মধ্যে গুপ্তিপাড়ার স্বামীজি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপাঞ্জন পাল বলেন, ‘‘ছাত্রদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমরা পুলিশে লিখিত অভিযোগ করিনি। ওদের আচরণে আমরা খুবই ব্যথিত। আশা করব, ওরা নিজেদের শুধরে নেবে।’’
রেল পুলিশ এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতিদিনই সকাল ১০টা ২০ মিনিটের শিয়ালদহ-কাটোয়া প্যাসেঞ্জারে গুপ্তিপাড়ায় কলেজে আসেন ওই ছাত্রেরা। এ দিন গোলমালের সূত্রপাত ট্রেনের ৬ নম্বর কামরায়। সেখানে মূলত কলেজের ডিপ্লোমা বিভাগের ছাত্রেরাই ছিলেন। ত্রিবেণী স্টেশনে সিটে বসা নিয়ে তাঁদের সঙ্গে সহযাত্রীদের বচসা শুরু হয়। ওই যাত্রীদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন বলাগড়ের বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষক। এ ছাড়াও ছিলেন বলাগড় ব্লক অফিসের কয়েকজন কর্মী।
গুপ্তিপাড়া স্টেশনে রেল অবরোধে শিক্ষকেরা।
অভিযোগ, ছাত্রেরা অন্যদের বসতে বাধা দিচ্ছিলেন। প্রতিবাদ করায় তাঁরা গালিগালাজ করেন। এই নিয়ে বচসা হয়। ট্রেন ডুমুরদহ স্টেশন ছাড়তেই ছাত্রেরা মারমুখী হয়ে ওঠে। অন্তত ২০-২৫ জন মিলে সহযাত্রী শিক্ষকদের বেধড়ক কিল, চড়, ঘুষি মারতে থাকে। ট্রেনের কামরার দেওয়ালে তাঁদের মাথাও ঠুকে দেওয়া হয়। ছাত্রদের মূর্তি দেখে অন্য যাত্রীরা রীতিমতো ভয় পেয়ে যান। প্রধান শিক্ষক দীপাঞ্জনবাবু এবং সোমরাবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সত্যপ্রিয় রায়ের মাথা ফাটে। সত্যপ্রিয়বাবুকে ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা হয় বলেও অভিযোগ। দীপাঞ্জনবাবুর সহকর্মী রমেন বিশ্বাস, নাটাগড় উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক পিনাকী ঘোষ, সুলতানপুর কুটিরপা়ড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক অত্রি করও জখম হন।
ট্রেনে যখন এই কাণ্ড চলছে, তখন কিছু যাত্রী গুপ্তিপাড়া স্টেশনে ফোন করেন। রেল পুলিশকেও খবর দেওয়া হয়। রেল পুলিশ (জিআরপি) এবং রেল রক্ষী বাহিনী (আরপিএফ) প্ল্যাটফর্মে চলে আসে। স্টেশন কর্তৃপক্ষ গুপ্তিপাড়ায় ট্রেনটিকে দাঁড় করান। আহত শিক্ষকদের নামিয়ে আনা হয়। সেই সুযোগে হামলাকাররা পালায়। আহতদের গুপ্তিপাড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা করানো হয়।
কিন্তু এর পর পরিস্থিতি জটিল হয়। ওই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়াদের দাপাদাপির খবর ছড়াতেই বহু গ্রামবাসী ভিড় করেন গুপ্তিপাড়া স্টেশনে। বলাগড় ব্লকের বিভিন্ন স্কুল থেকে শিক্ষকেরাও চলে আসেন। বেলা সাড়ে ১২টা নাগাদ শিক্ষকেরা রেললাইনে বসে পড়ে অবরোধ শুরু করেন। এর জেরে কাটোয়া থেকে ব্যান্ডেলগামী ডাউন লোকাল ট্রেন ওই স্টেশনে দাঁড়িয়ে যায়। গ্রামবাসীদের অনেকেও ওই ছাত্রদের আচরণের নিন্দা করে ক্ষোভ উগরে দেন। বলাগড় থানার পুলিশও ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। তারা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলে অবরোধ ওঠে। ক্ষুব্ধ শিক্ষকেরা দল বেঁধে বিডিওর কাছে গিয়েও অভিযোগ জানান।
নিত্যযাত্রীদের অভিযোগ, ট্রেনের কামরায় কলেজ-ছাত্রদের একাংশের দৌরাত্ম্যে তাঁরা অতিষ্ঠ। ওরা নিজেদের মধ্যে খারাপ ভাষায় কথা বলেন। দাঁড়িয়ে তাস খেলতে থাকেন। অন্য যাত্রীদের অসুবিধা হলেও ভ্রূক্ষেপ করেন না। এ দিনের ঘটনার পরে এক নিত্যযাত্রী বলেন, ‘‘বসা নিয়ে একটু কথা-কাটাকাটি হতেই কয়েক জন ছাত্র বলতে থাকে, আজ সবাইকে দেখে নেব। সত্যি সত্যিই যে ওরা গায়ে হাত তুলবে, ভাবিনি। ওরা কারও কথা শোনে না। ট্রেনে বিড়ি-সিগারেট ধরানোটাও ওদের কাছে কোনও ব্যাপারই নয়। এ সব বন্ধ হওয়া দরকার।’’
—নিজস্ব চিত্র।