গ্রামে গ্রামে ঘুরে পাউরুটি, বিস্কুট বিক্রি করার সূত্রে সাঁকরাইলের রঘুদেববাটি গ্রামে যাতায়াত ছিল। গ্রামের অনেকেই সঙ্গেই ভাল সম্পর্ক। সেই সূত্রেই ইদের ছুটি পরিবারের সঙ্গে কাটাতে বিহারের মজফ্ফপুর থেকে স্ত্রী ও পাঁচ ছেলেমেয়েকে রঘুদেববাটি গ্রামে নিয়ে আসেন মহম্মদ সামির শেখ। এক মাসের চুক্তিতে সেখানে বাড়ি ভাড়া নেন। ইদ কেটেছিল আনন্দে। দিন কয়েকেই মধ্যেই বিহারে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল সবার। কিন্তু তার আগে যে তিন সন্তানকে হারাতে হবে তা ভাবতেও পারেননি সামির। বুধবার কাঁদতে কাঁদতে বার বারই সে কথা বলছিলেন তিনি। এ দিনই দুপুরে বাড়ির পিছনের পুকুরে স্নান করতে নেমে মৃত্যু হয় সামির ও ইসরাত বেগমের তিন শিশুকন্যার। শুধু পরিবারটিই নয়, এমন ঘটনায় শোকে হতবাক হয়ে গিয়েছে গোটা গ্রাম।
পুলিশ জানিয়েছে, মৃত শিশুদের নাম শিবা খাতুন (১২), সাহেবা খাতুন (৮), ও সুহানা খাতুন (৬)। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এ দিন সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ শিবা, সাহেবা ও সুহানা বাড়ির পিছনের দিকে পুকুরে স্নান করতে গিয়েছিল। বাবা পাউরুটি বিক্রি করতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। বাড়িতে একাই ছিলেন মা ইসরাত বেগম। স্নান করতে যাওয়ার এক ঘণ্টা পরেও কেউ ফিরে না আসায় ইসরাত খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। তাঁর চিৎকার-চেঁচামেচিতে পড়শিরা বেরিয়ে আসেন। তখনই পুকুরে দু’টি শিশুর দেহ ভেসে উঠতে দেখা যায়। কয়েক জন পড়শি সঙ্গে সঙ্গে পুকুরে নেমে দেহ দু’টি তুলে নিয়ে আসেন। খোঁজাখুঁজি করে একটু পরে পুকুরের নীচ থেকে আরও একটি দেহ উদ্ধার হয়। সম্ভবত সেটি পুকুরের তলায় পাঁকে আটকে গিয়েছিল। স্থানীয় চিকিৎসককে খবর দেওয়া হয়। তিনি এসে জানান, পুকুরে ডুবে তিনজনেরই মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনার খবর পেয়ে এলাকায় পৌঁছয় পুলিশ। ঘটনাস্থলে আসেন সাঁকরাইলের সিআই সুব্রত বারিক। তিনি বলেন, ‘‘পুকুরে নামার চাতালটি বর্ষায় পিচ্ছিল হয়ে রয়েছে। পুকুরে জলও অনেক বেশি। প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, প্রথমে একটি শিশু নামতে গিয়ে তলিয়ে যায়। তাকে বাঁচাতে গিয়ে বাকি দু’জন জলে নামে। তারাও গভীর জলে থই পায়নি।’’ তিন জনের দেহ বুধবার সাঁকরাইল পুলিশ মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। আজ, বৃহস্পতিবার দেহ তিনটির ময়না তদন্ত করা হবে।
এ দিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির আশপাশে জটলা করে রয়েছেন গ্রামবাসীরা। বাড়ি সংলগ্ন একটি ঘরে বাকি দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন সামির ও ইসরাত। তাঁদের সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন গ্রামের কয়েকজন। কাঁদতে কাঁদতে সামিরের বছর ষোলোর বড় ছেলে বলে, ‘‘এ বছর ইদে খুব ভাল সময় কেটেছিল আমাদের। নতুন জায়গায় এসে প়়ড়শিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। হাসিখুশি তিন বোনের সঙ্গে খুনসুটি করেই মঙ্গলবার রাতে ঘুমাতে গিয়েছিলাম আমি। এখনও মনে হচ্ছে কোনও দুঃস্বপ্ন দেখছি।’’ ঘরে ভিতর ছড়ানো রয়েছে তিন শিশুর পোশাক। সেখানে বারে বারেই জ্ঞান হারাচ্ছিলেন মা ইসরাত।
গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন, ব্যবসার কারণে মহম্মদ সামির কলকাতায় থাকেন। কয়েক বছর ধরেই তিনি রঘুদেববাটী গ্রামের বিভিন্ন পাড়ায় পাউরুটি, বিস্কুট-সহ বিভিন্ন বেকারি সামগ্রী বিক্রি করছেন। গ্রামের প্রায় সবার সঙ্গেই তাঁর ভাল সম্পর্ক। ওই গ্রামের বন্ধুদের সঙ্গে ইদ কাটাবেন বলে কয়েক মাস আগে গ্রামে পশ্চিম পাড়ায় ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন সামির। ইদের আগে বিহার থেকে পরিবারকে নিয়ে আসেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা শেখ মাসুদ রহমান, হালদার আলি, শাহ হোসেন জানালেন, আর দিন পনেরোর মধ্যেই স্ত্রী, পুত্র, কন্যাদের বিহারে দিয়ে আসবেন বলে জানিয়েছিলেন সামির। কয়েক দিনের আলাপেই পাড়ার লোকেদের মন জয় করে নিয়েছিল শিবা, সাহেবা ও সুহানা। এ দিন তাদের মৃত্যুতে চোখের জল ধরে রাখতে পারছিলেন না তাঁরা।