E-Paper

সিএমও-র করণিকের ‘দাপটে’ শাসকদলেরই কর্মী সংগঠনে ভাঙন

গত অক্টোবর থেকে সংগঠনের আদি নেতারা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একের পর এক চিঠি লিখে অবস্থার সুরাহা চেয়েছেন। চিঠিতে অভিযোগ, প্রতাপ বিভিন্ন জায়গায় সরকারি স্টিকার লাগানো গাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, রসিদ ছাড়া সংগঠনের নামে বিস্তর টাকা তুলছেন।

পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৬:১৯

— প্রতীকী চিত্র।

কালীঘাট-ঘনিষ্ঠ এক চিকিৎসকের প্রভাবে ‘উত্তরবঙ্গ লবি’র বিরুদ্ধে প্রবল মৌরসিপাট্টা, লবিবাজি, দমন-নীতির অভিযোগ উঠেছিল রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরে। গত কয়েক মাস ধরে অনেকটা তেমনই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের তৃণমূলপন্থী বৃহত্তম সংগঠন ‘পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারি কর্মচারী ফেডারেশন’-এ, অভিযোগ এমনই। অভিযোগের তির নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক আপার ডিভিশন করণিক প্রতাপ নায়েকের দিকে।

প্রতাপ বর্তমানে কর্মচারী ফেডারেশনের আহ্বায়ক। আর চেয়ারম্যান রাজ্যের মন্ত্রী মানস ভুঁইয়া। অভিযোগ, এঁরা দায়িত্বে আসার পরেই ফেডারেশনের আদি নেতাদের প্রায় সকলকে কোর কমিটি থেকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে এবং অধিকাংশকে মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রভাব খাটিয়ে, সরকারি বদলি নীতির তোয়াক্কা না করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করা হয়েছে। ফেডারেশনে বর্তমানে কোনও সভাপতি, সম্পাদক, সচিব, কোষাধ্যক্ষ নেই। অভিযোগ, প্রতাপই সর্বেসর্বা। তাঁকে পূর্ণ সমর্থন করছেন মানস। গোটা ঘটনার জেরে কর্মীরা আদি ও নব্য— দুই গোষ্ঠীতে কার্যত ভাগ হয়ে গিয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছে বলে অভিযোগ।

গত অক্টোবর থেকে সংগঠনের আদি নেতারা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে একের পর এক চিঠি লিখে অবস্থার সুরাহা চেয়েছেন। চিঠিতে অভিযোগ, প্রতাপ বিভিন্ন জায়গায় সরকারি স্টিকার লাগানো গাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, রসিদ ছাড়া সংগঠনের নামে বিস্তর টাকা তুলছেন। পুরনো কর্মীদের জোর করে দূরে বদলি করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন সম্মেলনে সরাসরি হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন ওই নেতারা।

ফেডারেশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রাক্তন সভাপতি, বর্ষীয়ান নেতা মনোজ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘প্রতাপের মতো লোকেরা ফেডারেশনকে রসাতলে নিয়ে যাচ্ছে। ৪১ জনের কোর কমিটি ভেঙে হঠাৎ প্রতাপ আর মানস ভুঁইয়া নিজেদের কিছু লোককে বৈঠকে ডেকে পাঁচ জনের স্টিয়ারিং কমিটি গড়লেন। পরে নিজেরাই জানালেন, তাঁরা চেয়ারম্যান ও আহ্বায়ক। কে তাঁদের নিয়োগ করলেন?’’

এ ব্যাপারে মানসের উত্তর, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর আশীর্বাদ নিয়ে প্রতাপ কাজ করছে। ওর বিরুদ্ধে কোনও কথা শুনতে চাই না। প্রতাপ ফেডারেশনে নবজোয়ার এনেছে।’’ কিন্তু প্রতাপ ‘পশ্চিমবঙ্গ সরকার’ স্টিকার লাগানো একাধিক গাড়িতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কী ভাবে? মানসের জবাব, ‘‘আমার তো বিভিন্ন ইউনিট আছে। সেখান থেকে প্রতাপকে সামান্য সাহায্য করলে অন্যায়ের কী আছে?’’ রসিদ ছাড়া টাকা তোলার অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী ‘‘এটা ফেডারেশনের নিজস্ব বিষয়’’ বলে এড়িয়ে গিয়েছেন।

প্রতাপের অবশ্য দাবি, ‘‘কাউকে চাপ দিই না। আমাদের ৩ লক্ষ ১০ হাজার কর্মী। যিনি খুশি হয়ে যেটুকু আর্থিক সাহায্য করেন, আমরা নিই। রসিদ দিতে পারি না। চেয়ারম্যানও আর্থিক সাহায্য করেন।’’ তবে প্রতাপ যা-ই দাবি করুন, গত ডিসেম্বরে তাঁর ঘনিষ্ঠ এক নেতা ওয়টস্যাপ বার্তায় নির্দেশ দিয়েছেন, আগামী ১৭ জানুয়ারি উত্তর ২৪ পরগনা জেলা সম্মেলনের জন্য জেলা ও রাজ্য কমিটির সদস্যদের ১২০০ টাকা এবং সাধারণ সদস্যদের ৩০০ টাকা করে দিতে হবে। আদি নেতাদের অভিযোগ, সংগঠনের সব বৈঠকে সদস্যদের থেকে ৫০০ টাকা করে তোলাটাই রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ, ৩ লক্ষ ১০ হাজার সদস্য হলে প্রতি বৈঠকে শুধু চাঁদাই ওঠার কথা ১৫ কোটি! অথচ, তার রসিদ নেই। আদি নেতাদের প্রশ্ন, এর তদন্ত হবে না কেন?

ফেডারেশনের অন্যতম আদি নেতা তথা হাওড়া জেলার প্রাক্তন সভাপতি নারায়ণ বাগ বলেন, ‘‘নীতিগত বিষয়ে ফেডারেশনে যে মতান্তর তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।’’ আর এক আদি নেতা সুজনবন্ধু ঘোষ বলেন, ‘‘ভোটের আগে দলেও খুব খারাপ প্রভাব পড়ছে। কর্মীরা ক্ষুব্ধ।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

TMC Inner Conflict TMC West Bengal health department

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy